পাকিস্তানের অধিনায়ক সলমন আলি আঘা (বাঁ দিকে) ও কোচ মাইক হেসন। ছবি: পিটিআই।
রবিবার কলম্বোয় টসের পরেই কি ফয়সালা হয়ে গিয়েছিল ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের? যে সিদ্ধান্ত খেলার রং বদলে ফেলতে পারত, সেই সিদ্ধান্ত নিতেই কি ভুল করেছে পাকিস্তান? খেলা শেষে বার বার সেই আলোচনা হচ্ছে। যেখানে পরে ব্যাট করা কঠিন, সেখানে কোন পরিকল্পনায় আগে বল করার সিদ্ধান্ত নিলেন সলমন আলি আঘা? ম্যাচ হারার পর ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসন ও অধিনায়ক সলমন। তাঁদের এই প্রশংসার পরেই প্রশ্ন উঠছে, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই কি এই কাজ করছেন তাঁরা?
খেলাশেষে সলমন জানিয়েছেন, ভারত অপেক্ষাকৃত কঠিন পিচে ব্যাট করেছে। তাঁরা যখন বল করেছেন তখন উইকেটে ঘূর্ণি বেশি ছিল। তিনি বলেন, “প্রথম ইনিংসে পিচ অনেক কঠিন ছিল। সেখানে আমাদের ভাল বল করা উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের স্পিনারেরা সেটা পারেনি। ওরা ভাল ব্যাট করেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে এই পিচে ব্যাট করা তুলনামূলক ভাবে সহজ ছিল। প্রথম ইনিংসে যা ঘূর্ণি ছিল তার ২৫ শতাংশও দ্বিতীয় ইনিংসে ছিল না। কিন্তু আমরা পারলাম না। চাপ সামলাতে পারলাম না।”
কোচ হেসন আবার জানিয়েছেন, ঈশান কিশনের ইনিংস হারিয়ে দিয়েছে তাঁদের। তিনি বলেন, “ঈশান যে ভাবে খেলল, তাতে খেলা আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে গেল। পিচ থেকে আমরা যা সাহায্য পেয়েছি তার ২৫ শতাংশ পেয়েছে ভারত। ওদের বাকি ব্যাটারদের লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু ঈশান অন্য রকম ক্রিকেট খেলেছে।”
টস জিতে আগে বল করার সিদ্ধান্তের নেপথ্যকারণও ব্যাখ্যা করেছেন কোচ। হেসন বলেন, “দেখুন, প্রথম ইনিংস বল যা ঘুরেছে, দ্বিতীয় ইনিংসে তার অর্ধেকও ঘোরেনি। তাই প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। বিশেষ করে আমাদের স্পিন আক্রমণ যথেষ্ট শক্তিশালী। পরের দিকে পিচ মন্থর হয়নি। পাশাপাশি ঘূর্ণিও কমে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা ভাল খেলতে পারিনি। ঈশান যা খেলেছে তার ধারেকাছেও আমাদের কেউ যেতে পারেনি।”
কোচ, অধিনায়ক দু’জনেই হারের জন্য দায়ী করেছেন দলের ক্রিকেটারদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংকে। তাঁদের মতে, কঠিন পরিস্থিতিতে একটু বুদ্ধি করে খেলতে পারলে তাঁরা জিততে পারতেন। কিন্তু পাওয়ার প্লে-র মধ্যে ৪ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আর পারেননি। পিচের জুজু বা টস জিতে প্রথমে বল করার জন্য তাঁরা হারেননি।
কিন্তু প্রশ্ন তার পরেও উঠছে। চলতি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আগে প্রেমদাসায় তিনটি ম্যাচ হয়েছে। প্রথম ম্যাচে আয়ারল্যান্ডকে ২০ রানে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। প্রথমে ব্যাট করে ১৬৩ রান করে শ্রীলঙ্কা। সেই রান তাড়া করতে পারেনি আফগানিস্তান। দ্বিতীয় ম্যাচে আয়ারল্যান্ডকে ৬৭ রানে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। প্রথমে ব্যাট করে ১৮২ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ১১৫ রানে অল আউট হয়ে যায় আয়ারল্যান্ড। সেই অস্ট্রেলিয়াই আবার এই মাঠে জ়িম্বাবোয়ের কাছে ২৩ রানে হেরেছে। প্রথমে ব্যাট করে ১৬৯ রান করে জ়িম্বাবোয়ে। সেই রান তাড়া করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।
অর্থাৎ, চলতি বিশ্বকাপ দেখাচ্ছে, প্রেমদাসায় রান তাড়া করা কঠিন। এই বিশ্বকাপের আগে অবশ্য এই মাঠে ২৮ বার রান তাড়া করে জয় এসেছে। কিন্তু এ বার পরিস্থিতি আলাদা। মন্থর পিচে খেলা হচ্ছে। যা পরের দিকে আরও মন্থর হচ্ছে। ইচ্ছা করলেই বড় শট খেলা যাচ্ছে না। রান তাড়া করতে নেমে চাপে পড়লে সেখান থেকে বার হওয়া কঠিন। সেটা কি জানতেন না সলমনেরা?
কলম্বোর এই মাঠে এর আগে ছ’টি টি-টোয়েন্টির মধ্যে পাঁচটিতে ভারত ১৫০ রানের বেশি করেছে। পাঁচটিই জিতেছে তারা। অর্থাৎ, ভারতের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে এই মাঠে ১৫০ রান করাও কঠিন। সেই পরিসংখ্যান কি ছিল না পাকিস্তানের কাছে? তার পরেও টস জিতে বল করার সিদ্ধান্ত নিলেন সলমন। সেখানে সূর্যকুমার যাদব স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, টস জিতলে ব্যাট করতেন তাঁরা। সেটাই করলেন। ঈশানের ইনিংস না হলেও কি পাকিস্তান জিততে পারত? ১১৪ রান করতে যেখানে গোটা দল আউট হয়ে যায়, সেখানে ১৪০-১৪৫ রানও কি তাড়া করতে পারত তারা?
চলতি বিশ্বকাপে প্রেমদাসায় ম্যাচ জেতার ফর্মুলা খুব সহজ। টস জেতো। প্রথমে ব্যাট করো। ১৬০ রান বা তার বেশি করো। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে খেলা জিতে নাও। সেই সহজ ফর্মুলা ব্যবহার করতে পারত পাকিস্তান। তাদের হাতে ছয় স্পিনার ছিল। প্রথমে ব্যাট করে ১৬০ রানের কাছাকাছি তুলতে পারলে ভারতকেও তো চাপে ফেলতে পারত তারা। চাপ ছাড়া যে ইনিংস ঈশান খেললেন, রানের চাপ থাকলে কি তা পারতেন? সলমন, হেসনদের পরিকল্পনাতেই কি গলদ ছিল না? হারের পর সেই প্রশ্নই আরও বেশি করে উঠছে।