সদ্য রাজপথে একসঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঝালমুড়ি ও ভেলপুরি খেয়ে বিপাকে পড়েছেন বিজেপি-র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। তারও আগে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ঘরছাড়াদের ফেরানোর দাবি জানাতে গিয়ে ফিশফ্রাই আপ্যায়ন গ্রহণ করে দলের মধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। ভেবেচিন্তে তাই সেই পথে না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলেন অধীর চৌধুরী! পাছে মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে ‘সৌজন্যে’র আবহ বিধানসভা ভোটের আগে কংগ্রেস সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে, তাই মমতার সঙ্গে প্রস্তাবিত বৈঠক এড়িয়ে যাওয়াই ঠিক করলেন অধীরেরা।
দলীয় বিধায়কদের অভাব-অভিযোগ জানাতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়ে কয়েক দিন আগে চিঠি দিয়েছিলেন কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা মহম্মদ সোহরাব। প্রথমে ঠিক ছিল বুধবার সেই বৈঠক হবে। পরে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে জানানো হয়, শুক্রবার মমতা বিধানসভায় আসবেন। স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেট হবে সেই দিনই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতৃত্ব ঠিক করেছেন, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ওই দিন বৈঠক করতে যাবেন না। বরং, স্বরাষ্ট্র বাজেটে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে রাজ্যের বেহাল আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারকে কড়া আক্রমণ করবেন। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর নিজেই এ দিন বিধানসভায় গিয়ে দলীয় বিধায়কদের সেই বার্তা দিয়ে এসেছেন। পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কংগ্রেস পরিষদীয় দলের তরফে পরে বৈঠকের সময় চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে ফের ফ্যাক্সও পাঠানো হয়েছে।
কেন মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের আহ্বান কেন নাকচ করা হল, সেই প্রসঙ্গে অধীরের ব্যাখ্যা, ‘‘শুক্রবার আমাদের অনেক বিধায়ক নিজের নিজের এলাকায় পুরসভার বোর্ড গঠনের কাজে ব্যস্ত থাকবেন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অনেক বিধায়কেরই মুখ্যমন্ত্রীকে অনেক কিছু বলার রয়েছে। বিধায়করা না থাকলে বৈঠকের কী লাভ! তাই আগামী সপ্তাহে সময় চাওয়া হয়েছে।’’
শুক্রবার অধিবেশনের বিরতিতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেই আবার দ্বিতীয়ার্ধে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র বাজেটে সভায় দাঁড়িয়ে তাঁকেই আক্রমণ করা যে অস্বস্তিকর, তা মানছেন অধিকাংশ কংগ্রেস বিধায়কই। বর্ষীয়ান এক বিধায়কের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সৌহার্দ্যের পরিবেশ থাকবেই। বৈঠকের পরেই অধিবেশন কক্ষে গিয়ে পুলিশ দফতরের সমালোচনা করাটা বড্ড বিসদৃশ ঠেকত!’’ বিধানসভায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে সমালোচনার সুযোগ কাজে লাগাতেই যে তাঁদের বৈঠক নাকচের সিদ্ধান্ত, তার উল্লেখ করে অধীরও এ দিন বলেন, ‘‘পুলিশ বাজেটে ভাল ভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন, তা আমাদের বিধায়কেরা মুখ্যমন্ত্রীকে জানাবেন। পরে যে দিন আবার মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সময় দেবেন, সে দিনও আমাদের বিধায়কদের বিরুদ্ধে কী ভাবে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা কেমন, তা নিয়ে ফের বলার সুযোগ পাব।’’
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধীরা যখন ক্রমাগত সরকারকে আক্রমণ করছে, সেই সময় কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের তরফে সোহরাব মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে সাক্ষাতের সময় চাইতে গেলেন কেন, তা নিয়েও দলের অন্দরে প্রশ্ন আছে। খোদ প্রদেশ সভাপতিও এ দিন বিধায়কদের বৈঠকে এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে কংগ্রেস সূত্রের খবর। বিরোধী দলের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি বৈঠকে ফিশফ্রাই-সৌজন্য বা সাম্প্রতিক ঝালমুড়ি-বিতর্কে না জড়ানোর পক্ষপাতী অধীর। সে জন্যই ব্যক্তি মমতা নয়, অধীর চান দলীয় বিধায়কেরা মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারকেই আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা জানান। অধীরের সাফ বক্তব্য, ‘‘ফিশফ্রাই বা ঝালমুড়ির জন্য আমরা বুভুক্ষু নই! ভাল খাবার দিলে খাব। উনি (মুখ্যমন্ত্রী) তো খাওয়াবেন সরকারের টাকায়। নিজের পকেট থেকে তো খাওয়াবেন না!’’ তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের প্রস্তাব কংগ্রেসের খারিজ করে দেওয়াকে ‘অসৌজন্য’ বলেই ব্যাখ্যা করছেন।
বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের প্রতি সুর নরমের বার্তা না দিতে চেয়ে কংগ্রেস যে দিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব খারিজ করেছে, সে দিনই বিধানসভায় দলীয় বিধায়ক মানস ভুঁইয়া আবার রাজ্যের আর্থিক পাওনা আদায়ে মমতা-সরকারের সঙ্গে একযোগে কেন্দ্রের কাছে দরবারের কথা বলেছেন। রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে দিল্লিতে সর্বদল অভিযান হলে কংগ্রেস সামিল হতে রাজি বলে মানসবাবু সভায় জানান।