একে টানা গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তার উপরে খেতে বসেও স্বস্তি নেই। শিল্পাঞ্চলে বাঙালির পাত থেকে যে মাছ উধাও হওয়ার জোগাড়।
নদী-পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় এলাকা থেকে মাছের জোগান প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। গরমে সংরক্ষণ করা মুশকিল হচ্ছে বলে আমদানি করা মাছের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলশ্রুতিতে, দাম বাড়ছে হু-হু করে। একে তো পছন্দসই মাছ মিলছে না, তার উপরে দামও বেশ চড়া। আসানসোল-দুর্গাপুরে তাই মুখ ব্যাজার বাসিন্দাদের। তবে বুধবার সন্ধ্যায় খানিক বৃষ্টির পরে পরিস্থিতি পাল্টাবে, আশায় রয়েছেন তাঁরা।
আসানসোলের মূল বাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি মাছের আড়ত আছে। মূলত অন্ধ্রপ্রদেশ ও দিঘা থেকে প্রচুর পরিমাণে মাছ আসে সেগুলিতে। তুলনায় কম হলেও দুই চব্বিশ পরগনার ভেড়ির মাছ আমদানি হয়। এমনই একটি বড় আড়তের মালিক মহম্মদ ইলিয়াস জানান, প্রতিদিন মহকুমায় ৪০ টন অন্ধ্রপ্রদেশের মাছ আমদানি হয়। দিঘার সমুদ্র ও চব্বিশ পরগনার ভেড়ি থেকে আরও অন্তত পাঁচ টন মাছ আসে। কিন্তু এখন মাছ আমদানি হচ্ছে ওই পরিমাণের অর্ধেকেরও কম।
আমদানি কম হচ্ছে কেন? ইলিয়াস বলেন, ‘‘প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বরফ মিলছে না। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ঠান্ডা করার যন্ত্রও কাজ করছে না। তাই পচে যাওয়ার ভয়ে ব্যবসায়ীরা বেশি মাছ নিতে ভয় পাচ্ছেন। খুচরো বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।’’ মাইথন ও পাঞ্চেত থেকেও শিল্পাঞ্চলের বাজারে কিছু মাছের জোগান আসে। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানান, জলস্তর কমে যাওয়ায় মাছ মিলছে না। একই ভাবে এলাকার পুকুরগুলিও শুকিয়ে কাঠ। সেখানেও মাছ চাষ হচ্ছে না।
দুর্গাপুরের নানা বাজারে মাছ পৌঁছয় মূলত বুদবুদের পাইকারি বাজার থেকে। বছরের অন্য সময়ে ভোরে বিভিন্ন বাজারে গেলেই দেখা যায়, মাছ বোঝাই লরি, ট্রাকের সারি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সেই ছবিটা অমিল। ব্যবসায়ীরা জানান, খাল-বিল শুকিয়ে চৌচির। দিঘি, নদীতেও জল কম। মাছ সরবরাহের উপরে এর বড়সড় প্রভাব পড়েছে। আমদানি করা মাছের বড় অংশ গরমে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে না বলে জানান তাঁরা।
ফলে, দাম বেড়ে গিয়েছে মাছের। সিটি সেন্টারের এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘বাড়িতে অতিথিদের খাওয়াতে মালাইকারির জন্য চিংড়ি কিনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাজারে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। গলদা, বাগদা আর কুচো চিংড়ি বিকোচ্ছে ৭০০, ৬০০ আর ৩০০ টাকা দরে।’’ বাজার ঘুরে দেখা যায়, সাতশো গ্রামের ইলিশ বিকোচ্ছে প্রায় ৮০০ টাকায়। ট্যাঙরা, কাজলি, তোপসের দরও ঘোরাফেরা করছে ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে। এক ক্রেতা জানান, ‘‘কাজলি মাছ দিন কয়েক আগেও বিক্রি হয়েছে ২৫০ টাকায়। এখন তাতে হাত দেওয়া দায়!’’ সিঙ্গি-মাগুর চারশো টাকার নীচে মিলছে না। বেনাচিতি বাজারের মাছ ব্যবসায়ী অনুপ সাহানি বলেন, ‘‘চাহিদা-জোগানের ফারাকের জেরেই দর বেড়েছে।’’
দুর্গাপুরের বাসিন্দা দেবাদিত্য রায়, শিবসাধন চক্রবর্তীদের কথায়, ‘‘বাজারে গিয়ে মাছে হাত দেওয়ার আগে ভাল করে পকেট দেখতে হচ্ছে।’’ দুর্গাপুরের বেসরকারি কলেজের শিক্ষক সৌদীপ্ত মণ্ডল, আসানসোলের ইসিএল কর্মী জীবন তরফদারেরা বলেন, ‘‘মাছের বাজারে ঢুকতেই ভয় পাচ্ছি।’’ এই পরিস্থিতিতে মুশকিলে পড়েছে খাবারের হোটেলগুলিও। আসানসোল কোর্ট বাজারের এক হোটেল মালিকের কথায়, ‘‘দাম এতটা বেড়েছে যে খদ্দেরের ভাতের থালায় মাছ তুলে দেওয়ার পরে দাম চাইতেও লজ্জা করছে।’’