ইজ়রায়েল-আমেরিকার যৌথ সামরিক অভিযানে সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে হারিয়েও ‘শিক্ষা’ হয়নি ইরানের! আর তাই ‘অবাধ্য’ তেহরানের ‘বিষ-দাঁত’ ভেঙে দিতে পরমাণু হামলার ছক কষেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবাহিনী সিআইএ-র (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) প্রাক্তন বিশ্লেষকের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার প্রকাশ্যে আসতেই এই নিয়ে দুনিয়া জুড়ে বাড়ছে জল্পনা। যদিও সংশ্লিষ্ট খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওয়াশিংটনের অন্দরেই।
চলতি বছরের এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে ‘জাজিং ফ্রিডম’ নামের একটি পডকাস্টে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মুখ খোলেন সিআইএ-র প্রাক্তন বিশ্লেষক ল্যারি জনসন। জাতীয় নিরাপত্তার ভাষ্যকার এবং ব্লগ লিখিয়ে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বেশ জনপ্রিয়তা আছে। পডকাস্ট-সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘তেহরানের উপর পরমাণু হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একরকম নিয়েই ফেলেন ট্রাম্প। সেই লক্ষ্যে আণবিক কোড চেয়ে পাঠান তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিরস্ত করেন মার্কিন ফৌজের জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।’’
জনসন জানিয়েছেন, গত ১৮ এপ্রিল ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনে জরুরি বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষনেতৃত্ব। সেখানে হাজির ছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তেহরানকে নিয়ে আলোচনার মাঝে হঠাৎ করে তিনি পরমাণু কোড চেয়ে বসলে, জটিল হয় পরিস্থিতি। সঙ্গে সঙ্গে এর বিরোধিতা করেন জেনারেল কেইন। যদিও তা মোটেই পছন্দ হয়নি ‘পোটাস’-এর (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। ফলে বাহিনীর জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
পডকাস্টে জনসন আরও জানিয়েছেন, তর্কাতর্কির শেষে ঘর থেকে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যান জেনারেল কেইন। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ১৮ এপ্রিল পেন্টাগনে কোনও জরুরি বৈঠক হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। সূত্রের খবর, ১৬ এপ্রিল শেষ বার ইরান যুদ্ধের ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’ পরিস্থিতি সরকারের সামনে তুলে ধরেন মার্কিন ফৌজের জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ। ওই দিনের আলোচনায় যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথের হাজির থাকার খবর পাওয়া গিয়েছে। ফলে জনসন কী ভাবে বা কোথা থেকে ট্রাম্পের পরমাণু কোড চাওয়ার খবর পেলেন, তা ‘দেবা না জানন্তি’।
বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডারের মালিক হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর (২০২৫ সাল) এই সংক্রান্ত একটি তথ্য প্রকাশ্যে আনে সুইডিশ নজরদার সংস্থা ‘স্টকহলোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা সিপ্রি। তাঁদের দাবি, ন’টি আণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরমাণু হাতিয়ার রয়েছে রাশিয়ার কাছে (৫,৪৫৯)। তার পরেই আমেরিকার স্থান। ওয়াশিংটনের আণবিক অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৫,১৭৭। যদিও আইন অনুযায়ী, শত্রু দেশের উপর কখনওই ইচ্ছামতো পরমাণু হামলা চালাতে পারে না মার্কিন ফৌজ।
শত্রুর উপর আণবিক আক্রমণ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর চাই ‘নিউক্লিয়ার কো়ড’। এর জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে আমেরিকায়। পরমাণু কোডের জন্য তিনটি কালো রঙের ব্রিফকেস তৈরি করেছে পেন্টাগন, যার একটি সর্ব ক্ষণ থাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। ব্রিফকেসটির সাঙ্কেতিক নাম ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’। সব সময় সেটা বহন করেন কোনও না কোনও সামরিক কর্মী। ব্যাগটির ওজন প্রায় ২০ কেজি। ‘পোটাস’ ট্রাম্পকে বাদ দিলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের কাছেও রয়েছে একই ধরনের একটি ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’।
কালো রঙের ওই ব্রিফকেসের ভিতরে থাকে দু’টি বই, একটি ফাইল এবং একটি কার্ড। এর মধ্যে প্রথম উপাদানটির পোশাকি নাম ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’। ১২ ইঞ্চি লম্বা ও নয় ইঞ্চি চওড়া ৭৫ পাতার ওই বইতে আছে পরমাণু আক্রমণের যাবতীয় বিকল্প পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা। কালো ও লাল রঙে বইটিকে ছাপানো হয়েছে। ব্রিফকেসের দ্বিতীয় বইটির আকারও ‘ব্ল্যাক বুক’-এর সমতুল্য। সেখান থেকে কিছু নিরাপদ ঠিকানার কথা জানতে পারবেন প্রেসিডেন্ট। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন তিনি।
দ্বিতীয় বইয়ের সমস্ত পৃষ্ঠাই ছাপা হয়েছে কালো কালিতে। ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’-এর তৃতীয় উপাদানের সাঙ্কেতিক নাম ‘ম্যানিলা ফোল্ডার’। এর থেকে আপৎকালীন সতর্কবার্তা বা ইমার্জেন্সি অ্যালার্ট সিস্টেম ব্যবহারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা পেয়ে থাকেন প্রেসিডেন্ট, সংশ্লিষ্ট ফাইলটিতে যা আট থেকে ১০টি পাতায় লিখে পিন করে দিয়েছে পেন্টাগন। সব শেষের উপাদানটি হল পাঁচ ইঞ্চি লম্বা ও তিন ইঞ্চি চওড়া একটা কার্ড। এতে বিভিন্ন রকমের কোড লেখা থাকে। পরমাণু হামলার সময় এই কোডই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রধানের কাছে পাঠিয়ে দেন ‘পোটাস’।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, শত্রু দেশের উপর পরমাণু হামলার প্রয়োজন হলে বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার হলে তবেই ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’ খুলবেন প্রেসিডেন্ট। বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে আণবিক আক্রমণের কী কী সুযোগ রয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখবেন তিনি। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিলমোহর দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। সব শেষে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে যাবতীয় নির্দেশ দেবেন ‘পোটাস’। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় অত্যন্ত গোপনে চলবে সেই প্রক্রিয়া। হামলার হুকুম মিললে সেটা যাচাই করার অধিকার আছে আমেরিকার বাহিনীর।
পরমাণু আক্রমণের যাচাই প্রক্রিয়াতেই প্রয়োজন হয় ‘নিউক্লিয়ার কোড’-এর। সেখানে প্রেসিডেন্টের কাছে থাকা কালো ব্রিফকেসের কার্ডটির গুরুত্ব অপরিসীম। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘বিস্কুট’। তাতে যে কোড বা সঙ্কেত লেখা হয়েছে, সেটার উপর ভিত্তি করেই আণবিক হামলার নির্দেশ আদৌ ‘পোটাস’ দিচ্ছেন কি না, তা বুঝে নেন মার্কিন সেনাকর্তারা। তার পর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরমাণু হামলা চালিয়ে থাকেন তাঁরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে কোনও অবস্থাতেই বেআইনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না রাষ্ট্রপ্রধান।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হলে পরমাণু হামলার নির্দেশ দেওয়ার অধিকার পাবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তা ছাড়া আমেরিকার উপর আণবিক আক্রমণ হলে প্রত্যাঘাতের ক্ষেত্রে বাহিনীকে এই নির্দেশ দিতে পারেন যুদ্ধসচিব বা সরকারের কোনও শীর্ষ আধিকারিক। তবে সাধারণ ভাবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ‘পোটাস’কেই। তাঁর দাবি অন্যায্য হলে সেটা অমান্য করার অধিকার রয়েছে ফৌজের। ফলে সিআইএ-র প্রাক্তন বিশ্লেষক জনসনের দেওয়া তত্ত্ব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
যদিও সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, ইরানের উপর পরমাণু হামলা করা আমেরিকার পক্ষে বেশ কঠিন। কারণ সে ক্ষেত্রে রাশিয়া, চিন বা উত্তর কোরিয়ার (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া) মতো আণবিক শক্তিধরদের কড়া প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে ওয়াশিংটনকে। ফলে এ ব্যাপারে ট্রাম্পকে সতর্ক করা জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ জেনারেল কেইনের দিক থেকে অসম্ভব নয়। তবে পেন্টাগনের কোনও সূত্র মুখ না খোলায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইরানে ঢুকে হামলা চালানোর সময় তেহরানের প্রত্যাঘাতে ধ্বংস হয় দু’টি ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল’ মার্কিন লড়াকু জেট। যদিও শেষ মুহূর্তে ককপিট থেকে বেরিয়ে প্রাণে বেঁচে যান তাদের যোদ্ধা পাইলটেরা। সাবেক পারস্যের ভিতরেই আত্মগোপন করে ছিলেন তাঁরা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পাইলটদের যুদ্ধবন্দি করার সুযোগ চলে আসে ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির হাতে। তবে সেখানে ব্যর্থ হয় উপসাগরীয় মুলুকটির এই শিয়া ফৌজ।
ইরানের মাটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল’ ভেঙে পড়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই প্রথম পাইলটকে উদ্ধার করে আমেরিকা। তার ৪৮ ঘণ্টা পরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে শত্রু দেশের ভিতর থেকে তুলে নিয়ে আসা হয় দ্বিতীয় পাইলটকে। তাঁকে অবশ্য হন্যে হয়ে খুঁজছিল তেহরানের ফৌজ। এর জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কারও ঘোষণা করে তারা।
ধ্বংসপ্রাপ্ত দ্বিতীয় বিমানের পাইলটের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’। ককপিট থেকে বেরোনোর পর দু’দিন ধরে একটি পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচান তিনি। উদ্ধারের জন্য ১৭৬টি বিমানে কয়েকশো বিশেষ কমান্ডোকে অভিযানে নামায় আমেরিকা। সাত ঠিকানায় ৪৫ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ধরে চলে তল্লাশি। অবশেষে সফল ভাবে তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় তারা।
সম্প্রতি, পাইলট উদ্ধারের রুদ্ধশ্বাস অভিযান সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানে সংশ্লিষ্ট অপারেশন চলাকালীন ‘ওয়ার রুমে’ চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন ট্রাম্প। বাহিনীর কমান্ডারদের কাজে বার বার বিরক্তি প্রকাশ করেন তিনি। তখন বাধ্য হয়ে সেখান থেকে তাঁকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। মনঃসংযোগে সমস্যা হওয়ায় সেনা অফিসারেরা এই সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গিয়েছে।
পেন্টাগনের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, ওই দিন বেশ কয়েক ঘণ্টা ওয়ার রুমের বাইরে ছিলেন ট্রাম্প। শত্রুভূমি থেকে পাইলটকে উদ্ধার করে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে আসার পর এই সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয় তাঁকে। সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যাপারে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করেন তিনি।
‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এই প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ। আনুষ্ঠানিক ভাবে এই ইস্যুতে অবশ্য কোনও বিবৃতি দেয়নি পেন্টাগন বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্যালয় হোয়াইট হাউস। অন্য দিকে ইরানের লড়াইয়ে বেশ কিছু ‘ভুল’ পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে পডকাস্টে জানিয়েছেন জনসন। সেগুলি শুধরে নিয়ে পেন্টাগন কী ভাবে তেহরানকে প্যাঁচে ফেলে, সেটাই এখন দেখার।