আরজি কর হাসপাতালের লিফ্ট বিপর্যয়ে নিহত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
আরজি কর হাসপাতালের লিফ্ট বিপর্যয়ের নেপথ্যে কার গাফিলতি? তা নিয়ে উঠছে বিস্তর প্রশ্ন। বেসমেন্টে থমকে থাকা লিফ্ট কী ভাবে আবার চালু হল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে নিহত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার। তাদের আইনজীবীর দাবি, লিফ্টম্যানদের মধ্যেই কেউ সম্ভবত উপরের কোনও তল থেকে লিফ্টটি চালু করে দিয়েছেন। ধৃত তিন লিফ্টম্যান এবং দুই নিরাপত্তাকর্মীকে শনিবার শিয়ালদহ আদালতে হাজির করানো হয়। বিচারক তাঁদের ছ’দিনের (২৭ মার্চ) পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
শুক্রবারের ওই লিফ্ট বিপর্যয়ে মৃত্যুর একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের স্ত্রী। পরিবারের বক্তব্য, অরূপ যখন বেসমেন্টে আটকে পড়া লিফ্ট থেকে বেরোতে যান, তখনই লিফ্ট উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। সেই সময় লিফ্ট এবং দেওয়ালের মাঝে আটকে পড়েন তিনি। আরজি করের সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়ও পরিবারের এই বক্তব্যের কথা জানিয়েছেন। তবে বেসমেন্টে গিয়ে থমকে যাওয়ার পরে সেই লিফ্ট কী ভাবে আবার উপরের দিকে উঠতে শুরু করল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল।
শনিবার আদালত চত্বরে নিহতের পরিবারের আইনজীবী জানান, যখন অরূপ এবং তাঁর পরিবার বেসমেন্টে আটকে ছিলেন, তখন একতলায় থাকা আত্মীয়েরা বিভিন্ন জনের কাছে সাহায্য চাইছিলেন। ওই সময়েই তিন জন ব্যক্তি এসে নিজেদের লিফ্টম্যান বলে পরিচয় দেন। আইনজীবী জানান, ওই তিন জনের মধ্যে এক জন উপরে চলে যান। তার পরে তিনিই হয়তো আচমকা উপর থেকে লিফ্টটি ‘অন’ করে দেন বলে সন্দেহ পরিবারের।
আইনজীবীর বক্তব্য, এর ফলে লিফ্টটি উপরে উঠে যায়। মহিলা এবং তাঁর সন্তান নীচে পড়ে যান। অরূপ মাঝখানে আটকে যান। তবে ভবনের কোন তল থেকে লিফ্টটি ‘অন’ করা হয়ে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছেন না পরিবারের আইনজীবী। বেসমেন্টে কী পরিস্থিতি হয়ে রয়েছে, তা না-জেনেই লিফ্ট ‘অন’ করা উচিত হয়নি বলেই মনে করছে পরিবার। তাদের বক্তব্য, আগে বেসমেন্ট খুলে দেখতে হত।
নিহতের পরিবারের আইনজীবী আরও জানান, বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার লিফ্টটিতে ওঠার আগে থেকেই সেটিতে সমস্যা ছিল। লিফ্টে ওঠার পর পরই তা বুঝতে পারেন বলে দাবি আইনজীবীর। তিনি আরও জানান, অরূপেরা ওই লিফ্টে ওঠার আগেই তাঁদের এক আত্মীয় ওই লিফ্টটিতে উপরে গিয়েছিলেন। তাঁরও মনে হয়েছিল, লিফ্টে সমস্যা রয়েছে। লিফ্টটি যে ওঠানামা করেছিল, তা-ও জানান আইনজীবী। তবে ভবনের কোন তল থেকে কোন তলের মধ্যে ওঠানামা হয়েছে, তা নির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারছেন না তিনি। আইনজীবী বলেন, “নিহতের স্ত্রী বর্ণনা করছেন, লিফ্টটি ওঠানামা করে। শেষে সেটি বেসমেন্টে এসে দাঁড়িয়ে যায়। লিফ্টের দরজাটা সেখানে কিছুটা খুললেও, সামনে আর একটি গ্রিলের গেট ছিল। সেটি খোলা যায়নি। সেটি লক ছিল।”
হাসপাতালে কর্মরত বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, সেখানে থাকা পুলিশ এবং আধাসেনা জওয়ানদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইনজীবী। তাঁর কথায়, বিভিন্ন জনের কাছে সাহায্য চাওয়া হলেও কেউ-ই খুব একটা আমল দেননি। এই কাজের দায়িত্ব কার, তা নিয়েও দায় ঠেলাঠেলি হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। তিনি বলেন, “এখনও পর্যন্ত পাঁচ জনকে গ্রেফতার হয়েছে। হাসপাতাল, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কারা ওই সময়ে হাসপাতালে কর্তব্যরত ছিলেন, যাঁদের উপরে কোনও না কোনও ভাবে এই ঘটনা আটকানোর দায় বর্তায়, সে বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়ার জন্য আমরা আদালতকে অনুরোধ করেছি।”
ধৃতদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারি আইনজীবীও। গ্রেফতার হওয়া পাঁচ জনের পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানান তিনি। আইনজীবী জানান, বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার রাত সাড়ে ১০টা নাহাদ হাসপাতালে যান। হাসপাতালের লিফ্ট সাধারণের কাজে লাগে। সেখানে ধৃতেরা দাঁড়িয়ে গান শুনছিলেন এবং তাঁরাই ওই লিফ্টকে মানুষ মারার যন্ত্রে পরিণত করেন বলে আদালতে সওয়াল করেন সরকারি আইনজীবী। কেউ অপারেশন থিয়েটারের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন বলে কি তাঁর অন্য দিকে দায়িত্ব নেই? সেই প্রশ্নও তোলেন আইনজীবী।
সরকারি হাসপাতালের লিফ্টের সামনে লিফ্টম্যানের থাকার কথা। কেন ওই লিফ্টে কেউ ছিলেন না? প্রশ্ন উঠেছে। শুক্রবারই এই ঘটনায় তিন জন লিফ্টম্যান মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস, মানসকুমার গুহ, নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান, শুভদীপ দাসকে টালা থানার পুলিশ গ্রেফতার করে। শনিবার ফরেনসিক দফতরের পদার্থবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের একটি দল সংশ্লিষ্ট লিফ্ট থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। কোন তলা থেকে অরূপেরা লিফ্টে উঠেছিলেন, কোন বোতাম টিপেছিলেন, লিফ্ট কোথায় তাঁদের নিয়ে যায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগে থেকেই লিফ্টে যান্ত্রিক সমস্যা থাকলে তা কেন নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়নি? উঠছে সেই প্রশ্নও। সোমবার ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা ফরেনসিক দফতরের জীববিদ্যা বিভাগের আধিকারিকদেরও।
যেখান থেকে অরূপের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকেও ফরেনসিক দল নমুনা সংগ্রহ করেছে। নমুনা নেওয়া হয়েছে বেসমেন্ট থেকেও। লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল কি না, ঠিক কোথায় গলদ ছিল, খুঁজে বার করতে মরিয়া তদন্তকারীরা। লালবাজারের গোয়েন্দারা বিষয়টি দেখছেন। টালা থানা থেকে হোমিসাইড বিভাগ তদন্তভার গ্রহণ করেছে।