ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পালাবদলের হাওয়া রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে। স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষক-অধ্যাপক— পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গনে প্রায় সব মহলে দ্রুত বাড়ছে আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ)-এর সহযোগী সংগঠনগুলির প্রভাব। শিক্ষাকর্মী, শিক্ষক, অধ্যাপকদের মধ্যে ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল (বিএসএম) এবং অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ (এবিআরএসএম) আর পড়ুয়াদের মধ্যে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর সদস্য হওয়ার উৎসাহ দ্রুত বেড়েছে গত ৪ মে-র পর থেকে। নিজস্ব ‘ছাঁকনি’ ব্যবহার করে সেই ‘উৎসাহকে কাজে লাগানো হচ্ছে’ বলে সংগঠনগুলির রাজ্য নেতৃত্বের দাবি।
সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি আপাতত বন্ধ রেখেছে দলের সদস্যপদ দেওয়ার প্রক্রিয়া। তৃণমূল বা অন্যান্য দল থেকে নিজেদের দলে ‘বেনোজল’ ঢোকা আটকাতেই রাজ্য বিজেপির এই সিদ্ধান্ত। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অন্তত সে কথাই বলেছেন। শমীকের সে বার্তা বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মুখে মুখেও ফিরছে। কিন্তু সংগঠন বিস্তারের প্রশ্নে যাঁরা বিজেপির চেয়ে অনেক বেশি ‘সাবধানী’ তথা ‘রক্ষণশীল’ হিসাবে পরিচিত, সেই আরএসএস বা তার সহযোগীরা সংগঠন বিস্তারের প্রশ্নে তেমন কোনও সামগ্রিক বিধিনিষেধ আরোপের পথ নেয়নি। বরং বিভিন্ন পেশা তথা সামাজিক শ্রেণির জন্য সঙ্ঘ পরিবারের যে আলাদা আলাদা সংগঠন, তারা মাঠে নেমে পড়ছে দ্রুত সংগঠন বাড়িয়ে নিতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজ্যের সিংহভাগ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে এবিভিপি, এবিআরএসএম এবং বিএসএম।
বিএসএম-এর কাজ মূলত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, তার রূপায়ণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উত্তরণ নিয়ে। ২০২০ সালে ভারত সরকার যে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ ঘোষণা করে, সেই ‘এনইপি-২০২০’-র প্রায় ৭০ শতাংই বিএসএম-এর প্রস্তাবনা থেকে গৃহীত ছিল। মূলত শিক্ষাবিদ তথা শিক্ষানীতি সংক্রান্ত চিন্তকদের নিয়ে গঠিত হওয়ায়, লোকবল বাড়ানোর উপরে বিএসএম বেশি জোর দেয় না। চিন্তাভাবনার উৎকর্ষে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে বিএসএম নেতৃত্ব মনে করছেন। কারণ বিএসএম-এর তৈরি শিক্ষানীতি সংক্রান্ত প্রস্তাবনার সিংহভাগ ভারত সরকার গ্রহণ করলেও এত দিন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার রূপায়ণ ঘটতে দেয়নি। শুধু তৃণমূলের জমানায় নয়, দীর্ঘ বামফ্রন্ট জমানাতেও পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা তথা পাঠ্যক্রম ‘বিপথে চালিত’ ছিল বলে বিএসএম মনে করে। তাই পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা জগতে সংস্কার আনতে গেলে লোকবল তথা প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি বাড়ানো দরকার বলে নেতৃত্ব মনে করছেন।
রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে কালক্ষেপ না-করে ‘এনইপি-২০২০’ রূপায়ণের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিএসএম এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনের প্রভাব বাড়িয়ে জাতীয় শিক্ষানীতির রূপায়ণকে মসৃণ করে তোলায় সংগঠনটি সহযোগী হতে চায়। তাই যত বেশি সম্ভব স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে বিএসএম। সংগঠনের দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত সহ-সভাপতি অরিন্দম ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘আমাদের সংগঠন সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর কোনও প্রতিযোগিতায় নামেনি। তবে শক্তি সংহত করার প্রয়াস আমরা শুরু করেছি। কারণ গত ৫০-৫৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রকে যে ভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তাতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে লোকবলও দরকার হবে।’’ অরিন্দমের কথায়, ‘‘অনেক শিক্ষক, অধ্যাপককে আমাদের সংগঠনের সঙ্গে জুড়তে হবে। আমরা কী চাই, আমাদের লক্ষ্য কী, তাঁদের বোঝাতে হবে। তাঁদের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে পরিবর্তনটা আনতে হবে। সুতরাং যত বেশি সম্ভব প্রতিষ্ঠানে আমরা পৌঁছোনোর চেষ্টা করছি।’’
এবিআরএসএম আরও দ্রুত গতিতে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার শপথ নেওয়ার কয়েক দিন আগেই সংগঠনটি সে বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নানা দাবিদাওয়া নিয়েই এবিআরএসএম কাজ করে। মূলত আন্দোলনাত্মক সংগঠন। তাই লোকবল বরাবরই বিএসএম-এর চেয়ে বেশি ছিল। গত ৪ মে-র পর থেকে সেই লোকবলকে বহু গুণ করার লক্ষ্য নিয়ে এবিআরএসএম মাঠে নেমেছে। সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক বলছেন, ‘‘আগে এ রাজ্যে আমাদের সদস্যসংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও কম। ভোটের ফল বেরনোর পর থেকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যে রকম সাড়া পাচ্ছি, তাতে সদস্যসংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে।’’ অর্থাৎ সদস্যসংখ্যা ১০ গুণ হওয়ার সম্ভাবনা! বাপির কথায়, ‘‘রাজ্যের ৩৪১টি ব্লকের মধ্যে ৩১৫টি ব্লকে আমাদের উপস্থিতি ছিল। গোটা রাজ্যে শিক্ষা বিভাগের ৭২৭টি সার্কল রয়েছে। তার মধ্যে পৌনে ছ’শো সার্কলে আমাদের উপস্থিতি ছিল। সে সব জায়গায় দ্রুত লোকবল বাড়ছে। আর যেখানে আমরা ছিলাম না, সেখানেও নতুন করে সংগঠন তৈরি হচ্ছে।’’
ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র বিস্তার আরও দ্রুত ঘটছে। এবিভিপি সূত্রের খবর, ভোটের ফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত রাজ্যের ৯৬টি কলেজে এবিভিপি-র উপস্থিতি ছিল। গত ১৭ দিনে সেই সংখ্যাটা পৌঁছে গিয়েছে ৪১৮টিতে। অর্থাৎ বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ! তবে এবিভিপি এখনও নতুন করে সদস্যপদ দেওয়া শুরু করেনি। গত আড়াই সপ্তাহে প্রায় সওয়া তিনশো নতুন কলেজে এবিভিপি-র পদার্পণ ঘটেছে। কিন্তু সেই কলেজগুলিতে কোনও ইউনিট কমিটি এখনও ঘোষিত হয়নি। কারওকে নতুন করে সদস্যপদও দেওয়া হয়নি। সংগঠনের স্লোগান— ‘ছাত্রশক্তি, রাষ্ট্রশক্তি’। তাই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ‘ছাত্রশক্তি’ নাম দিয়ে হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপ খুলে দেওয়া হয়েছে। এবিভিপি-তে শামিল হতে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের সেই সব গ্রুপে জুড়ে নেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত সম্পাদক নীলকণ্ঠ ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘প্রতি বছর ৯ জুন থেকে আমরা সদস্যপদ দেওয়া শুরু করি। এ বছরও সে ভাবেই হবে। যাঁরা সংগঠনের শামিল হতে চাইছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সময় মতো তাঁরা সদস্যপদ পাবেন।’’
তবে এবিভিপি সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ছাঁকনি’ বসিয়েছে বলে নীলকণ্ঠ জানাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বিভিন্ন কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রথম সারির নেতা ছিলেন, যাঁরা মেয়েদের উপরে অত্যাচার করেছেন, যাঁরা ভর্তি করানোর নামে টাকা তুলেছেন বা অন্য কোনও দুর্নীতিতে জড়িত, তাঁদের আমরা চিহ্নিত করে রেখেছি। সদস্যপদ দেওয়া চালু হলেও ওই দাগীরা এবিভিপি-তে ঢুকতে পারবেন না।’’
এবিআরএসএম এবং বিএসএম-ও একই নীতির কথা শোনাচ্ছে। দুই সংগঠনের নেতৃত্বই জানাচ্ছেন যে, এত দিন তৃণমূল বা বামেদের সংগঠনে যুক্ত ছিলেন বা থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন, এমন শিক্ষক-অধ্যাপকদের স্বাগত জানাতে আপত্তি নেই। কিন্তু রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনকে ‘কলুষিত’ করার নানা ঘটনায় তাঁদের নাম জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখে নেওয়া হবে। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ বা অত্যাচার চালানোর অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছিল, তাঁরা কেউ এবিআরএসএম বা বিএসএম-এ স্থান পাবেন না বলে সংগঠন দু’টির রাজ্য পদাধিকারীরা জানাচ্ছেন। বিএসএম-এর অরিন্দমের কথায়, ‘‘আমাদের সংগঠনে অভ্যাস বর্গ, পরিচায়ক বর্গ ইত্যাদির ব্যবস্থা রয়েছে। যাঁরা সংগঠনে ছিলেন না বা অন্য মতাদর্শে ছিলেন, তাঁরা যদি সংগঠনে আসেন, তা হলে ওই কর্মসূচিগুলির মাধ্যমে আমাদের মতাদর্শে তাঁদের দীক্ষিত করার ব্যবস্থা রয়েছে।’’ এবিআরএসএম-এর বাপি বলছেন, ‘‘যাঁরা নতুন করে সদস্যপদ পেতে চলেছেন, তাঁরা আপাতত শুধু সদস্যপদই পাচ্ছেন। পদাধিকারী হবেন বা রাজ্য স্তরের দায়িত্ব পেয়ে যাবেন, এমন হবে না। সংগঠনের রাশ এত দিন যাঁদের হাতে ছিল, তাঁদের হাতেই থাকবে।’’