(বাঁ দিকে) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসকে ‘স্বামী’ সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমাজমাধ্যমে পোস্ট করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আবার তাঁর আগ্রাসী সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা দেখালেন’। মমতার সেই পোস্টের পৌনে চার ঘণ্টা পরে মোদীর ‘স্বামী’ সম্বোধনের ব্যাখ্যা দিল বিজেপি। ঠাকুর রামকৃষ্ণকে ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ স্বামী’ বলে এক্স হ্যান্ডলে উল্লেখ করলেন দলের সমাজমাধ্যম বিভাগের সর্বভারতীয় প্রধান অমিত মালবীয়। মমতার একটি সাম্প্রতিক ভাষণের অংশবিশেষও পোস্ট করেছেন মালবীয়, যেখানে মমতাকে একাধিক বার ‘শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব’ বলতে শোনা যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ছিল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্মতিথি। সেই উপলক্ষেই মোদী সকালে সমাজমাধ্যমে হিন্দিতে একটি পোস্ট করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী পোস্টটি করেছিলেন সকাল ৯টা ১২ মিনিটে। সে পোস্ট চোখে পড়ার পর প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তোপ দেগে মমতা পোস্টটি করেন সকাল ১১টা ২০ মিনিটে। তিনি লেখেন, ‘‘আমি স্তম্ভিত! প্রধানমন্ত্রী আবার পশ্চিমবঙ্গের মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি তাঁর আগ্রাসী সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা দেখালেন।’’ মালবীয় তার উত্তর দিয়েছেন বেলা ৩টে ৫ মিনিটে। মমতার পোস্টের প্রথম লাইনের আদলেই মালবীয় সেখানে লিখেছেন, ‘‘আপনার অজ্ঞানতা দেখে আমরাও স্তম্ভিত!’’ তার পরে লিখেছেন, ‘‘সারা বিশ্বের শ্রদ্ধার পাত্র মহান সিদ্ধপুরুষ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মতিথিতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ‘স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংসজি’ সম্বোধন করেছেন। এ ক্ষেত্রে ‘স্বামী’ শব্দের ব্যবহারের সঙ্গে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের নামের আগে ব্যবহৃত স্বামী উপাধির কোনও সম্পর্ক নেই।’’
ঠাকুর রামকৃষ্ণকে ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ স্বামী’ বলে এর পরেই উল্লেখ করেছেন মালবীয়। এক্স পোস্টের শেষাংশে অদ্বৈত বেদান্তের আধ্যাত্মিক দর্শনের কথা টেনে এনেছেন। ‘স্বামী’ শব্দকে ‘প্রভু’ বা ‘ঈশ্বর’ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করে তিনি লিখেছেন, ‘‘রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা প্রচারিত অদ্বৈত বেদান্তই ঈশ্বর এবং ব্যক্তির একাত্মতার কথা বলে।’’
ওয়াকিবহালেরা বলছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ তোতাপুরীর থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন। ফলে যে কোনও দীক্ষিতকেই ‘স্বামী’ সম্বোধন করা যায়। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁরা বলছেন, ‘‘এটি ভুল নয়। কিন্তু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘স্বামী’ বললে কানে লাগে। তার কারণ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসকে ‘ঠাকুর’ বলাই বাঙালি সমাজের প্রচলন।’’ তাঁদের বক্তব্য, ‘‘প্রতিটি ভাষার নিজস্ব সংস্কৃতি এবং গতিবিধি আছে। সেই ভাষার ক্ষেত্রে সেটি রক্ষা করতে হয়। নইলে খটকা লাগবেই।’’ উদাহরণ স্বরূপ তাঁরা বলেছেন শিবাজির কথা। মহারাষ্ট্রে শিবাজিকে ‘ছত্রপতি শিবাজি’ বা ‘শিবাজি মহারাজ’ বলাটাই রীতি। ‘শ্রীশিবাজি’ বললে সেটা ভুল হবে না। কিন্তু মরাঠিদের কানে লাগবে। শ্রীরামকৃষ্ণের ক্ষেত্রেও ‘ঠাকুর’ না বলে ‘স্বামী’ বললে বাঙালি শ্রবণে তা ঠিক লাগবে না।
ঠিক যে লাগেনি, তা বুঝেই সম্ভবত মালবীয় ব্যাখ্যাটি উপস্থাপিত করেছেন। এবং শুধু ব্যাখ্যা দিয়েই ক্ষান্ত হননি। গত ৫ জানুয়ারি গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাস কর্মসূচির মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার অংশবিশেষ ওই পোস্টেই জুড়ে দিয়েছেন তিনি। সেই ভিডিয়োয় দেখা যাাচ্ছে যে, মমতা বলছেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন। কী বলেছিলেন? ধর্ম মানে ধারণ। ধর্ম মানে মানবতা। ধর্ম মানে পবিত্রতা। ধর্ম মানে বিদ্বেষ নয়, ধর্ম মানে শান্তি। এটা বলেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব, যিনি গীতার বাণী লিখেছিলেন, উপদেশ দিয়েছিলেন।’’ মালবীয়ের পোস্ট দেখার পরে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীরা মমতার ভাষণের ওই ভিডিয়ো দ্রুত ‘শেয়ার’ করতে শুরু করেছেন।