Mamata Banerjee Helpline Initiative Fail

জনগণের ক্ষোভ কানে তোলেনি ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’! তা না হলে ফল হয়তো অন্য রকম হত, এখন আক্ষেপ করছে তৃণমূল

২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর আইপ্যাক-এর পরামর্শে ‘দিদিকে বলো’ চালু করেছিল তৃণমূল। ২০২৩-এ সেই হেল্পলাইন নম্বরটিকেই নতুন নাম দেন মমতা। ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’র রাশ ছিল প্রশাসনের হাতে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৮:৫৯
Share:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ প্রকল্প সফল হয়নি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘দিদি’ সামাল দিতে পেরেছিলেন। ‘মুখ্যমন্ত্রী’ পারলেন না!

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পনেরো বছরের শাসনকালে যত দিন গিয়েছে, ততই অভিযোগের পাহাড় জমেছে সরকারের বিরুদ্ধে। কোথাও স্থানীয় তৃণমূলের বড়-মেজ-ছোট নেতাদের দুর্নীতি-দাদাগিরি, সিন্ডিকেট। কোথাও সরকারি পরিষেবা না-পাওয়ার অভিযোগ। পুলিশ-প্রশাসনের কোনও স্তরেই সুরাহা না-পেয়ে ফুঁসেছে আমজনতা। ক্রোধ বেড়েছে শাসক দলের বিরুদ্ধে। অথচ সুরাহা মেলার একটা পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। চালু করেছিলেন ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ নামে হেল্পলাইন। ভোটে ভরাডুবির পরে তৃণমূল নেতাদের বড় অংশের আক্ষেপ, সেই হেল্পলাইন যদি ঠিকঠাক কাজ করত, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ঠিক কতটা তার একটা আঁচ যদি দল এবং প্রশাসনের শীর্ষ নেতারা পেতেন, তা হলে এত বড় বিপর্যয় হয়তো-বা এড়ানো যেত। যেমনটা গিয়েছিল ২০২১ সালে।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর পরামর্শে ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি চালু করেছিল তৃণমূল। একটি হেল্পলাইন নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করার ব্যবস্থা হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরের সঙ্গে। সেখানে যে-সব অভাব-অভিযোগ আসত, নিজে উদ্যোগী হয়ে সেগুলি সমাধানের ব্যবস্থা করতেন আইপ্যাক-এর তৎকালীন প্রধান প্রশান্ত কিশোর। ফলে প্রকল্পটি অল্প দিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ অনেকটাই নিবিড় হয়। ভোটবাক্সে তার ফলও পেয়েছিল তৃণমূল। সে দফায় ৭৭-এই আটকে যায় বিজেপির বিধায়কসংখ্যা।

Advertisement

কিন্তু ভোটের পরে আর তেমন ভাবে চলেনি ‘দিদিকে বলো’ হেল্পলাইন। ধীরে ধীরে মানুষ ভুলেও যায় তার কথা। ২০২৩ সালের ১৯ মে নতুন চেহারায় এই প্রকল্প আবার চালু করার কথা ঘোষণা করেন মমতা। নাম দেওয়া হয় ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’। ৮ জুন আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হয় হেল্পলাইন। তবে দায়িত্বে এ বার আর আইপ্যাক-এর পেশাদার কর্মীরা নন, সরকারি আধিকারিকেরা। আমজনতার অভাব-অভিযোগ শুনে সেগুলি সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শীর্ষস্তরের আমলাদের। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ‘দিদিকে বলো’র সাফল্যের ধারপাশ দিয়ে যায়নি ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করলে বেশির ভাগ সময়েই ফোন বেজে গিয়েছে, কেউ ধরেনি। ক্কচিৎ কখনও কেউ ফোন ধরলেও শুধু আশ্বাসটুকুই মিলেছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে হতাশা বেড়েছে, ফোনের সংখ্যাও কমেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। পুঞ্জীভূত হয়েছে মানুষের ক্ষোভ।

২০২৪-এর লোকসভা ভোটের ফলে অবশ্য সেই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যায়নি। বিজেপির আসনসংখ্যা ১৯ থেকে কমে হয়ে যায় ১২। ফলে আত্মতুষ্টি বাসা বাঁধে তৎকালীন শাসকশিবিরে। আরও অবহেলা আর বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায় ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ কর্মসূচি, যার জেরে এখন হাত কামড়াচ্ছেন তৃণমূল নেতারা।

‘দিদিকে বলো’র কাছে কোথায় হেরে গেল ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’?

কর্মসূচি দু’টি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন এমন তৃণমূল নেতাদের মতে, খামতি ছিল অনেক জায়গায়। প্রথমত ভোটকুশলী সংস্থার পেশাদার কর্মীদের বদলে সরকারি আমলাদের দায়িত্ব দেওয়াটা গোড়াতেই বড় ফারাক গড়ে দিয়েছিল। যদিও প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের দাবি, কর্মসূচি ঘোষণার পর প্রথম দিকে অনেক ফোন আসত। সেগুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখাও হচ্ছিল। তাঁদের অভিযোগের আঙুল প্রকল্পের প্রচার-পরিকল্পনার দিকে। এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এই ধরনের জনহিতকর কর্মসূচি আরও বেশি করে প্রচার করার পরামর্শ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতাদের কেউই তাঁকে দেননি। ফলে মমতাও তা নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি। মানুষ হেল্পলাইন নম্বরের কথাও ভুলে গিয়েছিল। দিনে দিনে এর গুরুত্ব কমে এসেছিল প্রশাসনের কাছেও।’’

এরই মাঝে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনে যে সব অভিযোগ এসেছিল, সেগুলোর যথাযথ নিষ্পত্তি হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। যেমন, খোদ মমতার কেন্দ্র ভবানীপুরেই প্রোমোটিং নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। ভোটের আগে অনেকে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগও জানান। নবান্ন সূত্রে খবর, এই সব বিষয়ে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’র হেল্পলাইন নম্বরে অনেকেই ফোন করেছিলেন। পাশাপাশি, কোথাও স্থানীয় নেতার দাপট কিংবা তোলাবাজির কথা জানিয়ে, কোথাও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট বা পানীয় জলের সমস্যার কথা জানিয়ে ফোন এসেছিল। কিন্তু এই সব অভিযোগের ক্ষেত্রে যে সক্রিয়তা প্রয়োজন ছিল, তা দেখা যায়নি বলে সরকারি আধিকারিকেরাই মেনে নিচ্ছেন।

২০২১ সালে জঙ্গলমহল থেকে নির্বাচিত এক বিধায়ককে মন্ত্রী করেছিলেন মমতা। তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, ওই মন্ত্রীর কার্যকলাপ নিয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। মন্ত্রীর ‘বিশেষ বন্ধু’র দাপটও জঙ্গলমহলের অনেকে ভাল চোখে দেখেননি। ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’র হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করে অনেকে সেই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। সরকারি আধিকারিকদের একাংশের দাবি, সেই সব অভিযোগ মমতার কানে তোলাই হয়নি। তা ছাড়া, হেল্পলাইনে ভূরি ভূরি অভিযোগ এসেছিল দক্ষিণবঙ্গের এক জেলার সভাধিপতির বিরুদ্ধে। সেখানেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। ওই নেতা এখনও নিজের পদে বহাল রয়েছেন!

এ বারের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণবঙ্গের আলুবলয়ে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। অথচ পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, পশ্চিম মেদিনীপুরে তৃণমূলের সাংগঠনিক দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। অনেকের মতে, আলু চাষ এবং বিপণনের বিষয়ে রাজ্য সরকারের ভুল নীতির কারণেই ভরাডুবি হয়েছে। সেই ভুল সরকারের কানে তুলে ধরার জন্য চাষিদের অনেকেই ফোন করেছিলেন ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইন নম্বরে। কিন্তু সেই ফোনগুলি সে ভাবে গুরুত্ব পায়নি। তৃণমূলের একাংশের আক্ষেপ, প্রকল্প সঠিক ভাবে চললে আলুবলয়ের ‘মন’ বুঝতে পারতেন মমতা। তা হলে হয়তো দক্ষিণবঙ্গে দলের ঘাঁটিগুলি এ ভাবে হাতছাড়া হত না।

যদিও মমতার ঘোষণা করা প্রকল্পের ব্যর্থতার কথা এখনও প্রকাশ্যে মানতে নারাজ তৃণমূল নেতারা। বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ কর্মসূচি ব‍্যর্থ হয়েছে, এ কথা মানতে পারছি না। ওই কর্মসূচিতে প্রত‍্যন্ত এলাকার বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন। ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ প্রকল্প থেকে পরামর্শ পেয়ে কৃষিমন্ত্রী হিসেবে আমিও অনেক কাজ করেছি। আর এ বারের ভোট হয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনায়। তাই ভোটের ফলাফলকে কর্মসূচির ব্যর্থতা বলে সরলীকরণ করে দিলে হবে না।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement