Anandapur Fire

বেঁচে নেই হয়তো, শনাক্তও নয় দেহ, আনন্দপুরের ভস্মীভূত গুদামের সামনে অলৌকিকের প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে পরিজনেরা

আনন্দপুরের জো়ড়া গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পর ৩৯ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। এত ক্ষণে গোটা গুদাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নিখোঁজেরা যে বেঁচে ফিরবেন, এমন আশা নেই। তবু, অলৌকিকের আশায় বুক বাঁধছেন পরিজনেরা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪৩
Share:

(উপরে বাঁ দিক থেকে) নিখোঁজ শশাঙ্ক জানা, দেবাদিত্য দিন্দা এবং ক্ষুদিরাম দিন্দা। আনন্দপুরের ভস্মীভূত সেই গুদাম (নীচে)। — নিজস্ব চিত্র।

পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরের জো়ড়া গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পর ৩৯ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। নিখোঁজ আরও অনেকে। আশায় বুক বেঁধে সোমবার সকাল থেকেই পুড়ে খাক গুদামের বাইরে ঠায় বসে রয়েছেন নিখোঁজদের স্বজনেরা। দগ্ধ দেহাংশের খোঁজে উদ্ধারকর্মীরা হাতড়ে বেড়াচ্ছেন ধ্বংসস্তূপ।

Advertisement

এমনই এক নিখোঁজ ব্যক্তির নাম শশাঙ্ক জানা। পূর্ব মেদিনীপুরের শালিকা ধানিচকের বাসিন্দা শশাঙ্ক গত প্রায় ৮-১০ বছর ধরে আনন্দপুরে থাকতেন। দৈনিক মজুরিতে ফুলের কাজ করতেন তিনি। দু’তিন মাস অন্তর বাড়ি ফিরতেন। ছেলের অসুস্থতার খবর পেয়ে সরস্বতী পুজোয় বাড়ি গিয়েছিলেন শশাঙ্ক। কিন্তু পাওনা টাকা নিতে শনিবার আবার আনন্দপুরে ফিরে যান তিনি। শশাঙ্কের পরিবারের দাবি, রবিবার গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তিনিই প্রথম দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেছিলেন। তড়িঘড়ি বাকিদের ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলেন তিনিই। অথচ বাকিদের অনেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও খোঁজ মিলছে না সেই শশাঙ্কের। শশাঙ্কের ভাই অমল জানা বলেন, ‘‘এখনও দাদার কোনও খোঁজ নেই। কাল থেকে আমি ও আমার পরিবারের লোকজন এখানেই রয়েছি। আশায় বুক বেঁধে এসেছি, যদি খোঁজ পাই। থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছে।’’ অমলের ভাইপো সুশান্ত জানা অবশ্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। রবিবার রাতে একই জায়গায় ঘুমোচ্ছিলেন শশাঙ্ক ও সুশান্ত। অমল বলে চলেন, ‘‘দাদাই ভাইপোকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। তার পর অন্যদের ডাকতে চলে যায়। প্রাণভয়ে ভাইপো উপর থেকে নীচে ঝাঁপ দেয়। সে বেঁচে গিয়েছে।’’

প্রাথমিক চিকিৎসার পর সোমবার বিকেলে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন সুশান্ত। তবে আতঙ্কের রেশ এখনও কাটেনি তাঁর। কথা বলার মতো পরিস্থিতিতেও নেই তিনি। উপর থেকে ঝাঁপ দেওয়ার কারণে পিঠে চোট পেয়েছেন তিনি। এখনও পর্যন্ত সুশান্ত তাঁর পরিবারকে যতটুকু জানিয়েছেন, তাতে জানা গিয়েছে, রবিবার রাত আড়াইটে-৩টে নাগাদ হঠাৎ কোনও ভাবে ডেকরেটার্সের ওই গুদামে আগুন লেগে যায়। তীব্র আগুনের শিখার পাশাপাশি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। ফলে কেউ সহকর্মীদের বাঁচাতে পারেননি। যে যার প্রাণ বাঁচাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন সকলে। সুশান্তরা যে ঘরে ঘুমিয়েছিলেন, সেখানে অন্তত ১৮জন ছিলেন বলে দাবি। সকলেই ফুলের কাজ করতে পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আনন্দপুরে গিয়েছিলেন। সুশান্তর পরিবারের কথায়, এ রকম আরও দু’তিনটি ঘর ছিল। সেখানেও থাকতেন ঠিকাকর্মীরা।

Advertisement

এত ক্ষণে গোটা গুদাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নিখোঁজেরা যে বেঁচে ফিরবেন, এমন আশা নেই। তবু, অলৌকিকের আশায় বুক বাঁধছেন পরিজনেরা। এমনই আর এক নিখোঁজ কর্মী দেবাদিত্য দিন্দা। কিশোর দেবাদিত্যের এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়ার কথা ছিল। বাড়িতে মা, বাবা, দিদি রয়েছে তার। কয়েক দিনের জন্য আনন্দপুরে ডেকরেটার্সের কাজ করতে এসেছিল সে। দেবাদিত্যের কাকা জনমেঞ্জয় দিন্দার দাবি, তাঁর ভাইপোকেও ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলেন শশাঙ্ক। তবে শশাঙ্ক কিংবা দেবাদিত্য— খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কাউকেই। সে দিন রাতে পূর্ব মেদিনীপুরের যে ঠিকা কর্মীরা ওই ঘরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র তিন জন বেঁচে ফিরেছেন। বাকিদের কারও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি। সকলের নামেই থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছে। নিখোঁজদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, জেলা পুলিশের তরফে নিখোঁজদের বাড়ি গিয়ে কথা বলা হয়েছে। পরিজনদের সঙ্গে দেখা করেছেন বিডিও, এসডিপিও, এসডিও প্রমুখও। জনমেঞ্জয়ের কথায়, ‘‘কাল থেকে এখানে রয়েছি। থানায় গিয়েছি। আজ সকালে আবার এসেছি।’’ কিসের আশায়? উত্তরে ম্লান হেসে জনমেঞ্জয় বলছেন, ‘‘মন তো মানছে না!’’

পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার মালিগেড়িয়ার আরও তিন জন নিখোঁজ। তাঁদের নাম কৃষ্ণেন্দু ধাড়া, অনুপ প্রধান এবং বিশ্বজিৎ সাউ। ৩০ বছরের কৃষ্ণেন্দুর স্ত্রী এবং ন’বছরের ছেলে রয়েছে। অনুপের ঘরে রয়েছেন স্ত্রী ও দেড় বছরের সন্তান। বছর পঁচিশের বিশ্বজিৎ অবিবাহিত। ফুলের কাজে কয়েক দিন আগেই আনন্দপুরে গিয়েছিলেন তাঁরা। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে খোঁজ মিলছে না তাঁদের কারও। যে ক’টি দেহাংশ মিলেছে, শনাক্ত করা যায়নি সেগুলিও। মৃতদের শনাক্ত করতে পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পিংলার বিধায়ক অজিত মাইতি বলেন, ‘‘মর্মান্তিক দুর্ঘটনা! রাজ্য সরকার-সহ আমরা সকলেই পরিবারের পাশে আছি।’’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ওই গুদামে মাঝে মাঝে রাতেও কাজ চলত। গুদামের ভিতরে কয়েকটি ঘরে প্লাই দিয়ে থাকা এবং ঘুমোনোর বন্দোবস্ত করে নিয়েছিলেন শ্রমিকেরাই। কর্মীরা রাতে সেখানেই ঘুমোতেন। নিজেরাই রান্না করে খাওয়াদাওয়া করতেন তাঁরা। সেখান থেকেই কোনও ভাবে আগুন লেগে গিয়েছিল কি না, সে সব তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর খেয়াদহ-২ পঞ্চায়েত দফতরে গিয়ে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

রবিবার রাত প্রায় ৩টে নাগাদ আনন্দপুরের নাজিরাবাদের একটি মোমো কোম্পানির গুদামে আগুন লেগে যায়। পাশাপাশি অবস্থিত দু’টি গুদামে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। দমকলের ১২টি ইঞ্জিন কাজে লাগিয়েও সোমবার রাত পর্যন্ত সেই আগুন নেবানো যায়নি। মঙ্গলবার বেলার দিকেও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এ দিকে-ও দিকে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। কোথাও আবার ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া। এখনও পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। দগ্ধ দেহাংশ দেখে তাঁদেরও শনাক্ত করার উপায় নেই। দেহাংশগুলি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement