পৃথিবীর সুন্দরতম দ্বীপগুলির মধ্যে একটি। প্রতি বছর দেড় কোটি পর্যটক দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাদ নিতে ছুটে আসেন। ঠিক যেন ছবির পাতা থেকে উঠে আসা সবুজ একটি দ্বীপ। অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য পাকে পাকে জড়িয়ে রয়েছে দ্বীপটিকে। জেজু একটি ভিসা-মুক্ত অঞ্চল হিসাবে পরিচিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়ার) দক্ষিণে রয়েছে বৃহত্তম ও জনপ্রিয় আগ্নেয় দ্বীপ জেজু। গত বছরের ডিসেম্বরে এই জেজুতে বেড়াতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েন ভারতীয় ভ্রমণ ভ্লগার ও নেটপ্রভাবী সচিন অবস্থী এবং তাঁর স্ত্রী। ছুটি কাটাতে দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে ভিসা-জটে আটকে পড়েন। অভিযোগ, তাঁদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং পৌঁছোনোর পরই বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। সচিনের দাবি, ‘ডিটেনশন সেন্টারের’ মতো একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁদের।
সম্প্রতি জেজু দ্বীপে তাঁদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সচিন একটি ভিডিয়োর মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবে শেয়ার করা একটি ভিডিয়োয় ওই ভ্লগার অভিযোগ করেছেন যে জেজু দ্বীপের বিমানবন্দরে অবতরণের পর অবাঞ্ছিত অভিজ্ঞতা মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সচিনের দাবি, তাঁদের দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ৩৮ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে নামার পরই তাঁরা তাঁদের ভ্রমণ নিয়ে উত্তেজিত ছিলেন। সমস্ত আনন্দ ও প্রস্তুতি এক ফুঁয়ে নিবে যায় ভিসা-জটে। সচিন বলেছেন, ‘‘কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব কিছু বদলে গেল। আমাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং একটি হোল্ডিং এরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কোনও সঠিক ব্যাখ্যা না পেয়ে কেবল অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। এবং আমরা অপেক্ষা করেছি।’’
জেজুর অভিবাসন কর্মীরা প্রথমে তাঁদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করেন। আঙুলের ছাপ নেওয়ার পরে অপেক্ষা করার নির্দেশ দেন। দোভাষীর মাধ্যমে সচিনের ফোনে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তাঁদের থাকার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান নোটিস ধরানো হয় সচিন ও তাঁর স্ত্রীকে। তাঁদের আর দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বীপে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, ভারতে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সচিন জানান, জেজু দ্বীপে অবতরণের আগেই ঝামেলা শুরু হয়েছিল। ব্যাঙ্ককে, বিমানসংস্থার কর্মীরা তাঁকে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা থাকার প্রমাণ দেখাতে বলেন বলে অভিযোগ। সেই টাকা না থাকলে বিমানে চড়া যাবে না বলে জানান কর্মীরা। টাকার ব্যবস্থা করার পর দম্পতি জেজুর উদ্দেশে উড়ে যান। যদিও সচিন জানিয়েছেন তিনি এবং তাঁর স্ত্রী রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং, বিমা ইত্যাদি সমস্ত শর্ত পূরণ করে তবেই জেজুর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
সচিন এই ঘটনাটিকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে খারাপ কয়েক ঘণ্টা বলে বর্ণনা করেছিলেন। যে স্থানটিতে তাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল তা জেলের কুঠুরির মতোই ছিল। সূর্যের আলো পর্যন্ত ঢুকছিল না তাতে। জল খাওয়ার জন্য গ্লাস ছিল না বলে ভিডিয়োয় বর্ণনা করেছেন সচিন। এমনকি সেখানে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনও করা হয়েছিল। কোরীয় অভিবাসন কর্তাদের বলতেও শোনা গিয়েছিল যে কোরিয়াতেই যাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তার ব্যবস্থা করা হবে।
তাঁর অভিযোগ ছিল, জেজুর অভিবাসন কর্তারা রিটার্ন টিকিট বা বুকিং পরীক্ষা না করেই তাঁদের দ্বীপে যাওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এক কথায় জানিয়ে দিয়েছিলেন জেজুতে প্রবেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা তাঁদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। সেই কথার সমর্থনও করেছেন সচিন। তাঁর আপত্তি ছিল অভিবাসন দফতরের আচরণে। তাঁরা বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করার জায়গায় রাত কাটান।
ভারতে ফেরার জন্য সচিন পরের দিনের টিকিট কেনার সিদ্ধান্ত নেন। সেই টিকিটের দাম ছিল অত্যন্ত চড়া। স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি দামে টিকিট কিনতে হয় সচিনকে। সেই যাত্রাপথে চিনে থামতে হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁদের গতিবিধি (এমনকি শৌচাগারে যাওয়ার সময়ও) পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়া প্রশাসনের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল যেন তাঁরাই অপরাধী। তিনি জানান, সাংহাই টার্মিনালে তাঁদের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। শৌচাগারে যাওয়ার সময় এক জন পুলিশকর্মী তাঁদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর শরীরে বডিক্যাম লাগানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন সচিন। বিশ্রামের জায়গার অবস্থা ছিল ভয়াবহ।
এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে সোলে থাকা ভারতীয় দূতাবাস। জেজু দ্বীপে ভ্রমণকারী ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন দূতাবাস কর্তৃপক্ষ। জেজুতে বেড়াতে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে সাবধান করেছেন তাঁরা।
এমনিতে জেজু ভিসা-মুক্ত এলাকা হলেও সেখানে প্রবেশের অবাধ নিশ্চয়তা নেই। সোলের দূতাবাসের সেই বিজ্ঞপ্তির শুরুতেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে জেজুতে ভিসা-মুক্ত সুবিধার মাধ্যমে প্রবেশ কেবল স্বল্পমেয়াদি পর্যটনের জন্য। কোরিয়া প্রজাতন্ত্রে চূড়ান্ত প্রবেশাধিকার কেবল জেজু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয়। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুসারে।
জেজুতে ভিসা-মুক্ত প্রবেশ বৈধ হলেও মূল ভূখণ্ড দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণ বৈধ ভিসা ছাড়া সম্ভব না। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রবেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে যাত্রীদের পরবর্তী উড়ানে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে। বিমানের সময়সূচির উপর নির্ভর করে পর্যটককে অস্থায়ী ভাবে বিমানবন্দরের ‘হোল্ডিং এরিয়া’য় থাকতে হতে পারে।
এ বিষয়ে দূতাবাসের হস্তক্ষেপের অধিকার কতখানি, তার সীমাও স্পষ্ট করে দিয়েছে সোলে থাকা ভারতীয় দূতাবাস। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিবাসন সিদ্ধান্তগুলি লঙ্ঘন করার আইনি অধিকার নেই দূতাবাসের। যদিও ভারতীয় নাগরিকেরা হোল্ডিং এরিয়ায় থাকার সুবিধার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যুক্তিসঙ্গত সহায়তা চাইতে পারেন।
জেজু শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার শাসনাধীন অঞ্চলই নয় স্বশাসিত বিশেষ একটি প্রদেশ। আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ, যার স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে। পর্যটনশিল্পের সুযোগকে আরও বাড়িয়ে তুলতে জেজু দীর্ঘ দিন ধরে ভারতীয়-সহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের জন্য সীমিত ভিসা-মুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তবে এই ছাড় জেজুতে সরাসরি প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি শুধুমাত্র দ্বীপটিতে ভ্রমণের জন্য। দক্ষিণ কোরিয়ার মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।
জেজুতে ভ্রমণ করার সময় ফিরতি বিমান টিকিট থাকা আবশ্যিক। যে ক’দিন দ্বীপে বেড়াবেন তার জন্য আগে হোটেল বুকিং করে রাখতে হবে। বিস্তারিত ভ্রমণ, তার দিনক্ষণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে জানাতে হবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে। পর্যাপ্ত টাকা সঙ্গে রাখলে তবেই প্রবেশের সুযোগ মিলবে। সাম্প্রতিক ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট, আন্তর্জাতিক কার্ড বা বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ জানাতে হবে পর্যটকদের।
পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাস হতে হবে। জেজুতে আসার আগে ভ্রমণ বিমা করে রাখা জরুরি। থাকার ব্যবস্থা এবং যোগাযোগের বিবরণ জানাতে হতে পারে। যাত্রীরা তাঁদের ভ্রমণ পরিকল্পনা স্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ভারতীয় দূতাবাস।
ভারতীয় পর্যটকদের জেজুর অভিবাসন দফতরের সঙ্গে সহায়তা করার পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস। দ্বীপে পা রাখার পর অভিবাসন আধিকারিকেরা একটি সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। শান্ত এবং সহযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে বলছে ভারতীয় দূতাবাস। স্পষ্ট, সত্য এবং ধারাবাহিক ভাবে উত্তর দিতে হবে। এ ছাড়াও, ভ্রমণপথ এবং থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। অভিবাসন আধিকারিকেরা অসন্তুষ্ট হলে জেজুতে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা পণ্ড হতে দেরি লাগবে না। ঠিক যেমন ঘটেছিল সচিনের সঙ্গে।
ভারতীয় দূতাবাস স্পষ্ট করে দিয়েছে ভিসা ছাড়া জেজু ছেড়ে মূল ভূখণ্ড দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার চেষ্টা করা অবৈধ। অতিরিক্ত সময় ধরে অবস্থান বা অননুমোদিত কার্যকলাপের ফলে ভবিষ্যতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতে পারে।