রিউগু গ্রহাণুতে মিলল ডিএনএ এবং আরএনএ-র সব যৌগিক উপাদান। — প্রতীকী চিত্র।
পৃথিবীর মতো সে-ও চক্কর কাটছে সূর্যকে। মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মাঝে যে গ্রহাণুপুঞ্জ রয়েছে, এটি তারই সদস্য। কথা হচ্ছে পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূরে থাকা রিউগু গ্রহাণুকে নিয়ে। রিউগু-কে নিয়ে গত কয়েক বছরে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। পৃথিবীতে যে প্রাণ রয়েছে, সেই প্রাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদানের হদিস মিলেছে এই গ্রহাণুতে। নতুন গবেষণায় তা আরও এক ধাপ এগোল। রিউগুতে মিলল ডিএনএ এবং আরএনএ-র সবগুলি যৌগিক উপাদান।
পৃথিবী থেকে এর কোনও স্থির দূরত্ব নেই। কক্ষপথে ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে উভয়ের দূরত্বও পরিবর্তিত সময়ে। সময়ভেদে পৃথিবী এবং রিউগুর দূরত্ব বদলায়। লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার থেকে কয়েক কোটি কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে যায় উভয়ের ব্যবধান। আপাত ভাবে দূরত্ব অনেকটা মনে হলেও, মহাকাশ গবেষণার নিরিখে এই দূরত্ব সামান্যই। পৃথিবীর খুব কাছের গ্রহাণুগুলির মধ্যে রিউগু-কে একটি ধরা হয়।
কাছাকাছি হওয়ার ফলে এই গ্রহাণুকে নিয়ে গবেষণা তুলনামূলক সহজ হয়েছে মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে। মহাকাশযান পাঠানো গিয়েছে সেখানে। তা নিরাপদে ফিরেও এসেছে পৃথিবীতে। এই মহাকাশ অভিযানটি চালিয়েছিল জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘জাক্সা’। অভিযান শুরু হয় ২০১৪ সালে। রিউগুর উদ্দেশে পাঠানো হয় মহাকাশযান ‘হায়াবুসা-২’। অভিযানের সময়ে পৃথিবী থেকে রিউগুর দূরত্ব ছিল প্রায় তিন কোটি কিলোমিটার। দীর্ঘ ছ’বছরের মহাকাশ অভিযানের পরে ২০২০ সালে তা ফিরে আসে পৃথিবীতে। সঙ্গে নিয়ে আসে রিউগুর মাটি।
গ্রহাণু খুঁড়ে সেখান থেকে প্রায় ৫.৪ গ্রাম মাটি পৃথিবীতে নিয়ে আসে ‘হায়াবুসা-২’। ওই মাটির নমুনা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয় তখন থেকেই। গত কয়েক বছরে তাতে একের পর এক বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে। যেমন, ২০২৩ সালের এক গবেষণায় রিউগুর মাটির নমুনায় পাওয়া যায় ইউরাসিলের সন্ধান। ইউরাসিল হল রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (আরএনএ)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যৌগ। এ বার নতুন গবেষণায় দেখা গেল, শুধু ইউরাসিল নয়, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) এবং আরএনএর সবগুলি যৌগিক উপাদানই রয়েছে রিউগুর মাটির নমুনায়।
এই গবেষণাটি করেন জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ ইয়াসুহিরো ওবা এবং তাঁর সহকর্মীরা। গত ১৬ মার্চ ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি কী ভাবে হল, তা নিয়ে অতীতে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন তত্ত্ব উঠে এসেছে। তার মধ্যে একটি তত্ত্ব হল— প্রাণের মৌলিক উপাদানগুলি সম্ভবত মহাবিশ্বের অন্য কোনও প্রান্ত থেকে পৃথিবীতে এসেছে। নতুন গবেষণায় সেই তত্ত্বই আরও জোরালো হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ডিএনএ এবং আরএনএতে মোট পাঁচটি যৌগিক উপাদান পাওয়া যায়— অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন, থায়ামিন এবং ইউরাসিল। এর মধ্যে প্রথম চারটি হল ডিএনএর যৌগিক উপাদান। আরএনএতে থায়ামিনের বদলে থাকে ইউরাসিল। রিউগুর মাটিতে ইউরাসিলের খোঁজ আগেই মিলেছিল। এ বার জানা গেল ডিএনএর সব যৌগিক উপাদানও রয়েছে এই মাটিতে। ডিএনএ এবং আরএনএর যৌগিক উপাদানগুলি যে আমাদের সৌরজগতে অন্যত্রও ছড়িয়ে রয়েছে, এই গবেষণায় তা আরও স্পষ্ট হল। তবে এর মানে এই নয় যে, রিউগুতে কোনও প্রাণের অস্তিস্ত রয়েছে। তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন জাপানি ওই গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা জাপান এজেন্সি ফর মেরিন-আর্থ অ্যান্ড টেকনোলজির বায়োজিওকেমিস্ট তোশিকি কোগা। সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে তিনি বলেন, “গ্রহাণুতে এমন কিছু যৌগিক উপাদান রয়েছে, যা প্রাণের সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
পৃথিবীর বাইরে ডিএনএ এবং আরএনএর যৌগিক উপাদানের সন্ধান এই প্রথম বার মিলল, এমন নয়। অতীতেও মিলেছে। ২০১৯ সালে নাসা ‘বেন্নু’ নামে এক গ্রহাণু থেকে মাটি সংগ্রহের জন্য ‘ওসিরিস-রেক্স’ নামে এক মহাকাশযান পাঠিয়েছিল। ২০২৩ সালে সেটি পৃথিবীতে ফেরে। গত বছরের এক গবেষণায় সেই ‘বেন্নু’র মাটি থেকেও ডিএনএ এবং আরএনএর যৌগিক উপাদানগুলি পাওয়া গিয়েছে। এ ছাড়া পৃথিবীতে আছড়ে পড়া বেশ কিছু উল্কাপিণ্ডেও এমন কিছু উপাদানের সন্ধান মিলেছে।
তবে এই রিউগুতে এই উপাদানগুলির সন্ধান মহাকাশবিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ দিন ধরেই অনুমান করে আসছেন, ডিএনএ এবং আরএনএর এই উপাদানগুলি বাইরে থেকে পৃথিবীতে এসেছে। তাঁদের অনুমান, পৃথিবী সৃষ্টির শুরুর দিকে কোনও গ্রহাণুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্রাণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পৃথিবীতে এসেছিল। যদিও এই ধারণা প্রমাণ করার মতো পোক্ত প্রমাণ নেই। এ বার সাম্প্রতিক গবেষণা বিজ্ঞানীদের ওই ধারণাকেই আরও জোরালো করল।