বেশিরভাগ চালকল ধুঁকছে, কৃষকের ভরসা সেই ফড়ে

লগ্নি টানতে বিদেশ যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। অথচ মুখ থুবড়ে পড়ছে ঘরের শিল্প।রাজ্যের চালকলগুলির দশা এই বৈপরীত্যকেই প্রকট করে। এমনিতেই সব ব্লকে চালকল নেই। ফলে, সেখানে ফড়েদের রমরমায় ধানের প্রকৃত দাম পান না চাষিরা।

Advertisement

সুমন ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:১২
Share:

খুঁড়িয়েই চলছে চালকল। কেশপুরের আমড়াকুচিতে। নিজস্ব চিত্র।

লগ্নি টানতে বিদেশ যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। অথচ মুখ থুবড়ে পড়ছে ঘরের শিল্প।

Advertisement

রাজ্যের চালকলগুলির দশা এই বৈপরীত্যকেই প্রকট করে। এমনিতেই সব ব্লকে চালকল নেই। ফলে, সেখানে ফড়েদের রমরমায় ধানের প্রকৃত দাম পান না চাষিরা। আর যে কটি ব্লকে চালকল ছিল, তা-ও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে যেখানে ৭২টি চালকল ছিল, সেখানে এখন চলছে মাত্র ৪২টি!

অথচ প্রতি ব্লকে চালকল জরুরি মূলত ধানের দাম যথাযথ রাখতে। যে ব্লকে চালকল নেই সেখানে বাধ্য হয়ে ফড়েদের ধান বিক্রি করেন চাষিরা। আর ফড়েরা সব সময় কম দামেই চাষির থেকে ধান কেনার চেষ্টা করে। এলাকায় একাধিক চালকল থাকলে প্রতিযোগিতাও থাকবে। আখেরে লাভবান হবেন চাষিই। তা সত্ত্বেও সবং, কেশিয়াড়ি, শালবনি, গোপীবল্লভপুর, নয়াগ্রাম-সহ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ১১টি ব্লকে এই মুহূর্তে কোনও চালকল নেই। ফলে, সরকারও সহায়ক মূল্যে ধান কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

Advertisement

চালকল মালিকরা জানিয়েছেন, গণবন্টন ব্যবস্থার চাল সংগ্রহ করতেই সরকার লেভি নিত। কুইন্টাল প্রতি ধান থেকে চাল তৈরি করতে খরচ মিলত ২০ টাকা। আর মিলত রাইস ব্র্যান। তা থেকে পাওয়া যেত ৬৪ টাকা। কিন্তু খরচ হত, প্রায় ১০২ টাকা। ফলে লেভি দিলে লোকসান ছিল প্রায় ১৮ টাকা। কোনও সময় চালকলের একশো শতাংশই লেভি হিসাবে নিয়ে নিত সরকার। এখন আর লেভি দিতে বাধ্য নন তাঁরা। পশ্চিম মেদিনীপুর ডিস্ট্রিক্ট রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জয়ন্ত রায়ের কথায়, ‘‘লেভি বন্ধ হওয়ায় আমরা নিজেদের মতো ব্যবসা করতে পারব। ফলে, বন্ধ চালকল ফের চালুর সুযোগ রয়েছে। অনেকে নতুন করে রাইস মিল খোলায় উত্‌সাহিতও হবেন। তবে সরকারের সহযোগিতা জরুরি।’’

কী রকম সহযোগিতা?

Advertisement

জানা গিয়েছে, চালকলের জন্য ২২টি দফতরের ছাড়পত্র লাগে। সব আবার জেলাতে নেই, তার জন্য অন্য জেলা বা কলকাতায় ঘুরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। গিরিবালা রাইস মিলের মালিক অরিন্দম খাঁ যেমন জানালেন, ২০০৮ সালে ৩৫ লক্ষ টাকার সরঞ্জাম কেনার ভর্তুকি এখনও পাননি। দু’বছর হল চালকলটি বন্ধ হয়ে রয়েছে। অরিন্দমবাবুর কথায়, ‘‘ফের চালকল খুলতে এত প্রশাসনিক ঝক্কি যে কতটা সফল হব জানি না। প্রক্রিয়ার সরলীকরণ জরুরি।’’ মেদিনীপুর শহরের রোহিণী রাইস মিলের মালিক তাপস রায়ের ভর্তুকির টাকাও দীর্ঘ তিন বছর ধরে পড়ে রয়েছে। বারবার আবেদন জানিয়েও লাভ হয়নি। চালকল মালিক সংগঠনের নেতা জয়ন্তবাবুর আবার অভিযোগ, ‘‘হিমঘর বিদ্যুত্‌ বিলে ছাড় পায়, অথচ আমরা পাই না। আমাদেরও এই ছাড় দিলে, সঙ্গে চাল রফতানির যথাযথ পরিকাঠামো গড়ে তুললে জেলার প্রতিটি প্রান্তেই এই শিল্প গড়ে উঠবে।’’

চালকল সংক্রান্ত সমস্যার জানানোর যে মঞ্চ, সেই জেলা শিল্প কমিটির বৈঠকেও চালকল মালিকদের ডাকা হয় না বলে অভিযোগ। শেষ এঁদের বৈঠকে ডাকা হয়েছিল ২০১২ সালে। সংগঠনের সম্পাদক দীপঙ্কর দে-র কথায়, “তাহলে আমরা কী ভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখব। ৭-৮ কোটি টাকা খরচ করে চালকল করেছিলাম ৩-৪ একর জমিতে। ওই জমিতে শিল্প ছাড়া কিছু হবে না। ওই সামান্য জমিতে বড় শিল্পও হবে না যে অন্য কোনও উদ্যোগপতি কিনে নেবেন। সরকার সহযোগিতা না করলে তো বিপদে পড়ে যাব।’’

তবু কেন চালকল বাঁচাতে উদ্যোগী নয় প্রশাসন?

জেলা পরিষদের ক্ষুদ্র শিল্প স্থায়ী সমিতির কমার্ধ্যক্ষ অমূল্য মাইতির অবশ্য দাবি, “আমাদের কাছে তো কেউ এই সব সমস্যা নিয়ে আসেনি। বললে, নিশ্চয় খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করব।’’ আর যেখানে ভর্তুকির টাকা মেলে, সেই জেলা শিল্প কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সুরজিত্‌ দাস বলেন, “ভর্তুকির টাকা পড়ে থাকার কথা নয়। তাহলে নিশ্চয় কাগজপত্রে ত্রুটি রয়েছে।’’ সমস্যার কথা তাঁদের জানানোর আহ্বান করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ামক পার্থপ্রতিম রায়। জঙ্গলমহলে নতুন চালকলের জন্য সরকার ৭৫ লক্ষ ও অন্য ক্ষেত্রে ৫০ লক্ষ টাকা দেবে বলেও জানান তিনি। আর জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনার আশ্বাস, “সমস্যা জানালে নিশ্চয়ই পদক্ষেপ করা হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement