কেতুগ্রামে ভাঙল বাঁধ।শনিবার তোলা নিজস্ব চিত্র।
প্রতিদিনের মতো শনিবারেও দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে স্নান করতে যাচ্ছিলেন বাবা। আচমকা বিপত্তি। পাশের পাঁচিল ধসে সকলেই চাপা পড়লেন। — এ ভাবেই মঙ্গলকোটে মৃত্যু হল দুই ছেলে ও বাবার। দু’দিন টানা বৃষ্টির পরে কেতুগ্রাম ও মঙ্গলকোটের বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন। ভেঙেছে নদীর বাঁধও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন দুপুর ৩টে নাগাদ দুই ছেলে সোহেল শেখ (৩) ও শেখ সরিফুলকে (১৫) সঙ্গে নিয়ে গ্রামেরই একটি পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিলেন মঙ্গলকোটের ভাল্যগ্রামের বাসিন্দা নোরসেদ শেখ (৪৮)। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুকুর যাওয়ার পথেই রয়েছে একটি পরিত্যক্ত গোয়ালঘর। আচমকা বাবা ও দুই ছেলের উপরে গোয়ালঘরের দেওয়ালটি ধসে পড়ে বলে দাবি। তিন জনকেই উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সোহেলের। গুরুতর জখম অবস্থায় সরিফুল ও নোরসেদকে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেখানেই মৃত্যু হয় নোরসেদের। সরিফুলের অবস্থা সঙ্কটজনক হওয়ায় তাকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু পথেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই সরিফুলের মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকেরা জানান।
রায়নার গুনোর গ্রামে কারালাঘাট রোডে এ ভাবেই চলছে যাতায়াত।
কামারুল শেখ নামে এক পড়শি জানান, পেশায় খেতমজুর ওই পরিবারটির একমাত্র রোজগেরে ছিলেন নোরসেদ। সরিফুল স্থানীয় একটি হাইস্কুলের নবম শ্রেণির পড়ুয়া ছিল। এই ঘটনার পরে নোরসোদের স্ত্রী আনহারা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘‘আমার সব গেল। কী ভাবে বাঁচবো জানি না।’’ মঙ্গলকোটের বিডিও সায়ন দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘এলাকায় পুলিশ গিয়েছে। ঘটনা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
স্থানীয় সূত্রে খবর, বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে কেতুগ্রাম ২ ব্লকের বিল্লেশ্বর পঞ্চায়েতের বারেন্দা থেকে নবগ্রাম পর্যন্ত অজয়ের উপরে বাঁধটিরও। বাসিন্দারা জানান, বাঁধের প্রায় ২৫ ফুট ভেঙে গিয়েছে। হুহু করে জল ঢুকছে চরকি, নবগ্রাম, তরালসেনপাড়া ও পুরুল মৌজায়। প্রশাসনের একটি সূত্রের মতে, গ্রামের প্রায় ৪০০হেক্টর ধান, সব্জির খেত জলমগ্ন। স্থানীয় বুদ্ধদেব ঘোষ, সত্যবান মণ্ডলদের শঙ্কা, ‘‘যা অবস্থা তাতে আর একদিন বৃষ্টি হলেই বাঁধের বাকি অংশটুকুও ভেঙে যেতে পারে।’’ বাসিন্দাদের দাবি, বাঁধ উঁচু করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। গদাই মাঝি, অর্চনা মাঝি, মুরালি ঘোষদের মতো বারেন্দার চাষিদের দাবি, ‘‘এখন ঝিঙে তোলার সময়। সব ভেসে গেল। কয়েক হাজার টাকার লোকসান হয়েছে।’’ দুর্ভোগের ছবি মঙ্গলকোটেও। পশ্চিম মঙ্গলকোটের মাঝিখাড়া, ঝিলিরা, গোতিষ্ঠা, লাখুরিয়া পঞ্চায়েতের প্রায় ১২টি গ্রাম জলমগ্ন বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। লাখুরিয়া, পালিশগ্রামে ভেঙেছে বেশ কয়েকটি বাড়ি। গুসকরাগামী বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে গিয়েছে কয়েক দিন ধরে।
জলমগ্ন নতুনহাট যাওয়ার রাস্তা।
মহকুমা সেচ আধিকারিক প্রদীপকুমার দাস যদিও বর্ষার পরেই বাঁধ সারাই হবে বলে জানিয়েছেন। কেতুগ্রাম ২ ব্লকের বিডিও অর্ণব সাহা বলেন, ‘‘নবগ্রমের ২২টি পরিবারকে ত্রিপল দেওয়া হয়েছে। মশাঞ্জোড় ও তিলপাড়া ব্যারেজের জল ছাড়ার জেরেই জল ঢুকেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে জল এখনও বিপদসীমার নীচে রয়েছে।’’ সেচ দফতর সূত্রে খবর, বিপদসীমা ১৩.৮৬ মিটারের উপরে। এখন ১৩.৬০ মিটারে জল বইছে বলে জানা গিয়েছে। দিনভর পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছে প্রশাসন।