প্রতীকী ছবি
করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথমে বাবা, তার পরে কয়েক দিনের ব্যবধানে মারা যান মা-ও। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত মেয়ে তখন ‘পাশে আছি’ কথাটুকু শুনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বদলে এক মাস ধরে কার্যত একঘরে হয়ে থাকার যন্ত্রণা বয়ে চলেছেন ওই তরুণী ও তাঁর পরিবার। দমদমের মল রোডের বাসিন্দা, করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা তরুণীর কথায়, ‘‘কবে যে করোনা রোগীর দাগ মুছবে, জানি না!’’
এই আক্ষেপের পিছনে রয়েছে গত এক মাসের অভিজ্ঞতা। মে মাসের ১৮ তারিখ করোনার উপসর্গ নিয়ে সল্টলেকের বেসরকারি কোভিড হাসপাতালে ভর্তি হন তরুণীর ৭৩ বছর বয়সি বাবা। পরে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজ়িটিভ আসে। সাত দিনের মাথায় তাঁর ৬৮ বছরের স্ত্রী-ও আক্রান্ত হন। গত ৩০ মে বৃদ্ধের ও ৫ জুন তাঁর স্ত্রী-র মৃত্যু হয়। পরে আক্রান্ত হন তরুণীর জামাইবাবু, ছোট কাকা ও কাকিমা। সবাই হাসপাতালে ভর্তি হলে বিল কে মেটাবে, তা ভেবে তরুণী নিজে গৃহ পর্যবেক্ষণে ছিলেন। তাঁর রিপোর্ট পজ়িটিভ আসার তিন দিন পরে দমদম পুরসভার চেয়ারম্যান হরেন্দ্র সিংহের তৎপরতায় তাঁকে এম আর বাঙুরে ভর্তি করা হয়।
তরুণীর অভিযোগ, বাবা এবং মা হাসপাতালে থাকাকালীন তাঁদের বাড়ি বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। তাঁর মা-বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন জামাইবাবু। তাই তাঁদের ফ্ল্যাটও ঘিরে ফেলা হয়। তরুণীর দাবি, দু’টি বাড়িতেই ‘কোভিড ১৯’ লেখা পোস্টার সাঁটিয়ে দেন প্রতিবেশীরা। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘গৃহ পর্যবেক্ষণের সময়ে কী খাব, মা-বাবাকে হারিয়ে মানসিক অবস্থা কেমন, কেউ তা জানার চেষ্টা করেননি। সকলের একটাই চিন্তা— আমি যেন কারও সংস্পর্শে না আসি! শুধু কয়েক জন খোঁজখবর নিয়েছেন।’’
আরও পড়ুন: বিড়ি, আমের ফরমায়েশও পুলিশকে
এই অবস্থায় হাসপাতালের বিল মেটাতেও সমস্যায় পড়েন তরুণী। তিনি জানান, হাসপাতালে যাওয়া মাত্র দেড় লক্ষ টাকা জমা করতে বলা হয়। পরিচিত চিকিৎসকের সাহায্যে দু’বারই ৫০ হাজার টাকা জমা করেন। প্রথমে জামাইবাবু বিল মেটাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনিও আক্রান্ত হলে বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, টাকা দিতে যাওয়ার কেউ নেই। সে কথা শুনে হাসপাতাল থেকে লোক পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন তরুণী। তিনি জানাচ্ছেন, বাবা-মায়ের চিকিৎসায় দশ লক্ষ টাকার বেশি বিল হয়। স্থানীয় বিধায়ক ব্রাত্য বসুর হস্তক্ষেপে ন’লক্ষ টাকা দেন তিনি।
ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আক্রান্তের পরিজনেরা কোয়রান্টিনে থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই টাকা মেলেনি। সেই ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লক্ষ টাকা বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। টাকা পেতে বাড়িতে লোক পাঠানো প্রসঙ্গে তাঁদের বক্তব্য, পরিবারের তরফ থেকেই হয়তো সেই প্রস্তাব এসেছিল।
গত বুধবার সুস্থ হয়ে ওই তরুণী দিদির ফ্ল্যাটে ওঠেন। কিন্তু প্রতিবেশীদের আচরণে পরিবর্তন আসেনি। তরুণীর কথায়, ‘‘এমন ভাবে দেখছেন যেন অপরাধ করেছি। কাগজ বিক্রেতা, আনাজ বিক্রেতা বাড়িতে এলে অনেকে আপত্তি করছেন। দোকানে গেলেও এমন আচরণ করা হচ্ছে যেন আমরা অচ্ছুৎ! কেউ হোম ডেলিভারি করতে চাইছেন না। যে মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে, সেটাই তো শেষ করে দিচ্ছে!’’ তবে তরুণীর সব অভিযোগ মানতে চাননি প্রতিবেশীদের একাংশ।
স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর দেবিকা রায়ের দাবি, ওই পরিবারের প্রয়োজন সম্পর্কে তিনি খোঁজ রেখেছেন। তাঁর ওয়ার্ডে এমন অভিজ্ঞতা অনেকের হয়েছে। কাউন্সিলরের কথায়, ‘‘একটি পরিবারের কয়েক জনের পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসার পরেও ওঁরা ছাদে উঠলে বাকিরা নেমে যাচ্ছেন, এমনও ঘটেছে। এতে আক্রান্ত বা সম্ভাব্য রোগীর মনে যে চাপ পড়ছে তা দুর্ভাগ্যজনক। মানুষ নিজে সচেতন না হলে কী করব?’’