গরম যত বাড়ছে, সব্জির দাম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। প্রবল গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। ফলে আমিষ অনেকেরই মুখে রুচছে না। শরীর-স্বাস্থ্যের কথা ভেবেও অনেকে ডিম-মাংস এড়িয়ে চলছেন। তা হলে পড়ে থাকল নিরামিষ। কিন্তু সে ক্ষেত্রেই ত্রাহি ত্রাহি রব বাজারে।
বনগাঁ মহকুমার বিভিন্ন বাজারে ঘুরে জানা গেল, গত বছরের তুলনায় এ বার গরমে সব্জির দাম গড়ে ৪-৫ টাকা করে বেশি। কৃষিপ্রধান বনগাঁ মহকুমাতেই যদি এই পরিস্থিতি হয়, তা হলে রাজ্যের অন্যত্র কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। বনগাঁয় চাষিরা অনেকেই খেতের সব্জি নিজেরাই সরাসরি হাটে-বাজারে এনে বিক্রি করেন। কয়েক হাত ঘুরে জেলা সদর বারাসত, কলকাতা বা রাজ্যের অন্যত্র সেই সব্জি যখন গিয়ে পৌঁছয়, তখন দাম বাড়ে আরও খানিক বেশি। চাষিরা জানাচ্ছেন, সামান্য বৃষ্টি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু টানা বৃষ্টি না পড়লে এ বার সব্জির জোগানে টান পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আরও দাম বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বনগাঁর বাজারে এখন কাঁচা পেঁপে বিকোচ্ছে ৩০ টাকা কিলোয়। যা গতবারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা। চন্দ্রমুখী আলু বিক্রি হচ্ছে কিলো প্রতি ২৬ টাকায়। জ্যোতি আলুর দাম ২০ টাকা কিলো। গতবার গরমে চন্দ্রমুখী আলুর দাম ছিল কেজি প্রতি ১০ টাকা। জ্যোতি আলু বিক্রি হয়েছিল কেজি প্রতি ৮ টাকায়।
কেন আলুর দামে এমন বাড়বাড়ন্ত?
বিক্রেতারা জানালেন, রোগের প্রকোপে এ বার আলুর ফলন কম। দাম বাড়ার সেটাই অন্যতম কারণ।
এ বার দেখে নেওয়া যাক অন্য কিছু সব্জির দাম।
ঝিঙে কেজি প্রতি ২৫ টাকা, ঢেঁরস ২০ টাকা, উচ্ছে ৫০ টাকা, বরবটি ২০ টাকা, বেগুন ১২ টাকা, পটল ১৫ টাকা, মিষ্টি কুমড়ো ২৫ টাকা, কাঁচা আম ১৫ টাকা, এঁচোড় ১৫ টাকা। গত বারের তুলনায় কেজি প্রতি দাম সব ক্ষেত্রেই ৪-৫ টাকা করে বেশি বলে ক্রেতারা জানাচ্ছেন। তবে পেঁয়াজের দাম তুলনায় কম। কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। কাঁচা লঙ্কার দাম আবার আকাশছোঁয়া। কেজি প্রতি ৮০ টাকায় লঙ্কা কিনতে ঝাঁঝে কুপোকাত বাঙালি। এক বিক্রেতা জানালেন, আগে কেউ যদি ৫০০ গ্রাম লঙ্কা কিনতেন, এখন কিনছেন ১০০ গ্রাম!
কেন সব্জির মূল্য এমন ধারা?
জেলা হর্টিকালচার দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, সব্জির উৎপাদন মোটামুটি ঠিকই আছে। কিন্তু মূল্য বাড়ার কারণ, কৃষি উপকরণ, রাসায়নিক সার ও সেচের দাম বেড়ে যাওয়া। রাসায়নিক সারের মূল্য বেড়েছে অনেকটাই। তা ছাড়া, বৃষ্টি না হওয়ায় সেচের খরচও বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।
অশোক চৌধুরী নামে এক প্রৌঢ় গত পঞ্চাশ বছর ধরে বনগাঁর ট বাজারে কেনাকাটা করছেন। তিনি জানালেন, এ বছর আলু ও পেঁপের দাম খুবই বেড়েছে। সক্কাল সক্কাল বাজারের থলি হাতে রীতিমতো নাকানিচোবানি খেতে হচ্ছে।
সব্জি বিক্রেতা অরুণ দাস কুড়ি বছর ধরে এই পেশায়। বললেন, ‘‘গত বছর এই সময় বেগুনের দাম অনেক কম ছিল। জ্যোতি আলু গতবার ৭-৮ টাকায় বিক্রি করেছি। এই দামে বিক্রিবাট্টা করতে আমাদেরও অসুবিধা হচ্ছে। লোকজন পরিমাণে কম কেনাকাটা করছেন।’’ তবে বাজারে জোগান ঠিক আছে বলে জানাচ্ছেন চাঁপাবেড়িয়ার বাসিন্দা, সব্জি বিক্রেতা সন্তু দে।
চাষিরা জানাচ্ছেন, চাঁদিফাটা গরমে পটলের মাচা শুকিয়ে যাচ্ছে। চাষ ঠিক রাখতে নিয়মিত সেচ দিতে হচ্ছে। ফলে চাষের খরচও বাড়ছে। সব্জির পাশাপাশি পাট ও তিল চাষেও গরমের কারণে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিলের ফুল ঝরে যাচ্ছে। পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। গোপালনগরের পাঁচপোতা গ্রামের পাট চাষি সিরাজুল রহমান জানালেন, ‘‘দৈনিক প্রতি বিঘে জমিতে ১৫০ টাকা জল দিতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে। তারপরেও পাটগাছ যে হারে বাড়ার কথা, তা হচ্ছে কই!’’
বৃষ্টি হচ্ছে না হচ্ছেই না, আবার হঠাৎ একদিনের শিলাবৃষ্টিতে মহকুমার বিস্তীর্ণ প্রান্তে সব্জির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যার প্রভাব শীঘ্রই বাজারে পড়তে চলেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
গত বছর দুর্গাপুজোর আগের নিম্নচাপের ভারী বৃষ্টিতে বনগাঁ মহকুমায় সব্জি চাষে যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। বিঘার পর বিঘার সব্জি জলের তলায় চলে গিয়েছিল। ফলে চাহিদা থাকলেও জোগান ছিল কম। শীতে এ বার বনগাঁয় সব্জির দাম ছিল অগ্নিগর্ভ। ভাবা গিয়েছিল, গরমে বুঝি দাম কিছুটা কমবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি!
বনগাঁর রবি সরকারের মোটের উপর স্বচ্ছল পরিবার। কিন্তু বাড়িতে দু’বেলা প্রায় ১২ জনের পাত পড়ে। তাঁরও অবস্থা শোচনীয়। বললেন, ‘‘দু’চারশো টাকা নিয়ে বাজারে গেলেও দেখছি নিমেষে সব টাকা শেষ, কিন্তু বাজারের থলিটুকু অর্ধেকও ভরল না।’’ চিন্তিত গলায় রবিবাবু বলেন, ‘‘আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারেই যদি এই হাল হয়, তা হলে নিম্ন আয়ের মানুষজনের কী না জানি অবস্থা!’’