বেগমপুরের একটি বাজির কারখানা। ছবি: দীপঙ্কর দে।
• ১৯৭৮ সালে চন্দননগরের পাদ্রিপাড়ায় বাজি বিস্ফোরণে ১১ জনের মৃত্যু হয়।
• ১৯৮০ সালে ওই একই জায়গায় বাজি বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় ৬ জনের।
• ২০১০ সালে ধনেখালির বসো গ্রামে দুই মহিলা-সহ ৬ জনের মৃত্যু হয়।
• বেগমপুরে ৫ জন এবং কলাছড়ায় আরও একটি বিস্ফোরণে বছর দুয়েক আগে ২ জনের মৃত্যু হয়।
পিংলা-কাণ্ড কি হুগলির বেআইনি বাজি শিল্পে রাশ টানতে পারবে?
পিংলার বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে ১২ জনের মৃত্যুর পরে এই প্রশ্নই এখন ঘোরাফেরা করছে হুগলির ধনেখালি, ডানকুনি, চণ্ডীতলা, বেগমপুরের মতো বেশ কিছু এলাকায়। যে সব জায়গা জেলার বেআইনি বাজি তৈরির আঁতুরঘর হিসেবে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট এলাকার বহু বাসিন্দারই আশঙ্কা, এখনই যদি বেআইনি বাজি তৈরিতে লাগাম পরানো না যায়, তা হলে পিংলার মতো ঘটনা এখানেও ঘটতে পারে। তা রোখার দায়িত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং পুলিশের মধ্যে চাপান-উতোর শুরু হয়েছে।
হুগলিতে বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে প্রাণহানির নজির আগে রয়েছে। রাজ্যে প্রথম বড় বাজি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৮ সালে এ জেলারই চন্দননগরের পাদ্রিপাড়ায়। সেই বিস্ফোরণে ১১ জনের মৃত্যু হয়। ওই এলাকায় বহু গরিব পরিবার তখন বাজি তৈরিতে যুক্ত ছিলেন। ফের ১৯৮০ সালে ওই একই জায়গায় বাজি বিস্ফোরণে ছ’জনের মৃত্যু হয়। এরপর ধনেখালি, বেগমপুর, চণ্ডীতলার কলাছড়া, বাসুবাটিতেও বাজি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ২০১০ সালে ধনেখালির বসো গ্রামে দুই মহিলা-সহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়। বেগমপুরে পাঁচ জন এবং কলাছড়ায় আরও একটি বিস্ফোরণে বছর দুয়েক আগে দু’জনের মৃত্যু হয়।
তার পরেও অবশ্য ওই সব এলাকায় বেআইনি ভাবে বাজি তৈরি থেমে নেই। পুজোর মরসুমে সেখানে লুকিয়ে-চুরিয়ে শব্দবাজি তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে। এক সময় শুধু উত্সবের মরসুমেই এই ব্যবসা চলত। এখন সময় বদলাচ্ছে। পারিবারিক অনুষ্ঠানেও বাজি ফাটানো রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি মেলা-খেলাতেও নিয়ম করে বাজি ফাটে। তার উপর রয়েছে ভোটের জয়ের আনন্দ প্রকাশ। ফলে, বাজির বাজার এখন প্রায় সারা বছর ধরেই জমজমাট। চাহিদার সঙ্গে জোগানের সমতা ধরে রাখতে তাই এখন বছরভর বাজি তৈরি হয় ওই সব এলাকায়।
মূলত বাজি-কারবারি মহাজনেরা মশলা দিয়ে আসেন ছোট ছোট কারিগরদের বাড়িতে। সেই মশলা দিয়েই বাড়ির মহিলা-পুরুষেরা বাজি তৈরি করেন। হাত দেয় ছোটরাও। কিন্তু বারুদ রক্ষণাবেক্ষণে যে সব নিরাপত্তা নেওয়া প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রেই তা নেওয়া হয় না। ফলে, মাঝেমধ্যেই বিস্ফোরণে প্রাণহানি ঘটে। সেই তালিকায় শিশুরাও বাদ যায় না। এই নিরাপত্তাহীনতার কথা জেনেও বেশি মুনাফার লোভে শিশুদের বাজি তৈরির কাজে লাগানো হয়। অভিযোগ, সমাজকল্যাণ দফতর বা শ্রম দফতর এ ব্যাপারে নজরদারি চালায় না। আর তার ফাঁক গলেই অবাধে চলে বেআইনি বাজির কারবার। পরে মহাজনেরা এসে সেই সব বাজি নিয়ে গিয়ে বাজারজাত করেন।
কেন হয় না নজরদারি?
জেলা প্রশাসনের এক কর্তার দাবি, পরিকাঠামোগত নানা সমস্যার কারণেই নিয়মিত নজরদারি সম্ভব হয় না। রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র মনে করেন বেআইনি বাজি রুখতে পুলিশেরই মুখ্য ভূমিকা নেওয়া উচিত। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পর্ষদের তেমন পরিকাঠামো নেই দাবি করে কল্যাণবাবু শুক্রবার বলেন, “পর্ষদ মূলত রাজ্যে উত্সবের মরসুমে বেআইনি বাজি ধরতে নজরদারি চালায়। কলকাতা বাদে আমাদের কয়েকটি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে। কিন্তু বাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো বা কর্মী কিছুই আমাদের হাতে নেই। পুলিশের পরিকাঠামো অনেক বড়। প্রচুর কর্মী রয়েছেন। লুকিয়ে কোথায় শব্দবাজি বা বোমা তৈরি হচ্ছে তা জানা পর্ষদের পক্ষে কী ভাবে সম্ভব? পুলিশেরই কাজ বেআইনি বাজি খুঁজে বের করা।”
তবে, পর্ষদের প্রবীণ কর্মীদের অনেকেই ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের দাবি, পরিকাঠামোগত সমস্যা পর্ষদের নতুন কিছু নয়। তা সত্ত্বেও আগে পর্ষদ বেআইনি বাজির বিরুদ্ধে নিয়ম করে ব্যবস্থা নিত।
ফাঁকতালে কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ বাজি তৈরি হওয়ার কথা মেনে নিয়েছেন জেলা পুলিশের কর্তারা। তবে, তাঁদের দাবি, ‘‘বাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নজরদারি আছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুলিশ তল্লাশিও চালায়। না হলে বিস্ফোরণের ঘটনা আরও বাড়ত।’’ একই সঙ্গে তাঁরা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং প্রশাসনের অন্য মহলের আরও সক্রিয়তারও প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন।
হাওড়ার উলুবেড়িয়ার মালপাড়ায় অন্তত ৫০টি পরিবার বাজি তৈরির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে, কারিগরদের দাবি এখানে আতসবাজিই তৈরি হয়। ছোটদের কাজে লাগানো হয় না। শুক্রবারও সেখানে গিয়ে দেখা গেল বাজি তৈরি হচ্ছে। বাসিন্দাদের অধিকাংশই দিনমজুর। কেউ বা ভ্যানরিকশা চালান। কালীপুজোর তিন-চার মাস আগে বাজি তৈরির কাজে তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
শেখ ফিরোজ নামে সেখানকার এক বাজি কারিগর বলেন, ‘‘ছোটদের আমরা এই কাজে আনি না। ওরা পড়াশোনা করে।’’ সাবিনা মাল নামে এক মহিলা জানান, বছরের বেশির ভাগ সময়ে তিনি জরির কাজ করেন। তিন-চার মাস বাজি তৈরি করেন। তাঁর ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তাঁর কথায়, ‘‘বাজি তৈরি করলে হাজার দু’তিনেক টাকা বাড়তি রোজগার হয়। এখানে কখনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা হয়।’’
এখানেও জেলা পুলিশের এক কর্তা দাবি করেছেন, নিয়মিত মালপাড়ায় তল্লাশি হয়। শব্দবাজি তৈরি না করার জন্য কারিগরদের সাবধান করা হয়।