আরজি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত
চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সিবিআই-কে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা
হাই কোর্ট। তদন্তের পরিধি বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। তিন সদস্যের একটি বিশেষ
তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্টের বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি
তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চ। আগামী ২৫ জুনের মধ্যে ওই দলকে আদালতে তদন্তের
রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
২০২৫ সালের ২৮ মার্চ সিবিআই আরজি
কর-তদন্তের একটি রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছিল। হাই কোর্ট জানিয়েছে, ওই রিপোর্টে পুলিশ
এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে কিছু খামতির কথা রয়েছে। সেগুলি এ বার তদন্তের
কেন্দ্রে আনা উচিত। বিশেষ তদন্তকারী দলকে সেই কাজটিই করতে হবে। ২০২৪ সালের ৮ অগস্ট নির্যাতিতা যখন তাঁর চিকিৎসক সহকর্মীদের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছিলেন, তখন
থেকে শুরু করে শ্মশানে তাঁর দেহ দাহ করা পর্যন্ত সময়ে কী কী ঘটেছে, ফের তদন্ত করে
দেখতে হবে। আদালত মনে করছে, ঘটনার রাতের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির দিকে তদন্তের
নজর ঘোরানো উচিত।
পুলিশ ও হাসপাতালের তরফে কী কী খামতি
খুঁজে পেয়েছে সিবিআই? বৃহস্পতিবার আদালতের রায়ের কপিতে তার উল্লেখ রয়েছে। নীচে
সেগুলি পর পর তুলে দেওয়া হল।
- সকাল সাড়ে ৯টায় চিকিৎসক তরুণীর
মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। বেলা ১২টা ৪৪ মিনিটে তাঁকে আনুষ্ঠানিক ভাবে মৃত বলে
ঘোষণা করা হয়। হাসপাতাল থেকে পুলিশকে মৃত্যুর শংসাপত্র দেওয়া হয় বেলা ১টা ৪৭
মিনিটে। প্রায় চার ঘণ্টার এই বিলম্বের কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
- তরুণীর বাবা-মা বেলা ১২টা নাগাদ
হাসপাতালে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও মেয়ের দেহ তাঁদের
দেখতে দেওয়া হয়নি।
- রাত সাড়ে ১১টায় অস্বাভাবিক
মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছিল। মামলার নম্বর ছিল ৮৬১/২৪। তবে তার অনেক আগেই
ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলার ওই নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল।
- ধর্ষণ ও খুনের এফআইআর রুজু করতে ১৪
ঘণ্টা দেরি করা হয়েছিল। টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডল যৌন হেনস্থা এবং
খুনের খবর মৌখিক ভাবে পেয়েছিলেন সকাল ১০টা ৩ মিনিটেই। তিনি ঘটনাস্থলে যান সকাল
১১টা ১৫ মিনিটে। অর্ধনগ্ন, জখম অবস্থায় পাওয়া দেহটিই এফআইআর রুজুর পক্ষে যথেষ্ট
ছিল। কিন্তু তিনি ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৭৩ ধারা অনুযায়ী সরাসরি
এফআইআর রুজু না করে বিএনএসএস-এর ১৯৪ ধারা অনুযায়ী প্রক্রিয়া শুরু করেন। আরজি করের
সুপার পৌনে ৩টে নাগাদ অভিযোগ দায়েরের পরেও এফআইআর রুজু করা হয়নি। ময়নাতদন্ত হয়ে যাওয়ার
পর সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে তরুণীর বাবা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার পর রাত পৌনে
১২টা নাগাদ এফআইআর রুজু করা হয়। এতে আনুষ্ঠানিক ভাবে তদন্তপ্রক্রিয়া শুরু করতে
দেরি হয়েছে।
- টালা থানায় অভিযোগ দায়েরের সময় মৃতের
পরিবার স্বাধীন তদন্ত চেয়েছিল এবং দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তের জন্য দেহ সংরক্ষণের
আর্জি জানিয়েছিল। ওই সময় থানায় উপস্থিত আধিকারিক তাঁদের অনুরোধ রাখেননি। জানান,
দেহ তত ক্ষণে বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে। শ্মশানে আরজি করের নির্যাতিতার আগে লাইনে ছিল
আরও তিনটি দেহ। সেগুলিকে টপকে ওই দেহ দাহ করা হয়। মৃতের বাবার অভিযোগ, দেহ সৎকারে
তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল।
- হাসপাতালের তরফে তরুণীকে মৃত ঘোষণা
করতে কেন চার ঘণ্টা সময় নেওয়া হল, তার ব্যাখ্যা মেলেনি। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসক
সুমিত রায় তপাদার দেহ পরীক্ষা করেছিলেন। তরুণী যে মৃত, তখনই জানতে পেরেছিলেন। হাসপাতাল
চত্বরের মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে জেনেও সম্পূর্ণ তথ্য-সহ কোনও অভিযোগ সঙ্গে
সঙ্গে দায়ের করা হয়নি। পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ হাসপাতাল থেকে পাঠানো হয় প্রায়
পাঁচ ঘণ্টা পরে। সেই অভিযোগেও খুব বেশি তথ্য ছিল না। আপাতদৃষ্টিতে সংগঠিত অপরাধের
কোনও বিবরণ তাতে উল্লেখ করা হয়নি।
- মৃতের বাবা প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ
তুলেছেন। তা নিয়ে বিশদ তদন্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের
কিছু খামতি পাওয়া গিয়েছে। তবে সিবিআই জানিয়েছে, প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে বা তার
চেষ্টা করা হয়েছে বলে কোনও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালতের মন্তব্য, ‘‘তদন্তকারী
আধিকারিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আমরা কোনও মন্তব্য করব না। তবে আমাদের মনে হচ্ছে, অপরাধের
প্রকৃতি, সামাজিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা
করে সিবিআই-এর পূর্বাঞ্চলের যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি বিশেষ
তদন্তকারী দল গঠন করা উচিত। ওই দল উপরোক্ত নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে।’’
আদালত জানিয়েছে, প্রমাণ লোপাট বা
দোষীদের আড়াল করার মতো বিষয়ের দিকে যেমন ওই তদন্তকারী দল নজর দেবে, তেমনই আবেদনকারীর
অভিযোগগুলি পুনর্বিবেচনা করবে। প্রয়োজনে মামলাকারী বা এর সঙ্গে যুক্ত যে কোনও
ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে। ২৫ জুন দুপুর ২টোয় আবার এই মামলার শুনানি হবে।