ইডেনের ফাঁকা গ্যালারি। ছবি: সংগৃহীত।
ময়দানের এক ক্রিকেট কর্তার বাড়িতে এই সময় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কিন্তু কেকেআর-পঞ্জাব ম্যাচের আগের দিন রবিবার সেই বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। এক জন দু’টি টিকিট চাইতে সেই কর্তা সঙ্গে সঙ্গে চারটি টিকিট দিয়ে বললেন, “আর লাগবে?”
সোমবার খেলা শুরু সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। দুপুর দেড়টার সময়েও ‘বুক মাই শো’-তে গিয়ে দেখা গেল, ১২টি ক্যাটেগরির সবগুলিতেই আসন রয়েছে। যদিও এই প্রতিবেদন লেখার সময় দুপুর ৩টে নাগাদ চারটি ক্যাটেগরি ভর্তি হয়ে গিয়েছে। বাকি আটটি ক্যাটেগরিতে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। আইপিএলে ইডেনে এই ছবি সাধারণত দেখা যায় না। অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যায়। ইডেন ‘হাউসফুল’ হয়ে যায়। কিন্তু এ বার তা হচ্ছে না।
সোমবারের কেকেআর-পঞ্জাব ম্যাচ ছাড়াও এখন ৯ এপ্রিলের কেকেআর-লখনউ সুপার জায়ান্টস এবং ১৯ এপ্রিলের কেকেআর-রাজস্থান রয়্যালস ম্যাচের টিকিট ছাড়া হয়েছে। অনলাইনে এই দু’টি ম্যাচের সব দামের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৯ এপ্রিল রবিবার হওয়া সত্ত্বেও।
ইডেনে টিকিটের দামের ১২টি ক্যাটেগরি রয়েছে। সবচেয়ে কম ১০০০ টাকা। সবচেয়ে বেশি ৪৫,০০০ টাকা। ১০০০ টাকার ক্যাটেগরিতে রয়েছে ডি১ ব্লক। সেই ব্লকে এখনও আসন ফাঁকা। ১২০০ টাকার টিকিটে সি১, জি১, এইচ১ ও কে১ ব্লকে বসে খেলা দেখা যায়। সি১ বাদে বাকি তিনটি ব্লকে আসন ফাঁকা রয়েছে। ১৫০০ টাকার টিকিট কেটে খেলা দেখা যায় বি১, ডি, ই, এফ১, এইচ, জে ও এল১ ব্লকে। ডি, জে ও এল১ ব্লকে এখনও আসন ফাঁকা।
২০০০ টাকার টিকিট কেটে সি, এফ, জি ও কে ব্লকে খেলা দেখা যায়। এফ ব্লকের সব টিকিট এখনও বিক্রি হয়নি। ক্লাব হাউসের আপার টায়ারে বসে খেলা দেখার জন্য খরচ করতে হয় ৩০০০ টাকা। এখনও সেখানে আসন ফাঁকা। এল ব্লকে বসে খেলা দেখতে খরচ ৩৩০০ টাকা। সেই ব্লকের অবশ্য কোনও আসন ফাঁকা নেই। ৩৫০০ টাকায় বি ব্লকের টিকিট পাওয়া যায়। সেখানেও আসন ফাঁকা। এল ব্লকের আরও একটি অংশে বসে খেলা দেখতে খরচ ৫০০০ টাকা। সেখানে সব আসন ভর্তি হয়ে গিয়েছে।
ক্লাব হাউসের লোয়ার টায়ারে ৮০০০ টাকা দামের আসন অবশ্য আর ফাঁকা নেই। তবে বি ব্লকের টিকিট এখনও কাটা যাবে। তার জন্য লাগবে ৮৫০০ টাকা। নাইটস প্যাভিলিয়নের ভিআইপি বক্সে বসে খেলা দেখার খরচ ২৮,০০০ টাকা। সেখানে কোনও আসন ফাঁকা নেই। সর্বোচ্চ ৪৫,০০০ টাকা খরচ করে খেলা দেখা যাবে নাইটস প্যাভিলিয়নের কর্পোরেট বক্সে বসে। সেখানেও আসন ফাঁকা রয়েছে। অর্থাৎ, এই ১২টি ক্যাটেগরির মধ্যে আটটি ক্যাটেগরিতে এখনও টিকিট কাটা যাচ্ছে।
ভারত যেখানে মাত্র গত মাসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে, সেখানে আইপিএল নিয়ে এই অনাগ্রহের কারণ কী? কেন এই হাল, তা খতিয়ে দেখে কয়েকটি কারণ উঠে আসছে।
যে তিনটি ম্যাচের টিকিট ছাড়া হয়েছে, তার মধ্যে দু’টি ম্যাচ কাজের দিনে। সাধারণত শনি বা রবিবার ম্যাচ থাকলে অনেক বেশি দর্শক খেলা দেখতে চান। ছুটির দিন থাকায় খেলা দেখার সুযোগ বেশি থাকে। যদিও ১৯ এপ্রিল রবিবার রাজস্থান ম্যাচ নিয়েও এখনও আগ্রহ নেই। আর কাজের দিনে তো টিকিটের চাহিদা এমনিই কম থাকবে। প্রতি বছর খেলা দেখতে চান বরানগরের বাসিন্দা অমিত সেন। তিনি বললেন, “ছুটির দিন পরিবারের সঙ্গে খেলা দেখতে যাই। কিন্তু এ বার তো প্রথম তিনটে ম্যাচই সপ্তাহের মাঝে। অফিস সামলে আর যাওয়া যাবে না।”
গত কয়েক দিনে গরম ও তার পাশাপাশি আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেড়েছে। ফলে ভ্যাপসা গরম লাগছে। এই গরমের কারণেই আবার বিকালের পর কালবৈশাখীর আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণে হয়তো আগ্রহ কমেছে। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত সুদীপা দত্তের কথায়, “গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। আবার বলছে সন্ধ্যায় ঝড়বৃষ্টি হবে। ছাতা নিয়ে তো ঢুকতে দেবে না। তবে কি জেনেশুনে খেলা দেখতে গিয়ে ভিজব। তাই যাচ্ছি না।”
আইপিএল নিয়ে আগ্রহ না থাকার সবচেয়ে বড় কারণ ভোট। এর আগেও নির্বাচনের বছরে আইপিএল হয়েছে। কিন্তু এ বার পরিস্থিতি আলাদা। এ বারের নির্বাচন সব দলের কাছেই কঠিন। বোঝা যাচ্ছে না, জনমত কোন দিকে যাবে। পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে সারা ক্ষণ ভোট নিয়ে আলোচনা। সেই কারণেই আইপিএল ঘিরে আগ্রহ কমেছে।
প্রতি বার ইডেনে চেন্নাই ও বেঙ্গালুরু ম্যাচ নিয়ে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু এ বার মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ও বিরাট কোহলিকে দেখতে পাওয়া যাবে না ইডেনে। সেই কারণে শুরু থেকেই কমেছে আগ্রহ। ধোনির ভক্ত কমলিনী ভট্টাচার্য বললেন, “প্রতি বার চেন্নাইয়ের খেলা দেখতে যাই। এ বারও যেতাম। হয়তো এ বারই শেষ খেলছেন ধোনি। কিন্তু সেই খেলাই তো ফেলল না। ধূর যাবই না দেখতে।” এক জনের কাছে বেঙ্গালুরু ম্যাচের দু’টি টিকিট চেয়েছিলেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার শৌভিক বসু। তখন তিনি জানতেন না, কোহলিদের খেলা ইডেনে দেওয়া হবে না। সূচি জানার পর তিনি বললেন, “অন্য কোনও ম্যাচ দেখতেই যাব না।”
তারকা ক্রিকেটারদের দেখতে মাঠে ভিড় হয়। কিন্তু কেকেআরের এই দলে তারকা তেমন নেই। অধিনায়ক অজিঙ্ক রাহানেও জাতীয় দলের ক্রিকেট থেকে সহস্র যোজন দূরে। সেই কারণে দলকে নিয়ে আগ্রহ কমছে। প্রতি বছর নিয়ম করে কেকেআরের ম্যাচ দেখতে যাওয়া ১৮ বছরের চন্দন মিত্র বললেন, “প্রতিটা দলে তারকা আছে। আমাদের কেকেআরেই নেই। যারা আছে তাদের খেলাও তথৈবচ। প্রথম দুটো ম্যাচ যা দেখলাম, তাতে মাঠে গিয়ে এই দলের খেলা আর দেখতে চাই না।”
অবশ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচের মতো আইপিএলেও যত টিকিট বিক্রি হয় তার থেকে বেশি টিকিট কমপ্লিমেন্টরি থাকে। সেই কারণে হয়তো শেষ পর্যন্ত মাঠ ভরবে। তবে দর্শকদের আগ্রহ যে কমছে তা ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগেও টিকিটের হাল থেকে পরিষ্কার।