ডাইনোসর যুগের সেই কুমিরেরা দেখতে কেমন ছিল, জানা গেল সাম্প্রতিক গবেষণায়। — প্রতীকী চিত্র।
ডাইনোসর যুগে ঘুরে বেড়াত ওরা। বেশির ভাগ সময় কাটাত জলেই। নিজেদের সময়ের অন্যতম সেরা শিকারি। এমনকি ডাইনোসরদেরও চিবিয়ে খেত। কথা হচ্ছে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই দৈত্যাকার কুমিরদের নিয়ে। প্রাগৈতিহাসিক এই প্রাণীদের একদা অস্তিত্বের কথা জানা গিয়েছিল কয়েক দশক আগেই। ধীরে ধীরে তথ্যও মিলতে শুরু করেছিল। তবে এই ডাইনোসরখেকো কুমিরেরা দেখতে কেমন ছিল, তা জানা গেল এত দিনে।
ডিনোসুচাস স্কুইমেরি। দেখতে কুমিরের মতোই। তবে আকারে অনেক বড়। বর্তমানে যে কুমিরদের দেখা যায়, তারা এদের ধারেকাছেও নেই। শারীরিক গড়ন অনেকটা অ্যালিগেটর কুমিরের মতো। অ্যালিগেটরদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘ইউ’ আকৃতির চওড়া থুতনি। এদেরও তেমনই ছিল। ডাইনোসরখেকো এই কুমির লম্বায় ছিল প্রায় ৩২ ফুট। সেখানে আধুনিক অ্যালিগেটর গড়ে ১১-১৪ ফুট লম্বা হয়। স্ত্রী অ্যালিগেটর আরও ছোট। বিজ্ঞানীদের অনুমান, দৈত্যাকার এই কুমিরেরাই ছিল আধুনিক অ্যালিগেটরের পূর্বসূরিদের নিকটাত্মীয়।
আজ থেকে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ৭ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে এরা ঘুরে বেড়াত পৃথিবীতে। কোন কোন অঞ্চলে এদের অস্তিত্ব ছিল, তা এখনও অস্পষ্ট। তবে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে এদের একদা অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। উত্তরপূর্ব আমেরিকার নদী এবং উপকূলীয় জলাভূমি এলাকায় এই ডাইনোসরখেকো কুমিরেরা বাস করত। গত কয়েক দশক ধরেই আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডিনোসুচাস স্কুইমেরি জীবাশ্মের নমুনা পাওয়া যাচ্ছিল। এখন সেগুলি সংরক্ষিত রয়েছে ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে, নিউ ইয়র্কের আমেরিকান মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি এবং জর্জিয়ার টেলাস সায়েন্স মিউজ়িয়ামে।
জর্জিয়ার টেলাস সায়েন্স মিউজ়িয়ামে ‘ডিনোসুচাস স্কুইমেরি’-র পূর্ণাঙ্গ জীবাশ্মের প্রতিকৃতি। ছবি: সংগৃহীত।
কলম্বাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের অধ্যাপক তথা কুমির বিশেষজ্ঞ ডেভিড স্কুইমার গত চার দশক ধরে এগুলির উপরে গবেষণা করেন। জীবাশ্ম-প্রমাণ অনেক আগে পাওয়া গেলেও এই প্রজাতির নামকরণ হয় মাত্র পাঁচ বছর আগে। ২০২০ সালে স্কুইমারের নামানুসারেই এই প্রজাতির নামকরণ হয় ডিনোসুচাস স্কুইমেরি। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক এই কুমির দেখতে কেমন ছিল, তা তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
গত কয়েক দশক ধরে যে জীবাশ্মের টুকরোগুলি পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে ডিনোসুচাস স্কুইমেরির সম্পূর্ণ অবয়বের অনুমান করা সম্ভব ছিল না। ওই টুকরো টুকরো জীবাশ্মগুলি একসঙ্গে নিয়ে বিশ্লেষণ করে একটি অবয়ব তৈরির চেষ্টা করেন স্কুইমার এবং তাঁর সহকারীরা। এই কাজে তাঁদের সাহায্য করে জর্জিয়ার টেলাস সায়েন্স মিউজ়িয়ামও। জীবাশ্মগুলি কয়েক বছর ধরে বিশ্লেষণের পরে এই ডাইনোসরখেকো কুমিরদের অবিকল প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) তৈরি করতে পেরেছেন। বর্তমানে সেই রেপ্লিকাটি সংরক্ষিত রয়েছে জর্জিয়ার ওই জাদুঘরে।
ডিনোসুচাস স্কুইমেরি কতটা বড় ছিল, তা ওই রেপ্লিকা থেকেই স্পষ্ট। গড়ে এরা এক একটি বাসের সমান লম্বা হত। কোনও কোনওটি এর চেয়েও বেশি বড় হত। এদের মুখের হা এতটাই বড় ছিল যে এক জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অর্ধেক শরীরই ঢুকে যেতে পারে মুখের মধ্যে। ছিল বড় বড় দাঁত, যেগুলি প্রায় ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হত। ছোটখাটো ডাইনোসর এদের কাছাকাছি চলে এলে, এরা তাদেরও খেয়ে নিতে পারত।
প্রাগৈতিহাসিক এই কুমিরদের জীবাশ্ম প্রথম মেলে ১৮৫০ সালে। আমেরিকায় পাওয়া ওই জীবাশ্মটিই ছিল হারিয়ে যাওয়া ডিনোসুচাস গণের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রথম পরিচয়। তার পর থেকে এই গণের বিভিন্ন প্রজাতির শ্রেণিবিভাগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে বিতর্ক চলেছে। আলোচনা চলেছে। এখনও পর্যন্ত ডিনোসুচাসের যত জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়েছে, তার ভিত্তিতে এই প্রাগৈতিহাসিক কুমিরকে তিনটি প্রজাতিতে ভাগ করা হয়। ডিনোসুচাস রিওগ্র্যান্ডেনসিস এবং ডিনোসুচাস হ্যাচেরি— এই দুই প্রজাতিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল আগেই। পাঁচ বছর আগে চিহ্নিত করা হয় ডিনোসুচাস স্কুইমেরিকেও।
জীবাশ্ম গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীদের অনুমান, ডিনোসুচাস রিওগ্র্যান্ডেনসিস এবং ডিনোসুচাস হ্যাচেরি মূলত আমেরিকার পশ্চিমে মন্টানা থেকে উত্তরে মেক্সিকো পর্যন্ত অঞ্চলে বিচরণ করত। অন্য দিকে ডিনোসুচাস স্কুইমেরি নিউ জার্সি এবং মিসিসিপি এলাকায় এবং আটলান্টিক উপকূলে ঘুরে বেড়াত।
গবেষকদলের প্রধান স্কুইমারের কথায়, “এই কুমির এতটাই বড় ছিল যে বেশির ভাগ ডাইনোসরকেই মেরে ফেলতে পারত। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, আমরা ডাইনোসরদের জীবাশ্মে যে কামড়ের চিহ্ন দেখতে পাই, তার বেশির ভাগই পায়ের হাড় এবং লেজের হাড়ে। যদি কোনও প্রাণী একটি ডাইনোসরকে ধরতে যায়, তা হলে সেখান থেকেই তাদের ধরতে হবে।” গবেষকদলের সঙ্গে যুক্ত জীবাশ্মবিদ ক্রিস্টোফার ব্রোচুর কথায়, “এটি এক ধরনের অদ্ভুত প্রাণী ছিল। এটি বুঝিয়ে দেয় যে কুমিরেরা কোনও ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ (যাদের মধ্যে ডাইনোসর যুগ থেকে কোনও পরিবর্তন হয়নি) ছিল না। অন্য বিভিন্ন প্রাণীর মতো কুমিরেরাও বিবর্তিত হয়েছে।”