মার্কাস কাম্পোপিয়ানোর পরিবারের সদস্যেরা। —নিজস্ব চিত্র।
ইডেন গার্ডেন্সের গ্যালারিতে ইটালির কয়েক জন সমর্থক। থাকতেই পারেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি ইটালি। সে দেশের সমর্থকেরা খেলা দেখতে আসবেন, এর মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। অথচ তাঁরাই বিস্মিত করলেন।
খেলা শুরুর আগে স্টেডিয়ামে বাজানো হল দু’দেশের জাতীয় সঙ্গীত। ইটালির সমর্থকেরা নিজেদের দেশের জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলালেন। পরে ইংল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীতের সময় তাঁরাই গাইলেন গলা ছেড়ে! বিস্ময়ের শুরু ঠিক এখানেই। আগ্রহ তৈরি হল যাঁদের নিয়ে, তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ১১ জন। ইটালির জার্সি পরে খেলা দেখতে এসেছেন। অথচ ম্যাচের প্রথম বলে ফিল সল্ট চার মারতেই প্রায় লাফিয়ে উঠলেন সকলে! বিস্ময় আরও বাড়ল।
ওঁরা বেথ, ইজ়ি, বেলিন্ডা, জিয়ান্নি, গ্যাভিন, অনিতা। সকলে একই পরিবারের। ইটালির ক্রিকেটার মার্কাস কাম্পোপিয়ানোর পরিবারের সদস্য। কথা বলতে গিয়ে হল সমস্যা। উচ্চারণ ইংরেজদের মতো নয়। কিছুটা অন্য রকম। নিজে থেকেই কাজ সহজ করে দিলেন বেথ। মিডল অর্ডার ব্যাটারের স্ত্রী। মোবাইল নিয়ে সকলের নাম পরিচয় লিখে দিলেন।
আপনারা তো সকলে কাম্পোপিয়ানোর পরিবারের। ইংল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন! ইংরেজরা চার-ছয় মারলে লাফাচ্ছেন! ইটালির সাফল্য চান না? ব্যাটারের বোন ইজ়ি বললেন, ‘‘চাই। অবশ্যই চাই। আসলে আমরা ইটালীয় হলেও তিন পুরুষ ধরে ইংল্যান্ডের বাসিন্দা। ইংল্যান্ডও এখন আমাদের দেশ। আমরা ইংল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত গাই। যে দেশে জন্ম, বড় হওয়া, সব কিছু— সে দেশের সাফল্যে ভাল তো লাগবেই।’’
কাম্পোপিয়ানো পরিবারের সদস্যেরা মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামেও খেলা দেখেছেন। গ্রুপে ইটালির তিনটি ম্যাচ কলকাতায় হলেও দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল মুম্বইয়ে। কোন শহর বেশি ভাল লাগল? কাম্পোপিয়ানোর মা বেলিন্ডা বললেন, ‘‘আমাদের কলকাতা বেশি ভাল লাগছে। মুম্বইয়ে গরম বেশি। এখানকার আবহাওয়া বেশ ভাল।’’ পাশ থেকে কাম্পোপিয়ানোর কাকিমা অনিতা বলে উঠলেন, ‘‘চারটে ম্যাচ চারটে শহরে হলে আরও ভাল লাগত আমাদের। তা হলে এই দেশটা আরও একটু ঘোরার সুযোগ হত। আপনাদের দেশটা খুব সুন্দর। এক একটা জায়গা একেক রকম।’’
কাম্পোপিয়ানো পরিবার অবাক করেই ছিল। দু’দলের সাফল্যই তাঁরা সমানতালে উদ্যাপন করছিলেন। উইকেট পড়লেও লাফিয়েছেন, ছক্কা হলেও! উপমহাদেশের ক্রিকেট মাঠে সমর্থনের এমন উভয় সত্তা বিরল। ইটালি তো ফুটবলের দেশ। তাঁদের বাড়ির ছেলে ক্রিকেটার হল কী করে? কাম্পোপিয়ানোর বাবা জিয়ান্নি বললেন, ‘‘আমার বাবা সাসেক্সের হয়ে ক্রিকেট খেলত। তখন থেকেই আমাদের পরিবারের প্রিয় খেলা ক্রিকেট। ছেলেও ছোট থেকে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী। আমরা ইংল্যান্ডে পাকাপাকি ভাবে থেকে গিয়েছি। ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসাটা নষ্ট হয়নি।’’ কাম্পোপিয়ানো কি পেশাদার ক্রিকেটার? জিয়ান্নি বললেন, ‘‘হ্যাঁ, ক্রিকেটই ওর পেশা। ও এখন সাসেক্সের দ্বিতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলে। তা ছাড়া সারে কাউন্টি ক্লাবের স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিনশনিং কোচও। ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের লেভেল থ্রি কোচ আমার ছেলে। যাদের বিরুদ্ধে খেলছে, তারা প্রায় সকলেই ওর পরিচিত।’’
ইটালীয় হলেও তাঁরা ফুটবল নিয়ে আগ্রহী নন। দেশের ফুটবলের অবস্থা তো ভাল নয়। আগামী বিশ্বকাপের যোগ্যতা এখনও অর্জন করতে পারেনি ইটালি। কী মনে হচ্ছে? কাম্পোপিয়ানোর কাকা গ্যাভিন প্রায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘ওনলি ক্রিকেট। ওনলি, ওনলি ক্রিকেট। ফুটবল নিয়ে এখন ভাবার সময় নেই আমাদের। পরে দেখা যাবে। এখন আমরা ক্রিকেট বিশ্বকাপ ছাড়া কিছু ভাবতে চাই না। এত দূরে তো এসেছি সেরা মানের ক্রিকেট দেখার জন্যই।’’ কথার ফাঁকে রবিবারের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে জানতে চাইলেন গ্যাভিন। সূর্যকুমার যাদবদের জয়ের পর এখানকার সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও জানতে চাইলেন।
ক্রিকেট বিশ্বকাপে মেতে থাকলেও বেথের বেশ আক্ষেপ রয়েছে। এখনও স্বামীর খেলা দেখার সুযোগ হয়নি। কারণ কাম্পোপিয়ানো প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পাননি। দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশে থাকলেও ব্যাট করার সুযোগ পাননি ইটালি ১০ উইকেটে জেতায়। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইডেনে স্বামীর ব্যাটিং দেখার আশায় রয়েছেন বেথ। খেলা শেষ হওয়ার পর দেখা করতে চান স্বামীর সঙ্গে। জেনে নিলেন ইডেনের সাজঘর কোন দিকে, কোথা দিয়ে যেতে হয়।
কথা বলতে বলতে শেষ হয়ে গেল ইংল্যান্ডের ইনিংস। ইডেনের ঘাসে ছায়া তখন বেশ লম্বা। ওঁরা ১১ জন বসে গ্যালারিতে। বিশ্বকাপার মার্কাসের ব্যাটিং দেখার অপেক্ষায়।