মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা। —ফাইল চিত্র।
প্রাচীন নগর সভ্যতাগুলি যখন বিকশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছিল আর্থিক বৈষম্যও। গত কয়েক দশক ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ এই ধারণার উপরেই জোর দিয়ে এসেছেন। নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের সিংহ ভাগ প্রায়শই চলে যেত শাসক শ্রেণি এবং অভিজাত পরিবারের হাতে। তবে মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতায় ধরা পড়েছে এক ভিন্ন চিত্র। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সেই আভাস মিলেছে।
ব্রোঞ্জ যুগের অন্যতম উৎকর্ষ শহর মহেঞ্জোদাড়ো। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হারিয়ে যাওয়া এই নগর সভ্যতাকে আবিষ্কা করেছিলেন বাঙালি প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মহেঞ্জোদারোর নগর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল আনুমানিক ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। যদিও তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দাবি করা হয়, ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। এ বার জানা গেল, প্রাচীন এই নগর সভ্যতা। সম্পদ বিন্যাসেও বৈষম্য ছিল তুলনামূলক কম।
ব্রিটেনের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরীক্ষা করে দেখেন। সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম বড় এই শহরের আবাসন বিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখেন তাঁরা। তাতে দেখা যায়, অন্য প্রাচীন নগর সভ্যতার তুলনায় মহেঞ্জোদাড়োয় বৈষম্যের মাত্রা কম ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধানও কমে এসেছিল বলে আভাস মিলেছে গবেষণায়। গত ১৮ মার্চ এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছেন ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
মহেঞ্জোদাড়োয় অতীত খননকার্যে যে সব নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, মূলত সেগুলিই বিশ্লেষণ করে দেখেন ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক দলের প্রধান অ্যাডাম গ্রিন এবং তাঁর সহযোগীরা। প্রাচীন ওই নগরে বাড়িগুলির আকারের উপর জোর দেন তাঁরা। পাশাপাশি আর্থিক বৈষম্য কেমন ছিল, তা বোঝার জন্য ‘গিনি কোএফিশিয়েন্ট’ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। সম্পদের বণ্টন কেমন ছিল, তা বোঝার জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। ‘গিনি কোএফিশিয়েন্ট’-এর মান যত কম হয়, আয় এবং সম্পদের বণ্টন তত সুষম বলে ধরা হয়। গবেষকদের দাবি, মেসোপটেমিয়ার বা ব্রোঞ্জ যুগের গ্রিস শহরগুলির তুলনায় মহেঞ্জোদাড়োয় বৈষম্য অনেক কম ছিল।
গবেষকদলের প্রধান গ্রিনের কথায়, “মহেঞ্জোদাড়ো যে সমসাময়িক অন্য বড় সমাজব্যবস্থার থেকে আলাদা ছিল, তা স্পষ্ট। প্রাচীন মিশরে শাসকদের সমাধির জন্য পিরামিড নির্মাণ করা হত। ব্রোঞ্জ যুগে গ্রিসে অভিজাত শ্রেণির জন্য প্রাসাদ গড়ে তোলা হত। অন্য দিকে, মহেঞ্জোদাড়োয় এমন কিছু ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যয় হত, যার সুফল গোটা জনগোষ্ঠী ভোগ করত।”
তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকদের দাবি, মহোঞ্জোদারোয় নগর সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়নি। বরং তা কমে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাড়িগুলির আকারও প্রায় একই রকম হয়ে গিয়েছিল। ছোট এবং বড় বাড়িগুলির মধ্যে ফারাক কমে এসেছিল। উল্লেখ্য, তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতায় কোনও প্রাসাদোপম ভবন, শাসকের বিশাল মূর্তি কিংবা সোনা বা অন্য কোনও বিলাসবহূল সামগ্রীতে ভরা সমাধিও আবিষ্কার হয়নি। যা ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে আসা দাবিকে অনেকাংশে সমর্থন করে।
অন্য প্রাচীন নগর সভ্যতাগুলিতে শাসক বা তার সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে প্রচুর সম্পদ ব্যয় হত বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে। তবে মহেঞ্জোদাড়ো হেঁটেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। সুসংগঠিত সড়ক ব্যবস্থা এবং উন্নত নিকাশি ব্যবস্থার জন্য পরিচিতি পেয়েছিল মহেঞ্জোদাড়ো। এই নিকাশি ব্যবস্থা কোনও অভিজাত এলাকার মধ্যে সীমিত ছিল না। গোটা মহেঞ্জোদারোর সর্বত্রই এই ব্যবস্থা দেখা যায়। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই একই ধরনের সমতার আভাস মিলেছে। ওই সময়ে ব্যবসায়িক কাজে যে সিলমোহরগুলি ব্যবহার হত, তা মহেঞ্জোদাড়োর সাধারণ বাড়িগুলিতেও পাওয়া গিয়েছে। ফলে এগুলি যে শুধুই শাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকত, এমন কোনও প্রামাণ্য তথ্য পাননি প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।