Volcanic Eruption in Pacific Ocean

আকাশে ভাসমান বিষাক্ত মেঘকে ধ্বংস করেছিল আগ্নেয়গিরির প্রবল অগ্ন্যুৎপাত! কী ভাবে? নতুন হদিসে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা

আগ্নেয়গিরি নিয়ে একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নতুন কিছু তথ্যের হদিস পেয়েছেন। জানতে পেরেছেন, আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত মেঘের বিষ ধ্বংস করার ওষুধও লুকিয়ে রয়েছে সেই আগ্নেয়গিরির মধ্যেই!

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
Share:

প্রশান্ত মহাসাগরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নিয়ে গবেষণা চলছে। —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলির মধ্যে অন্যতম বলে দাবি করেন কেউ কেউ। অগ্ন্যুৎপাতের প্রবল অভিঘাতে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে যায় আকাশের দিকে। কখনও কখনও সেই ধোঁয়া বিষাক্ত মেঘ হয়ে ভাসতে থাকে। আবার, আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ ঠেলে বেরিয়ে আসা ম্যাগমা বা উত্তপ্ত গলিত শিলা ভাসিয়ে নিয়ে যায় আশপাশের সব কিছু। এ হেন আগ্নেয়গিরিকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। কারণ, তাতেই লুকিয়ে রয়েছে পৃথিবীর নিবিড়তম, গভীরতম রহস্যের আভাস।

Advertisement

সম্প্রতি আগ্নেয়গিরি নিয়ে একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নতুন কিছু তথ্যের হদিস পেয়েছেন। তাঁরা জানতে পেরেছেন, আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত মেঘের বিষ ধ্বংস করার ওষুধও লুকিয়ে রয়েছে সেই আগ্নেয়গিরির মধ্যেই! প্রকৃতি যেমন বিষ তৈরি করে, তেমন প্রাকৃতিক উপায়ে সেই গরল পানও করতে পারে! প্রলয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরির এই ‘গুণ’ নিয়ে আলোচনা চলছে বিস্তর।

২০২২ সালে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের টোঙ্গা দ্বীপের কাছে সমুদ্রে নিমজ্জিত আগ্নেয়গিরি হুঙ্গা টোঙ্গা-হুঙ্গা হাপাইতে প্রবল বিস্ফোরণ হয়েছিল। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি এবং প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সেই অগ্ন্যুৎপাতে ফরম্যালডিহাইডের উপস্থিতি টের পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আগ্নেয়গিরি থেকে যে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত মিথেন নির্গত হয়, তা ধ্বংস করার অন্যতম কারিগর এই ফরম্যালডিহাইড। ছাইয়ের মেঘে বিষক্ষয়ের সূত্র মিলেছিল সেই হদিস থেকে। নেদারল্যান্ডসের সংগঠন অ্যাকাসিয়া ইমপ্যাক্ট ইনোভেশন বিভি-র বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। নেতৃত্বে ছিলেন বায়ুমণ্ডল সংক্রান্ত গবেষক মার্টেন ভান হারপেন। তাঁদের গবেষণাটি ‘নেচার কমিউনিকেশন্‌স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হারপেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় যে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, তা সকলেই জানেন। তাতে বায়ু দূষিত হয়। তবে এটা আমাদের জানা ছিল না যে, আগ্নেয়গিরির ছাইও সেই দূষণ রোধে সক্ষম।’’

Advertisement

মিথেন একটি ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাস। প্রাকৃতিক ভাবেই বায়ুমণ্ডলে তা উপস্থিত থাকে। একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত মিথেন পৃথিবীতে প্রয়োজন। তা এই গ্রহের তাপমাত্রাকে জীবনধারণের উপযোগী করে রাখে। তবে অতিরিক্ত মিথেনে ঘটতে পারে বিপর্যয়। এই গ্যাস তাপকে আটকে রেখে পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমে বাড়িয়ে তোলে। ত্বরান্বিত হয় বিশ্ব উষ্ণায়ন। তাই দীর্ঘ দিন ধরেই মিথেনের মোকাবিলার নিত্যনতুন উপায় খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। আগ্নেয়গিরির মধ্যে সেই হদিস মেলায় তাঁদের কৌতূহল বেড়ে গিয়েছে।

মিথেনকে দ্রুত ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযোগী ক্লোরিন। এতে একটি অযুগ্ম ইলেকট্রন রয়েছে, যা মিথেনের সংস্পর্শে এসে হাইড্রোজ়েন পরমাণুকে আঁকড়ে ধরে এবং শৃঙ্খল বিক্রিয়া ঘটায়। তাতে মিথেন ভেঙে অন্য যৌগে পরিণত হয়। এই শৃঙ্খলের একটি অংশ ফরম্যালডিহাইড, যা হুঙ্গা টোঙ্গা-হুঙ্গা হাপাইয়ের উদ্গীরণে সক্রিয় ছিল বলে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন। মিথেন ভাঙার শৃঙ্খল এবং ফরম্যালডিহাইডের কার্যকারিতার কথা ২০২৩ সালে প্রথম জানিয়েছিলেন হারপেনরাই। সাহারার ধূলিকণা এবং সমুদ্রের জলকণার মাধ্যমে মিথেনের মোকাবিলার উপায় তাঁরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণাতেও তা কাজে লেগেছে।

কী ঘটেছিল টোঙ্গা দ্বীপে?

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে সমুদ্রের জল এবং বাষ্প প্রবল বেগে ঠেলে উপরের দিকে উঠেছিল। বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হয়েছিল তার ফলে এবং তা পৌঁছে গিয়েছিল সর্বোচ্চ উচ্চতায়। মেঘ হয়ে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী। গবেষকদের মতে, তার মধ্যে বিপুল পরিমাণ মিথেন, লবণ এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ ছিল। পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, এই সমস্ত উপাদানের মিশ্রণে সূর্যালোক পৌঁছোলে ক্লোরিন সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভাঙতে শুরু করে বিষাক্ত মিথেন। হারপেন জানিয়েছেন, তাঁরা টানা ১০ দিন ধরে ওই আগ্নেয়গিরির ধোঁয়া-মেঘ অনুসরণ করেছিলেন। দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত তা ভেসে গিয়েছিল। প্রমাণ মিলেছে, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ওই মেঘে অনবরত মিথেন ধ্বংস হয়েছে। যদিও অগ্ন্যুৎপাত থেকে উৎপন্ন মোট মিথেনের তুলনায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মিথেনের পরিমাণ অতি সামান্য। তবে বিষাক্ত এই গ্যাসটিকে বাগে আনার প্রাকৃতিক উপায় পেয়ে বিজ্ঞানীরা খুশি। আগামী দিনে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সমীকরণ ব্যবহার করা যাবে বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ হবে, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement