পুরস্কৃত মধুমিতা পরিয়ারি (হলুদ শাড়ি)। মঙ্গলবারের নিজস্ব চিত্র।
বিপিএল পরিবারের মেয়েদের হাতেও কি থাকতে পারে কোটি টাকা?
পারে বইকী, যদি তারা তৈরি করে থাকে নিজেদের ব্যাঙ্ক। গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে তৈরি ছোট ছোট স্বনির্ভর দল থেকে ক্রমে উপসংঘ, সংঘ, মহাসংঘ তৈরি করে শেষ ধাপে ‘কমিউনিটি ফিনান্স ইনস্টিটিউট’ তৈরি করতে পেরেছেন ঝাড়গ্রামের মেয়েরা। যা সমবায় ব্যাঙ্কের মতোই নিজেদের সদস্যদের সঞ্চয় জমা নেয়, ঋণ দেয়। ঝাড়গ্রামের মেয়েদের সিএফআই সদস্যদের ঋণ দিয়েছে দেড় কোটি টাকারও বেশি। বৃহস্পতিবার (১৩ অগস্ট) ঝাড়গ্রামের এই আর্থিক সংস্থার মেয়েদের হাতে আরও ২০ লক্ষ টাকা তুলে দেবেন জেলাশাসক। যাতে আরও মজবুত হয় সংস্থার কাজ।
সিএফআই-এর কোষাধ্যক্ষ মধুমিতা পরিয়ারি জানালেন, ঝাড়গ্রামের ১৮২০টি স্বনির্ভর দলের মধ্যে সিএফআইয়ের সদস্য এখন ১৭৪০টি। যার মধ্যে ১৩৬০টি দল ঋণ নিয়েছে। এর আগে দু’দফায় ৪০ লক্ষ টাকা করে অনুদান দিয়েছে সরকার। চলতি বছরে ঋণের পরিমাণ দেড় কোটি টাকা পেরিয়ে যাওয়ায় ফের সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। তাই বাড়তি সাহায্য মিলছে। মধুমিতাদেবীর আশা, এ বার আরও কিছু স্বনির্ভর দলকে সদস্য করে, তাদের ঋণ দিতে পারবেন তাঁরা। জেলা পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের প্রকল্প অধিকর্তা নিবেদিতা মণ্ডল বলেন, “এই মহাসংঘ ও সিএফআই প্রথম থেকেই গুরুত্ব দিয়ে সব কাজ করছে। তাই আগেও সরকারি অনুদান পেয়েছে। তাঁদের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে সরকার আরও ২০ লক্ষ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
ধাপে ধাপে কী করে গড়ে উঠল সিএফআই, তার গল্পও শোনালেন মধুমিতাদেবী। ২০০১ সালে রাধাগোবিন্দপুরে তাঁরা শুরু করেন তাঁদের স্বনির্ভর দল। ২০০৭ সালে সংসদে দলগুলিকে নিয়ে তৈরি হয় উপসংঘ। পরের বছরই সব সংঘ থেকে দু’জন প্রতিনিধি নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে তৈরি হয় সংঘ। ব্লক স্তরে মহাসংঘ বা ফেডারেশন অবশ্য ২০০৬ সালেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ২০০৯ সালে তা ‘সিএফআই’ বা মহিলাদের সমবায় ব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। তখন সদস্য ছিল মাত্র ২৩৯টি স্বনির্ভর দল। এ বার ১৮২০টি-র প্রায় সবক’টিই আসতে চলেছে সিএফআই-এর অধীনে।
এতে মহিলাদের সুবিধে কী? মধুমিতা দেবী জানালেন, এখন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য মহিলারা যেমন সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিতে পারে, তেমনই আবার সিএফআই থেকেও ঋণ নিতে পারে। টাকার প্রয়োজনে তাঁদের বিপদে পড়তে হচ্ছে না, রোজগারের উপায়ও হচ্ছে। যেমন, রীতা মাহাতোর স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে নার্সিং হোমে ভর্তি হওয়ার পর তিনি সিএফআই থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন। আবার, স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার আতান্তরে পড়া এক মহিলা পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে রোজগার শুরু করে এখন স্বনির্ভর হয়েছেন। চিকিত্সা, পড়াশোনা, বিয়ে, চাষবাস - পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এক সময়ের মাওবাদী উপদ্রুত ঝাড়গ্রাম ব্লকের মহিলারা তাঁদের নিজস্ব আর্থিক সংস্থাকে ধরে বাঁচতে শিখছেন।
কী করে চলে সিএফআই? সিএফআই-এর সদস্য হতে গেলে প্রতিটি স্বনির্ভর দলকে ২ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। তাতে হয় ৪ লক্ষ ৭৮ হাজার টাকা। ঋণের উপর ১২ শতাংশ সুদের লভ্যাংশের মধ্যে দল পায় ৩০ শতাংশ, সঙ্ঘ ৪০ শতাংশ ও মহাসঙ্ঘ ৪০ শতাংশ। গত বছর সুদ বাবদ সিএফআই আয় করে প্রায় ৯ লক্ষ ৮৭ হাজার টাকা। রোজগার বাড়াতে ঝাড়গ্রামের বিডিও ও এসডিও অফিসের ক্যান্টিন চালানোর দায়িত্বও নিয়েছেন সিএফআই সদস্যরা। খাবার সরবরাহও করেন। নির্বাচন হোক বা প্রশাসনিক বৈঠক, খাবার সরবরাহের বরাতও মেলে তাঁদেরই। সেই মুনাফা থেকেই অফিসের আসবাবপত্র কেনা, নানা বেতন মেটানো হয়।
বহু মেয়ের জীবন বদলে দিয়েছে সিএফআই। সম্পাদিকা অমিতা মাহাতোর কথায়, “চাষ করতে মহাজনের কাছে ঋণ নিতে হত। এখন আর তা হয় না। ঋণ পাই সিএফআই থেকেই। দু’বার ঋণ নিয়ে শোধ করে দিয়েছি। ফের ঋণ নিয়েছি। আমাদের তাগিদেই আমরা এটাকে বাড়াতে চাইছি।” স্বামীহারা সুষমা খাড়ার কথায়, “মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের কাছে থাকি। ঋণ নিয়ে ছাগল চাষ করে লাভ করেছি। ভাইকে বাড়ি তৈরিতেও সাহায্য করেছি। সিএফআই না থাকলে হয়তো ভেসে যেতাম। তাই তো সিএফআইকে প্রাণ দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করি।”