গত নভেম্বরে কসবায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছিল বাচ্চু হালদার নামে এক অভিযুক্তকে। কিন্তু ছিঁচকে অপরাধী হওয়ায় গ্রেফতারের কয়েক দিনের মধ্যেই জামিন হয়ে যায় তার। তদন্তকারী অফিসার জানতে পারেন, হরিদেবপুরের একটি খুনের ঘটনাতেও যুক্ত ছিল বাচ্চু। যাদবপুর, গরফা থানায় একাধিক দুষ্কর্মে অভিযুক্ত সে। কিছু মামলায় তাকে খুঁজছিল পুলিশ। এ সব দেখে কসবার তদন্তকারী অফিসার যখন মাথার চুল ছিঁড়ছেন, তত ক্ষণে বাচ্চু পগার পার!
পুলিশ অবশ্য বলছে, অপরাধীদের তথ্যপঞ্জী ঘাঁটতে প্রত্যেক থানার কম্পিউটারে ‘ক্রাইমবাবু’ নামে একটি সফটওয়্যার রয়েছে। ওই অফিসার তা ঘাঁটলেই আর মাথার চুল ছিঁড়তে হত না। লালবাজারের খবর, অফিসারদের এই তথ্যপঞ্জী ঘাঁটার কাজ আরও সহজ করতে এ বার অ্যাপস (ক্রিমিন্যাল ট্রাকিং সিস্টেমস বা সিটিএস) চালু করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু থানায় এবং গুন্ডাদমন শাখার অফিসারদের ফোনে অ্যাপস দেওয়া হয়েছে। পরে বাকি থানা এবং অন্যান্য শাখার অফিসারদেরও এই ফোন দেওয়া হবে। ওই অ্যাপসে থাকবে আলিপুর ও প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি অপরাধীদের তথ্যও।
লালবাজার জানাচ্ছে, বিশেষ করে যে কোনও নির্বাচনের আগে দাগিদের গতিবিধি জানতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করবে এই অ্যাপ। কোন দুষ্কৃতী কোন এলাকায় সক্রিয়, তার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আছে, তা তো মিলবেই। তার উপরে কোনও নতুন পুলিশ অফিসারের হাতে পড়ে যাতে দাগিরা না পালিয়ে যেতে পারে, সেটাও নিশ্চিত করা যাবে। এক পুলিশ অফিসারের কথায়, ‘‘হতেই পারে চুনো মাছ ধরতে গিয়ে জালে রাঘব বোয়াল ফেঁসে গেল। তখন তো সেটা দেখিয়েই নির্বাচন কমিশনের বাহবা কুড়োনো যাবে।’’
তবে অ্যাপের এখনও যা অবস্থা, তাতে এই নির্বাচনেই যে এটা খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে, তা মনে করছেন না অনেকেই। তাঁরা বলছেন, আগামী যে কোন নির্বাচন থেকেই এই অ্যাপ কলকাতা পুলিশের মুশকিল আসান হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন লালবাজারের কর্তারা।
পুলিশ সূত্রের খবর, কয়েক মাস আগে সাউথ সুবার্বন ডিভিশনে পরীক্ষামূলক ভাবে এরকম একটি অ্যাপস শুরু করার চেষ্টা হয়েছিল। যদিও তার খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। রাজীব কুমার পুলিশ কমিশনার পদে আসার পরে গোয়েন্দা বিভাগকে এই অ্যাপস তৈরির দায়িত্ব দেন। কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধদমন) দেবাশিস বড়াল বলেন, ‘‘অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করে যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তার জন্যই এই প্রচেষ্টা।’’
‘ক্রাইমবাবু’ থাকতেও ফের নতুন অ্যাপস আনা হচ্ছে কেন?
লালবাজারের কর্তাদের যুক্তি, ক্রাইমবাবু সফটওয়্যার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু গোলমাল হয়। তার উপরে অনেকে কম্পিউটার ঘাঁটতে চান না। এ ক্ষেত্রে অপরাধীদের তথ্যপঞ্জী খোঁজার বিষয়টি আরও সহজ হচ্ছে। যদিও পুলিশের একাংশের মতে, অফিসারেরা অনেক সময়ই অপরাধী ধরার পরে তার ইতিহাস খুঁজে বার করার ক্ষেত্রে সক্রিয় হন না। সে ক্ষেত্রে কম্পিউটারে সফটওয়্যারই থাক কিংবা স্মার্টফোনের অ্যাপস—কাজের কাজটা হবে কি?
বস্তুত, অপরাধীদের তথ্যপঞ্জী তৈরি করার ক্ষেত্রে লালবাজারের ‘ক্রাইম রেকর্ড সেকশন’ রয়েছে। সেখান থেকে তথ্য খুঁজে তড়িঘড়ি অপরাধের কিনারা হয়েছে, এমন নজিরও রয়েছে। তবে পুলিশের অনেকে বলছেন, ছুটির দিনে ওই শাখা বন্ধ থাকলে তথ্য মেলে না। তা ছাড়া, কলকাতা পুলিশের আওতাধীন এলাকা যে ভাবে বেড়েছে, তাতে তথ্য খুঁজতে দূর থেকে সরকারি তেল পুড়িয়ে আসাটাও ঝঞ্ঝাটের। এক সঙ্গে একাধিক থানার অফিসারেরা ওই শাখায় হাজির হলে তথ্য ঘাঁটতে প্রচুর সময় লেগে যায়। এই কারণেই এই ধরনের কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এক পুলিশকর্তা বলছেন, ‘‘অপরাধ ও অপরাধীদের তথ্যপঞ্জী কম্পিউটারে পুরে দেওয়ার প্রকল্প কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার-ই নিয়েছে। তার মধ্যে রাজ্যগুলি নিজের মতো করে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা গড়ছে।’’
আরও পড়ুন- তৃণমূল কর্মীর পা কেটে নেওয়ার ঘটনায় ২২ দিন পর ধৃত ১