— প্রতীকী চিত্র।
পৃথিবীর জলের অভাব নেই। কিন্তু মিষ্টি জল? বিশ্বের মোট জলভান্ডারের খুব সামান্যই মিষ্টি জল বা স্বাদু জল। তারও আবার সিংহ ভাগই জমে রয়েছে পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে। যা মোটেও সহজলভ্য নয়।
আমাদের পৃথিবীর মোট তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থলভূমি। কিন্তু সেই জলের বেশির ভাগই লবণাক্ত, বা সমুদ্রের জল। শতকরা হিসাবে পৃথিবীতে প্রায় ৯৬.৫ ভাগ রয়েছে সমুদ্রের জল। অন্য লবণাক্ত জল রয়েছে প্রায় ০.৯ শতাংশ। বাকি ২.৫ শতাংশ মিষ্টি জল। তবে এরও সিংহ ভাগ আমাদের নাগালের বাইরেই রয়ে গিয়েছে।
বিশ্বকোষ ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ অনুযায়ী, আন্টার্কটিক বরফের চাদর (আইস শিট)-এর আয়তন প্রায় ২ কোটি ৮০ লক্ষ ঘন কিলোমিটার। এই বরফের চাদরে রয়েছে বিশ্বের মোট মিষ্টি জলের (ভূগর্ভস্থ জল-সহ) প্রায় ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ, পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই বরফের চাদরে পৃথিবীর মোট মিষ্টি জলের দশ ভাগের সাত ভাগই গচ্ছিত রয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-ও জানাচ্ছে, পৃথিবীর মোট মিষ্টি জলের সিংহ ভাগ (৬৮.৭ শতাংশ) জমে রয়েছে বিভিন্ন আইস ক্যাপ (আইস শিটের ক্ষুদ্র সংস্করণ। এর আয়তন হয় ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের কম। তার বেশি হলে সেগুলিকে আইস শিট বলে) এবং হিমবাহের মধ্যে। যা পৃথিবীর মিষ্টি জলের সার্বিক ভাণ্ডারের দুই তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি। এই তথ্য আপাত ভাবে কিছুটা স্বস্তির বলে মনে হতে পারে। পৃথিবীতে বিপুল পরিমাণে মিষ্টি জল মজুত রয়েছে বলে মনে হতে পারে অনেকের। তবে বাস্তব ততটাও ‘সুখকর’ নয়।
মিষ্টি জল মজুত করা এই বরফ সর্বত্র সমান ভাবে ছড়িয়ে নেই। ইউএসজিএস-এর হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট বরফের প্রায় ৯০ শতাংশই রয়েছে অ্যান্টার্কটিকায়। বাকি ১০ শতাংশের মতো রয়েছে গ্রিনল্যান্ডের আইস শিটে। এ ছাড়া সামান্য কিছু অংশ রয়েছে বিভিন্ন পার্বত্য হিমবাহে। আমেরিকার ‘ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টার’ অনুযায়ী, অ্যান্টার্কটিক আইস শিট ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এবং এর আয়তন ৩ কোটি ঘন কিলোমিটারের কাছাকাছি। দুই সংস্থাই জানাচ্ছে, আন্টার্কটিকার এই একটিমাত্র আইস শিটেই বিশ্বের মোট মিষ্টি জলের দশ ভাগের সাত ভাগ জমে রয়েছে।
কিন্তু কোনও কিছুর অস্তিত্ব থাকা এবং তা ব্যবহারের উপযোগী হওয়া— দু’টি এক বিষয় নয়। এই জমাট বাধা মিষ্টি জলের প্রায় পুরোটাই দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ করতে পারে না। অর্থাৎ, তা সহজে ব্যবহারযোগ্য নয়। প্রথমত, দক্ষিণ মেরুর এই আন্টার্কটিকা মহাদেশে কোনও স্থায়ী মনুষ্যবসতি নেই। এই মেরু অঞ্চল মনুষ্যবসতি থেকে বহু দূরে অবস্থিত। তা ছাড়া এখানে জমে থাকা বরফ কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত পুরু। পাশাপাশি এগুলি এতটাই শীতল পরিবেশে জমে রয়েছে যে তা তুলে আনাও চ্যালেঞ্জের বিষয়। অর্থাৎ, পৃথিবীর মিষ্টি জলের সবচেয়ে বড় ভান্ডারটিই মানুষের কাছে দৃশ্যত সবচেয়ে কম ব্যবহারযোগ্য।
‘স্পেস ডেইলি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জমাট বাধা অংশটুকু বাদ দিলেও বাকি অংশের বেশির ভাগও মানুষের নাগালের বাইরে। কারণ, মিষ্টি জলের প্রায় ৩০ শতাংশ হল ভূগর্ভস্থ জল। এর একটি বড় অংশ মাটির এতটাই নীচে রয়েছে যে পাম্পের মাধ্যমে তা তুলে আনা আর্থিক ভাবে লাভজনক নয়। এই সব বাদে বাকি যে অংশটুকু পড়ে থাকে, সেটিই আসলে মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে টিকে থাকতে সাহায্য করে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোশ্যাইটির তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর মিষ্টি জলের মাত্র এক শতাংশের মতো মানুষের কাছে সহজলভ্য থাকে। আবার আমেরিকার পরিবেশরক্ষা সংস্থা (ইউএসইপিএ)-র মতে, সহজলভ্য মিষ্টি জলের পরিমাণ এক শতাংশেরও কম। তাদের বক্তব্য, পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে জল আছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আসল বিষয় হল তার এক শতাংশেরও কম পরিমাণ জল মানুষের কাছে ব্যবহারের উপযোগী।
তবে এর মানে এমন নয় যে পৃথিবী জলশূন্য হয়ে পড়ছে। বরং বিশ্বের জলভাণ্ডারের বাস্তব পরিসংখ্যানকে স্পষ্ট করে এই তথ্য। উল্লেখ্য, ভূপৃষ্ঠে যে মিষ্টি জল রয়েছে, তা-ও বিশ্বের সর্বত্র সমান ভাবে বণ্টিত হয় না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোশ্যাইটি-র তথ্য অনুযায়ী, ভূপৃষ্ঠে থাকা মিষ্টি জলের সিংহ ভাগই রয়েছে ব্রাজ়িল, রাশিয়া, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, চিন, কলম্বিয়া এবং আমেরিকায়।