শরশঙ্কার মাজার (বাঁ দিকে)। পাশে দিঘি (ডান দিকে)। নিজস্ব চিত্র।
একদিকে মহাভারতের কাহিনী ও ইতিহাস ঘিরে লোককথা আর অন্য দিকে পির মাজার ঘিরে অলৌকিক বিশ্বাস। সঙ্গে পৌষ সংক্রান্তি পরব ও বিশাল দিঘির মহিমা। এই নিয়ে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন শরশঙ্কা আজও নজর টানছে লক্ষ লক্ষ ধর্মানুরাগী ও পর্যটকদের। সরকারি উদ্যোগে সদ্য সংস্কার হয়েছে রাজ্যের বৃহত্তম এই দিঘি। বিডিও মঞ্জুশ্রী মণ্ডল বলেন, “এই দিঘি, তার পাড়ের মন্দির ও মাজার ঘিরে এলাকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির যে ছবি কয়েকশো বছর ধরে রয়েছে সেটাই এখানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।”
দু’দিনের মেলা আজ তাই চলে ছ’দিন ধরে। মেলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে হয়েছে স্থানীয় শালিকোঠা গ্রাম পঞ্চায়েত ও দাঁতন-১ পঞ্চায়েত সমিতিকে। প্রধান সনজিদা বিবি বলেন, “আজ সংক্রান্তি। আর বৃহস্পতিবার পীরের মৃত্যু দিন। এই এলাকায় হিন্দু, মুসলিম ও আদিবাসীদের সহাবস্থান কয়েক শতক ধরে। দুই পরবেই মানুষ সামিল হন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে।” স্থানীয় আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি গবেষক অতনুনন্দন মাইতি জানান, মহাভারতের মূষল পর্বে শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষে আশ্রয় নেওয়াকালীন জরা ব্যাধের শরাঘাতে হাত থেকে পাঞ্চজন্য শঙ্খ ছিটকে পড়ে। তার আঘাতেই এই দিঘির সৃষ্টি বলে লোকবিশ্বাস। তাছাড়া, পাণ্ডবরা বিরাটনগরে যাওয়ার পথে পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে এই দিঘির পাড়ে রাত্রিযাপন ও স্নান করেন। তারই অনুকল্পে দিঘির একটি ঘাটের নাম পাণ্ডব ঘাট। যেখানে মকর সংক্রান্তি বা সারা বছর স্নান করেন পুণ্যার্থীরা।
আবার লোককাহিনী, সপ্তম শতকের গোড়ায় মায়ের নির্দেশে এই দিঘি খনন করান রাজা শশাঙ্ক। যদিও কোনোওটিরই বাস্তব ভিত্তি নেই। কিন্তু এই কাহিনীগুলির সূত্রই এই দিঘিকে অনন্য মহিমা দান করেছে। বংশপরম্পরায় পির মাজারটির সেবক মোলায়েম শা। তিনি বলেন, “এই পুণ্য দীঘির পাড়েই সাধনা করতেন পীর লস্করগঞ্জ দেওয়ান। মকর সংক্রান্তির আগের রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। সেই থেকেই হিন্দু মুসলিম সকলেই এই মাজারে চাদর চড়ান ও ভোগ দেন। আর দুই পরব মিলিয়ে মেলার টানে ভিন রাজ্য থেকেও আসেন পুণ্যার্থীরা।”
এই মাজার সাফ সুতরো করে সন্ধেবেলায় প্রদীপ জ্বালান মির্জাপুর গ্রামের বধূ কাঞ্চন দাস। তিনি বলেন, “পরম্পরায় আমাদের বাড়ির বধূরা এই কাজ করেন পীরের অলৌকিক শক্তির উপর আস্থা রেখে।” স্থানীয় মোলাম শাহ জানান, তাঁরা মুসলিমরা পিরকে মুরগির ঝোল, রুটি, লাউয়ের মোরব্বা ভোগ দেন এই ক’দিন। পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি জার্মান শাহ জানান, অনেক উদার মুসলিমও সংক্রান্তির ভোরে পাণ্ডব ঘাটে স্নান করে মাজারে যান। দিঘির পূর্ব ও উত্তর পাড়ে প্রায় আশি একর জমিতে কয়েকশো দোকান বসে মেলা উপলক্ষে। পোড়া মাটি, বাঁশ, কাঠ ও লোহার তৈরি গৃহস্থালির সামগ্রী নিয়ে আসেন পসারিরা।
ঐতিহাসিক দাঁতনের মোগলমারি খ্যাত হিংসা ও অহিংসার দ্বৈত ভূমি হিসাবে। আর শরশঙ্কার ঐতিহ্য সম্প্রীতির তীর্থ ভূমি হিসাবে।