রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সকালে এই যে তোমার সঙ্গে কথা হচ্ছে অভিরূপ, এখন, ধরো একটু আগেই, সবে ভোরের থেকে বাইরে এসেছি আমরা। আর, তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছ ভোরের কবিতা আমার কিছু মনে পড়ছে কিনা! তোমার এ কথা জিজ্ঞেস করার কারণ ‘সকালবেলার কবি’ নামে আমার একটি ক্ষুদ্রাকার কবিতার বই, বলা যায়, আমার দিকেই ছুড়ে মারছ তুমি! ভোরের কবিতা? আচ্ছা, তোমায় তিনটে ভোর বলি, সেখানে তুমি তিনটে ভোরের কবিতা পাবে। আমি সেই ভোর দেখতে পাচ্ছি অন্তত!
ধরো, একটি কবিতার কথা বলছি। এগুলিকে যদিও গান হিসেবেই সাধারণত গাওয়া হয়। আমি কবিতারূপেই ধরি। যেমন, ‘ওরে, নূতন যুগের ভোরে/ দিস নে সময় কাটিয়ে বৃথা সময় বিচার করে’। এখানে একটা ‘ভোর’-এর কথা আছে, লক্ষ করছ? এর পর তোমাকে আর একটা ‘ভোর’ বলছি। ‘আমি স্বপনে রয়েছি ভোর, সখী, আমারে জাগায়ো না’। এখানেও ‘ভোর’। এই বার তোমায় আমি তিন নম্বর ‘ভোর’-এর কথা বলি। সেটা হল : ‘দাও হে হৃদয় ভরে দাও’।
তিনটে ভোর বললাম। প্রথম গান, অর্থাৎ ‘ওরে, নূতন যুগের ভোরে’-র মধ্যে ‘ভোর’-এর যে স্বরগুলি রয়েছে তা আশাবরী-রামকেলির স্বর। জানো তো, ‘ভো’ অক্ষরটি পড়ছে কোথায়? একেবারে পঞ্চমে। আর, ‘রে’ অক্ষরটিতে পড়ছে কোমল নি কোমল ধা। আশাবরী-রামকেলির ভাব রয়েছে তো! এর পর ‘…সময় বিচার করে’-তে এসে কিন্তু ভৈরবী স্পষ্ট থেকে আরও স্পষ্টতর হয়ে উঠলেন। তার মানে, এই ‘ভোর’-এর ভিতর ভোরেরই রাগ আর তার সব স্বরেরা যাতায়াত করছে। যেমন বন্ধুরা যাতায়াত করে, তেমনই।
পরের কবিতায় আসি। সেখানেও ভোর। ‘স্বপনে রয়েছি ভোর’। এখানে ‘ভো’ বর্ণে কোমল নিখাদ ছুঁয়ে কোমল ধৈবত। এই কোমল ধৈবত স্থায়ী হয় আরও এক মাত্রা। তার পরে আমরা পঞ্চম থেকে কোমল ধৈবত ছুঁয়ে কোমল নি-তে পৌঁছই। এই ‘ভোর’-এর ‘র’-টা সম্পূর্ণ হয় কোমল নি-তে পৌঁছে। আর, ‘ভো’-র মধ্যে যে ‘ও’-কার তা বিস্তৃত থাকে কোমল ধৈবত থেকে পঞ্চম, কোমল ধৈবত হয়ে কোমল নি পর্যন্ত। এখানে স্পর্শ-স্বরের ব্যবহার আছে।
এই ভোর কিন্তু বিভোরতা। রাগ, মিশ্র আশাবরী। এখানেও সকালের স্বর-সখাদের যাতায়াত। মানুষ স্বপ্ন থেকে কাউকে কখন জাগায়? এই বিষয়টি দ্যাখো অব্যক্ত আছে লাইন দু’টির মধ্যে। সাধারণত আমাদের ঘুম কখন ভাঙে? সকালবেলা। এই সকালের সঙ্গে ভোর-ও কিন্তু যুক্ত হয়ে আছে। অর্থাৎ আমি সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে স্বপ্নের ভিতর বসবাস করছি। সেই স্বপ্ন, জাগ্রত স্বপ্নও হতে পারে। ‘জাগ্রত স্বপ্ন’ কাকে বলে জানো তো? জাগ্রত স্বপ্ন হল, রাত্রে একা অন্ধকার ঘরে দূরতম ইম্যাজিনেশন। যে ইম্যাজিনেশন থেকে পরের দিন সকালে কবিতা হয়। কখনও তা গানের আধারেও হতে পারে।
এবার তোমায় তিন নম্বর ‘ভোর’-এর কথা বলি। ‘দাও হে হৃদয় ভরে দাও’ এখানে তুমি বলতেই পারো যে, আমি ভুল বলছি। বিনয় মজুমদার হলে বলতেন: ‘ভু-উ-ল শুনেছিলাম হয়তো!’ বলতেন: ‘তবে তো রবীন্দ্রনাথ, আশা আছে, তুমি আছো কলকাতা থেকে দূর গ্রামে!’ বিনয়, এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্থানাঙ্ক গ্রামে দেখতে পাচ্ছেন। ভুল করেননি। তুমিও ভুল শুনছ না। তুমি তো বলছ, এখানে ভরে দেওয়ার কথা হচ্ছে। যেমন, পানপাত্র, জলের গেলাস বা চায়ের কাপ পানীয় দ্বারা ভরে দেওয়া হয়। এখানে ‘ভোর’ বা ব্রাহ্মমুহূর্তের পরে, প্রভাতবেলার আগে— যে-সময়টা, মানে তোমাদের উষাপিসির নামের সঙ্গে যে সময়টা যুক্ত হয়ে আছে আর কী— উষা আর ভোর তো ভাইবোন— সেই সকালের সঙ্গে মেশামিশি হয়ে থাকা ‘ভোর’ কিন্তু নয়। এটা হচ্ছে পাত্র পূর্ণ করে দেওয়া। ভরে দেওয়া। তা হলে এইখানে ‘মর্নিং’ বা ‘ডন’ অথবা ‘ভোর’ কী করে আসে?
বলটা ঠিক জায়গায় মেরেছ! একেবারে ঠিক জায়গায়। তবে আমি তো বুড়ো হয়েছি, আমার কাছে এখন এক-একটা শব্দ, উচ্চারণের সঙ্গেও তার অর্থকে যুক্ত করে রাখে। ফলে, রচনার অর্থ মনের ভিতর দ্বিস্তর হয়ে দেখা দেয়। অবশ্য দ্বিস্তর অর্থযুক্ত কবিতার প্রচলন ক্ষীণ থেকে আরও ক্ষীণতম হয়ে আসছে গত পঁয়ত্রিশ বছরে। তাই হয়তো, এই বিষয়টা নিয়ে একটু বেশিই বকবক করছি। করছি যখন, তখন আর না-বলার কিছু নেই যে ‘ভরে দাও’ মানে যে পূর্ণ করে দাও— লেখাটি পড়তে গিয়ে এ কথা চোখে পাচ্ছি। কিন্তু কানে, উচ্চারণে পাচ্ছি ‘ভোরে’, উষালগ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দটিও। এই বার, দ্যাখো, খুব বড় কবি তো, ওই ধ্বনির সাম্যটুকু পেয়েই, বা বলা যায় ধ্বনির সখ্য-সহায়তাধরেই উনি টক করে উঠে গেলেন ভোরের আলো-সঙ্কাশের দিকে।
কী করে এমন বলছি? কোন যুক্তিতে? এখানে ‘ভোরে’ শব্দটিতে কী ঘটল? প্রসিদ্ধ গায়ক মোহন সিংহ খাঙ্গুরার এক মধ্য-পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া একাগ্র শিষ্য আমাকে জানালেন, তাঁর গুরু তাঁকে বলেছিলেন এইখানে ‘ভৈরব’-এর অবস্থিতি আছে। ভৈরব কোন সময়ের রাগ? হ্যাঁ, সকালের। আমাকে সদর্থে সচেতন করে দিতে তিনি এও বললেন, “শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিভিন্ন রাগে বিভিন্ন স্বর-সমষ্টি যে বিশেষ বিশেষ স্বতন্ত্র চলনের মধ্য দিয়ে তাদের শাস্ত্রধারা রক্ষা করে চলাচল করে, রবীন্দ্রনাথ অনেক সময়েই তার ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন, সে কথা যেন আমি ভুলে না যাই। ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন কেন? কাব্যভাষাকে উপযুক্ত করে তুলতে তিনি তৈরি করেছেন নতুন সুরভাষ্য।” এ কথা বলে এই সঙ্গীতগুণী আমার উপকারই করলেন।
এবার ‘ভোর’-এ ফিরি। তা হলে কী দাঁড়াল? আমি কী পেলাম? আমি পেলাম, যে লোকটা বাবার সঙ্গে, মানে দেবেন ঠাকুরের সঙ্গে, বাল্যবয়স থেকে সূর্যোদয় দেখার অভ্যাস করছে এবং সে সাধনা থেকে আজীবন চ্যুত হচ্ছে না— সেই লোকটা যখন প্রার্থনা করছে যে, আমার হৃদয় তুমি পূর্ণ করে দাও তখন ‘পূর্ণ’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে সে ‘ভরে’ পেয়েছে এবং ‘ভরে’র ধ্বনিসাযুজ্যে সে ‘ভোর’-এ, অর্থাৎ উষাকালকেও পেয়ে গেছে।
তা হলে আমার হৃদয়কে তুমি এমনভাবে ভরে দাও, যেভাবে ভোর আমার হৃদয়কে ভরে দেয়। এই ভোর দ্বিস্তরিক অর্থে ধাবিত হল, অন্তত আমার কাছে। অন্যের কাছে কী জানি না। মানতে হলে মানো, নইলে মেনো না। তর্ক আমি কখনও করতে যাইনি। আর, তোমার সঙ্গে তো প্রশ্ন-ই নেই। মিলন কি তর্ক দিয়ে হয়? নারী-পুরুষের মিলন যেমন। এক্ষেত্রে অবশ্য, নারী-পুরুষের মিলন নয়। শব্দ ও স্বরের মিলন। তাই, তর্ক নাই।
ধ্বনিসাম্যের এই সহবাস আমার জীবনে যিনি সবচেয়ে বড় কবি, তাঁর হাতে অন্যত্রও পেয়েছি। সেখানে অবশ্য রাগ বদলে গেছে। বিষয়ও, প্রার্থনা নয়। যেমন, ‘প্রভাতকমলসম/ ফুটিল হৃদয় মম’। ‘ফুটিল’ কথাটি আছে তো, তার আগেই কী আছে? আছে, ‘কমল’ কথাটি। কমলসম ফুটিল। ফুটিল মানে প্রস্ফুটন, ব্লুমিং! স্বরটায় দেখছি ‘ফুটিল’-তে এসে তারসপ্তকের শুদ্ধ গান্ধারে খোঁচ মারছে। অর্থাৎ বিঁধে যাচ্ছে। শব্দে বলা হচ্ছে প্রস্ফুটন আর সুরে বলা হচ্ছে বিদ্ধতা। দ্বিস্তরিক অর্থধাবন। এখানেও।
কিন্তু কেন? রচনাটির শব্দ-স্বর-সম্পর্কের মধ্যে এই জিনিসটা আসছে কেন? ‘কোথা হতে সমীরণ/ আনে নব জাগরণ’ এই জায়গাতেও ‘আনে’-তে ওই তারসপ্তকের শুদ্ধ গান্ধারে খোঁচ মারা আছে। কিন্তু আসল উৎস আমি খুঁজে পেয়েছি, রচনাটির একেবারে শেষ স্তবকে পৌঁছে। শেষ স্তবকটি কীরকম? ‘আমার বাসনা আজি/ ত্রিভুবনে উঠে বাজি/ কাঁপে নদী বনরাজি বেদনাভরে’। শব্দগুলি আমাকে জানায়, এক জনের বাসনা-অগ্নি একেবারে ত্রিভুবনে বেজে উঠছে। এত তীব্র সেই বাসনার স্পন্দন, যে নদী বনরাজি পর্যন্ত কাঁপছে। কী প্রাবল্য তবে সেই বাসনার, যা নদী বনরাজি এবং ত্রিভুবনকে একই সঙ্গে তোলপাড় করে দিতে পারে। আর, এই কবিতাটির চূড়ান্ত শব্দ কী? ‘বেদনাভরে’। অর্থাৎ এক যন্ত্রণা সারাক্ষণ কাজ করে চলেছে কবিকৃত এই সৃষ্টির ভিতর দিয়ে, যে সৃষ্টিকে প্রথমে আনন্দের উদ্ভাসন বলে মনে হয়। কারণ এ কবিতার সূচনাতেই পাচ্ছি : ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে/ আমার নিভৃত নব জীবন-’পরে’। ফলে, প্রভাত-পদ্মের মতো হৃদয় ফুটে ওঠে। জেগে ওঠে সব শোভা, সব মাধুরী। কোনও অজানা স্থান থেকে বাতাস নতুন ভাবে জাগ্রত করার উপাদান আনে। প্রাণকে খুলে দেয় (পরানের আবরণ মোচন করে)।এক আনন্দ-মুগ্ধতার হাওয়া-ঢেউ ধরে রাখে, এই সৃষ্টির বেশিটাই।
হ্যাঁ, বুকে, সুখে, দুখে কত যে ব্যথা— সে কি লাগে না? লাগে তো। কিন্তু ‘সুখে’ আর ‘দুখে’ কথাটি পাশাপাশি থাকার ফলে দুঃখের তীব্রতা কিন্তু তত থাকে না। অনেকটাই দৈনন্দিন হয়ে আসে। তবে কবিতার শেষ শব্দটিতে আমরা আলাদাভাবে একটি লাইন হিসেবে একটি মাত্র শব্দকেই পাই : ‘বেদনাভরে’। ফলে, বেদনার যে ধাক্কা তা আমাদের প্রাণে বিদ্ধ হয়। এই বিদ্ধতাকেই তিনি ‘ফুটিল’ শব্দে তারসপ্তকের শুদ্ধ গান্ধারে খোঁচ দিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে চলেছিলেন বার বার। অর্থাৎ ভিতরে ভিতরে ওই হঠাৎ পাওয়া আনন্দের মধ্যেও কোনও এক ‘বাসনাবেদনা’ বহন করে চলছিল সুরশব্দে সমন্বিত কাব্যটি। ‘দাও হে হৃদয় ভরে দাও’— এখানে ‘ভরে’ কথাটি পাওয়া মাত্র এর ধ্বনিসাম্য ছুটে গিয়েছিল ভোর বা উষার দিকে। স্বর-ও এসেছিল সেই আত্মীয়তারই টানে। খেয়াল করো, ‘ফুটিল’ শব্দের মধ্যে ফুটে যাওয়ার যে অর্থস্তর রয়েছে, স্বর প্রয়োগের মধ্যে তাকে পুরোপুরি গোপন পদ্ধতিতে রাখতে রাখতে চললেন কবি, তারসপ্তকের ওই শুদ্ধ গান্ধারের খোঁচটির ভিতর দিয়ে। শেষে, ‘বেদনাভরে’-কে একলা একটি লাইনে ছেড়ে রাখায় স্পষ্ট হল যে, ওই বিশাল স্রষ্টার বেদনা লুকোনোর ক্ষমতাও কত প্রবল!
এক্ষুনি বলেছি, ‘সুখে’ ‘দুখে’ শব্দগুলি পাশাপাশি থাকার ফলে ‘দুঃখ’ শব্দটা খানিকটা প্রাত্যহিক হয়ে আসে আমাদের কাছে। ফলে দুঃখের ভারও কমে যায়। দুঃখ তো ভারী জিনিস। এখন অবশ্য আমাদের সাহিত্য-সমাজে দুঃখ জিনিসটির বদলে জায়গা নিয়েছে, যাকে বলে: ‘জ্বালা’। ‘শোক’, আলাদা বস্তু। তা ব্যক্তিগত। আবার ব্যক্তিগত হয়েও সারা পৃথিবীর। গাজ়ার শিশুনিধনই কি এক সর্বব্যাপী শোক নয়?
কিন্তু আমরা তো ছিলাম ‘দুঃখ’ কথাটির ভিতর? তাই তো? সুখের পাশের দুঃখ এসে দুঃখের ওজন কমিয়ে দিল। ওই ভাবেই খুব সুপরিচিত একটি কবিতায় যদি চলে যাই, তবে তার প্রথম লাইনে দেখি সে কবিতা বলছে: ‘কান্না হাসির দোলদোলানো পৌষ ফাগুনের পালা’— আমি যে কী মূর্খ তা তো তুমি জানো, বাল্যবয়স থেকে নৃত্যের সঙ্গে এই রচনাকে রূপায়িত হতে দেখে ভেবেই এসেছি, এ এক সেলিব্রেশনের কবিতা। কারণ ‘আমায় তাই পরালে মালা’ কথাটি আছে লেখাটির মধ্যে। আছে, সারা জীবনের গানের ডালা বয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাও। ফলে, কী? না, উদ্যাপন। আর কী-বা হবে!
হঠাৎ একদিন কানে অল্প করে ছুঁয়ে গেল ‘পালা’ শব্দের ‘লা’ অক্ষরে একটা কোমল ধা রয়েছে। একেবারে প্রথম লাইনেই রয়েছে। আবার প্রথম লাইনের শেষতম বর্ণ-ও ওই ‘লা’। এখানেও কান্না হাসির দোল দোলানো-য় কান্না এবং হাসি হাত ধরাধরি করে থাকায় কান্নার কষ্ট কমে যায়। হাসি স্বাভাবিক হয়ে আসে। আসবেই তো। ‘এই কি তোমার খুশি’। খুশির গান। বোকার হদ্দ বলে না? এই আমাকে দ্যাখো, আমি হলাম তাই। যে কেউ থাপ্পড় মেরে যাচ্ছে। অকারণে মারছে না। কারণ আছে বলেই মারছে। আমি মেনে নিচ্ছি। আমি নিজের দিকে তাকিয়ে বলছি : ও রে তুই এটা দেখবি না এ লেখায় এমন কথা আছে যে ‘অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে’। এ লেখা শেষ হচ্ছে এই কথা দিয়ে ‘প্রাণ-পোড়ানো গানের আগুন জ্বালা’। এর সঙ্গে প্রথম লাইনের শেষ শব্দের শেষ বর্ণের কোমল ধা কীভাবে এই প্রাণ-পোড়ানোর সঙ্কেত দিয়ে রেখেছিল, তা ধরতে ধরতেই আমার জীবনটা পার হয়ে গেল। তাই আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।
*****
‘শ্রীযুক্ত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত/ কল্যাণ/ বয়েসে তোমাকে অনেক দূরে পেরিয়ে এসেছি, তবু তোমাদের কালের সঙ্গে আমার যোগ লুপ্তপ্রায় হয়ে এসেছে, এমনতর অস্বীকৃতির সংশয়বাক্য তোমার শব্দ থেকে শুনিনি। তাই, আমার রচনা তোমাদের কালকে স্পর্শ করবে আশা করে এই বই তোমার হাতের কাছে এগিয়ে দিলুম। তুমি আধুনিক সাহিত্যের সাধনক্ষেত্র থেকে একে গ্রহণ করো।/তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’
‘আকাশপ্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে এই কথাগুলি দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথ তখন রবীন্দ্রনাথ হয়ে গেছেন। সেটা তিরিশের দশক। ১৯০১ সালে জন্মানো এক জন কবিকে, যাঁর থেকে তিনি ঠিক চল্লিশ বছরের বড়, যাঁর কবিতার মধ্যে এ-লাইন পাওয়া যায়: ‘অধুনা আনিত নব অলিখিত লেখনি মোর’— এবং তা আমাদের রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষাকেই মনে করিয়ে দেয়— সেই তরুণটিকে কত কুণ্ঠা কত বিনম্রতার সঙ্গে এই বইটি তুলে দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর বৃদ্ধ হাতখানি উঁচু করে! এ কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এই বৃদ্ধ, ‘অস্বীকৃতির সংশয়বাক্য তোমার শব্দ থেকে শুনিনি’।
মানুষ তো চিরকাল বেঁচে থাকে না। বছর দুয়েক আগেই একটি সুবিখ্যাত লিটল ম্যাগাজ়িনের পুজো সংখ্যায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ৫৭টি চিঠি ছাপা হয়েছে। সেইখানেই, চিঠির পর চিঠিতে ‘রেণু বেণু রেণু বেণু’ কথা দু’টিকে তিরের মতো নিক্ষেপে নিক্ষেপে কত কত বার রবীন্দ্রনাথকেই নাম না করে বিদ্ধ করা হয়েছে, তার প্রমাণ তো এখন আছে।
এই আক্রমণের কারণ কী? প্রথম জীবনে সবচেয়ে বেশি ঋণ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হয়েছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে। তাই, এত জ্বালা। আর সেই জ্বালার বারংবার উৎসরণ। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ছিলেন তুলনামূলক সাহিত্যে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রত্যক্ষ ছাত্র। শেষ দশ বছরে অলোকরঞ্জনের যে কবিতার বইগুলি বেরিয়েছে সে-সবের মধ্যে অশীতিপর অলোকরঞ্জন কোনও কোনও পৃষ্ঠায় কবীরের দোঁহা, কখনও-বা রামায়ণের আদিকাণ্ডের তিন পৃষ্ঠার অনুবাদ যুক্ত করে দিতেন— যা এই কবির প্রথমাবধি পাঠক যারা, যেমন আমি, বাহাত্তর বছরের বৃদ্ধ, অলোকরঞ্জনের মনোগতিধারা অন্ধের মতো হলেও হাতড়ে হাতড়ে কিছু স্পর্শ করতে পেরেছিলাম। তাঁর, অলোকরঞ্জনের— নিজ অধ্যাপক সুধীন্দ্রনাথের মতোই— পাঠক খুব কমে এসেছে। ফলে, তাঁর আকস্মিকভাবে মনে আসা ক্ষুদ্র স্মৃতি উদ্ভাসের মধ্যে এই বাহাত্তরে পৌঁছনো লোকটি দ্যাখে, ছাত্রদিনের স্মৃতিচারণায় তিনি সুধীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করামাত্র কী ভাবে সুধীন্দ্রনাথ তাঁকে রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
কী রকম? সুধীন্দ্রনাথের বাড়িতে এক দিন সমীর সেনগুপ্ত, নরেশ গুহ আছেন। সঙ্গে রয়েছেন অলোকরঞ্জনও। কী বিষয়ে কথা বলছেন সুধীন্দ্রনাথ? তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্রদের বোঝাচ্ছেন, অলোকরঞ্জনের ভাষায় যাকে বলা যায়, ‘কবিদের আচার্য’ মালার্মের কথা। এর আগে, ১৯৩৬-এ বেরোনো রজার ফ্রাই-কৃত ‘মালার্মে-তরজমাগুচ্ছ’ থেকে আরও কিছু কবিতার সঙ্গে ‘ফন-এর দিবাস্বপ্ন’ নামক এক দীর্ঘ কবিতার অনুবাদ করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ। পরে ইতিহাস দেখবে, সুধীন্দ্র-ছাত্র অলোকরঞ্জন দিনের-পর-দিন অপরিসীম পরিশ্রমে অনুবাদে সফল করবেন মালার্মে-শিষ্য ভ্যালেরি-র ‘সমুদ্রের পাশে কবর’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটি, সে কথা শত প্রশংসায় বর্ণনা করবেন নতুন যুগের কবিদের ‘তরুণ তুর্কি’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
তবে অভিরূপ, ফেলে এসেছি একটি কথা। ওই যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাসের পরে সমীর সেনগুপ্ত, নরেশ গুহ ও অলোকরঞ্জন পৌঁছেছেন সুধীন্দ্রনাথের গৃহে, লিটল রাসেল স্ট্রিটে, সেদিনের কথা বলছিলাম তো? সেদিন মালার্মের মহত্ত্ব বোঝাতে বোঝাতে ছাত্রদের অভিভূত করে দেওয়ার পর একটু মৃদুহাস্য মিশিয়ে এ প্রশ্ন করতে ভোলেননি সুধীন্দ্রনাথ: ‘তোমাদের রবীন্দ্রনাথ কি পারতেন এমন? বলো?’
অর্থাৎ কী দাঁড়াচ্ছে?
আমাদের ভাষার সবচেয়ে বড় কবি, শুধু কবি নয়, নাটককার, সঙ্গীতস্রষ্টা, আরও কত কী কী তা সবাই জানেন— তার শেষ জীবনের হাতখানি তুলে যত সঙ্কোচে যত নম্রতায় যত বিনতি জানিয়েই নিজের একটি বই চল্লিশ বছরের ছোট কবির দিকে তিনি বাড়িয়ে দিন না কেন— শেষ পর্যন্ত অপমানই ছিল তাঁর প্রাপ্য। বিদ্রুপই, তাঁর পুরস্কার।
এ সম্পর্কে বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যায়। তার চেয়ে সরে থাকা ভাল। অলোকরঞ্জন তাঁর শেষের দিকের বইয়ে রামায়ণের আদিকাণ্ড থেকে তিন পৃষ্ঠা অনুবাদ করেছিলেন— বললাম না এক্ষুনি? সেই অনুবাদের শেষে তিনি যুক্ত করেছিলেন দশ-বারো লাইনের একটি উত্তরভাষ। সেখানে ছিল অলোকরঞ্জন-লিখিত এমন একটি লাইন : ‘নির্বাসিতের চেয়ে আনন্দ আর কার?’
আমি এ-কথা থেকে আর এক পা এগিয়ে গিয়ে যদি বলি: স্বেচ্ছা-নির্বাসিতের চেয়ে আনন্দ আর কার? খুব অন্যায় হয় কি?
সেই স্বেচ্ছা-নির্বাসনের জগৎ ছারখার হয়ে যায়ও যদি— রবীন্দ্রনাথই থাকবেন শেষ সঙ্গী!
সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক অনুলিখন:অভিরূপ মুখোপাধ্যায়
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে