নিজের বুথেই হেরে গিয়েছেন মদন মিত্র, অধীর চৌধুরী, শশী পাঁজা এবং উদয়ন গুহ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের আস্থা অর্জন দূরে থাক, তাবড় তাবড় অনেক প্রার্থী নিজের বুথের ভোটারদের বিশ্বাসই অর্জন করতে পারেননি। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটের বুথভিত্তিক ফলে তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে। সম্প্রতি ফলাফলের বুথভিত্তিক হিসাবনিকাশ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রের মতোই নিজের বুথে হারের নিরিখে এগিয়ে তৃণমূল প্রার্থীরা। অন্য দলের প্রার্থীদের অনেকেও নিজের বুথে হেরেছেন। কেউ কেউ জিতে বিধানসভায় গেলেও নিজের বুথেই হেরে গিয়েছেন।
দিনহাটায় যেমন নিজের বুথেই হেরেছেন রাজ্যের প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ। জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ছিলেন এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণ। স্বপ্না হেরে যান। রাজগঞ্জের বুথভিত্তিক ফল বলছে, স্বপ্না যে বুথের ভোটার, সেখানেও হেরেছে তৃণমূল।
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এ বার টালিগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারীর কাছে হেরে গিয়েছেন। অরূপ টালিগঞ্জের যে বুথের ভোটার, সেখানেও জিতেছে বিজেপি। অরূপ একা নন, ‘পরিবর্তনের ঝড়ে’ নিজেদের ‘গড়’ ধরে রাখতে পারেননি তৃণমূলের অনেক তারকা বিধায়কও। রাজারহাট-গোপালপুরের তৃণমূল প্রার্থী অদিতি মুন্সি, সোনারপুর দক্ষিণের লাভলি মৈত্র কেবল তাঁদের কেন্দ্রেই হারেননি, নিজেদের বুথও বাঁচাতে পারেননি।
একটি কেন্দ্রের প্রার্থী, অন্য কেন্দ্রের ভোটার হতে পারেন। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে সব দলেই এমন বহু প্রার্থী ছিলেন, যাঁদের নাম অন্য কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় রয়েছে। লোকসভা এবং রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ তথা কংগ্রেসনেত্রী মৌসম বেনজির নুর এ বার মালদহের মালতীপুরের প্রার্থী ছিলেন। ওই আসনে কংগ্রেসকে হারিয়ে জয়ী হয়েছে তৃণমূল। মৌসম আদতে মালদহের ইংরেজবাজার বিধানসভার ভোটার। নিজের বুথেও কংগ্রেসকে জয়ী করতে পারেননি তিনি।
নানা কাণ্ডকারখানার জন্য ভোটের আগে-পরে সংবাদ শিরোনামে ছিলেন তৃণমূলের বাইরন বিশ্বাস। তৃণমূলের ভোট বিপর্যয়ের মধ্যেও মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি আসনে জয়ী হয়েছেন তিনি। কিন্তু বাইরন সমশেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের যে বুথের ভোটার, সেখানে হেরে গিয়েছে তৃণমূল। আসনটি অবশ্য এ বারেও ধরে রেখেছে তারা। উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছেন মধুপর্ণা ঠাকুর। তিনি মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সদস্য, রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ মমতাবালা ঠাকুরের কন্যা। মতুয়া ঠাকুরবাড়ি গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত। ওই কেন্দ্রে নিজের বুথেই হেরে গিয়েছেন মধুপর্ণা।
তৃণমূলের তারকা মুখ সোহম চক্রবর্তী নদিয়ার করিমপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছেন। তিনি বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের যে বুথের ভোটার, সেখানেও জয়ের মুখ দেখেনি তৃণমূল। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম কলকাতা বন্দর কেন্দ্র থেকে এ বারেও জয়ী হয়েছেন। তিনি ভবানীপুরের ভোটার। ভবানীপুরে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফিরহাদের বুথেও জয়ী হয়েছে বিজেপি। রাজ্যের আর এক প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দমদম উত্তর কেন্দ্রে হেরে গিয়েছেন। রাসবিহারীতে চন্দ্রিমার বুথেও হেরে গিয়েছে তৃণমূল। দমদম কেন্দ্রে হেরে গিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। বিধাননগরে তিনি যে বুথের ভোটার, সেখানেও হেরে গিয়েছে তৃণমূল।
চমক রয়েছে নন্দীগ্রামের বুথভিত্তিক ফলাফলেও। শুভেন্দুকে হারাতে এ বার সেখানকার ‘ভূমিপুত্র’ পবিত্র করকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। কিন্তু নিজের গ্রামেই তৃণমূলকে জেতাতে পারেননি পবিত্র। বীরভূমের হাসন কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন তৃণমূলের কাজল শেখ। কিন্তু নানুর কেন্দ্রে তাঁর নিজের বুথেই হেরে গিয়েছে তৃণমূল।
বামেদের তরুণ তুর্কিদের অনেকেই নিজের এলাকায় পরাজিত হয়েছেন। দীপ্সিতা ধর দমদম উত্তর কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন। ডোমজুড়ে যে বুথ এলাকায় তাঁর বাড়ি, সেখানে জিততে পারেনি সিপিএম। পানিহাটিতে হেরেছেন সিপিএমের আর এক যুব মুখ কলতান দাশগুপ্ত। তিনিও তাঁর বুথে দলকে জেতাতে পারেননি। মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় উত্তরপাড়ায় হেরেছেন। কুলটিতে তাঁর বুথেও হেরেছে বামেরা। নিজের বুথে হেরে গিয়েছেন যাদবপুরের বাম প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও।
দীর্ঘ দিন ধরেই রাজ্য রাজনীতিতে অধীর চৌধুরী আর বহরমপুর কার্যত সমার্থক ছিল। বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে জিততে পারেননি প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। এমনকি নিজের বুথেও হেরে গিয়েছেন তিনি। আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকি ভাঙড়ের বিধায়ক হলেও তাঁর বাড়ি হুগলি জেলার ফুরফুরায়। এই জায়গাটি জাঙ্গিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত। এখানে আইএসএফ প্রার্থী না-দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তাদের শরিক দল সিপিএম। কিন্তু নওশাদের নিজের বুথেই জিততে পারেনি সিপিএম।
চলতি বছরের শেষে কলকাতা পুরসভায় নির্বাচন হওয়ার কথা। তার পর রাজ্যের বাকি পুরসভাগুলিতে ভোট হতে পারে। শহরাঞ্চলে একটি ওয়ার্ডে একাধিক বুথ থাকে। গ্রামে তুলনায় বুথের সংখ্যা কম হয়। দলের প্রাক্তন নেতা-মন্ত্রীরা যে ভাবে নিজেদের বুথ আগলাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাতে পুরভোটের আগে চিন্তায় থাকবে তৃণমূল। ‘হেভিওয়েটদের’ বুথে হারিয়ে স্বস্তিতে থাকবে বিজেপি।