সব জানলে ছাড়তাম না, আক্ষেপ তাজেনুরের

শরীরটা যেন ঝলসে গিয়েছে। মাঝে-মধ্যেই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ছেলে। ছেলের এই অবস্থা দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না তাজেনুর বিবি। ছুটে যাচ্ছেন ডাক্তার- নার্সদের কাছে। সঙ্গে কাতর আর্জি, ‘‘ওকে একটু দেখুন।” ডাক্তার- নার্সরা আশ্বস্ত করছেন। তবে সেই আশ্বাস মায়ের যন্ত্রণায় মলম দিতে পারছে কই। তাজেনুর বলছিলেন, “আমার একটাই ছেলে। রাজমিস্ত্রির কাজ করবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। অন্য কাজে যাচ্ছে শুনলে বাড়ি থেকে বেরোতেই দিতাম না।শরীরটা যেন ঝলসে গিয়েছে। মাঝে-মধ্যেই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ছেলে। ছেলের এই অবস্থা দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না তাজেনুর বিবি। ছুটে যাচ্ছেন ডাক্তার- নার্সদের কাছে। সঙ্গে কাতর আর্জি, ‘‘ওকে একটু দেখুন।” ডাক্তার- নার্সরা আশ্বস্ত করছেন। তবে সেই আশ্বাস মায়ের যন্ত্রণায় মলম দিতে পারছে কই। তাজেনুর বলছিলেন, “আমার একটাই ছেলে। রাজমিস্ত্রির কাজ করবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। অন্য কাজে যাচ্ছে শুনলে বাড়ি থেকে বেরোতেই দিতাম না।

Advertisement

বরুণ দে

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০১৫ ০৩:৪৪
Share:

মেদিনীপুর মেডিক্যালে ছেলে ফারুর শেখের পাশে বসে তাজেনুর বিবি।

শরীরটা যেন ঝলসে গিয়েছে। মাঝে-মধ্যেই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ছেলে। ছেলের এই অবস্থা দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না তাজেনুর বিবি। ছুটে যাচ্ছেন ডাক্তার- নার্সদের কাছে। সঙ্গে কাতর আর্জি, ‘‘ওকে একটু দেখুন।” ডাক্তার- নার্সরা আশ্বস্ত করছেন। তবে সেই আশ্বাস মায়ের যন্ত্রণায় মলম দিতে পারছে কই। তাজেনুর বলছিলেন, “আমার একটাই ছেলে। রাজমিস্ত্রির কাজ করবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। অন্য কাজে যাচ্ছে শুনলে বাড়ি থেকে বেরোতেই দিতাম না। এটা কি ওর ছোট বোমার মশলা তৈরি করার বয়স?’’ পিংলার বিস্ফোরণে জখম বছর বারোর শেখ ফারুককে দেখে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে মেদিনীপুর মেডিক্যালের সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে কর্মরত ডাক্তার- নার্স থেকে অন্য রোগীর পরিজনদের মধ্যে। ফিরোজা বিবি নামে এক পরিজনের কথায়, “ছেলেটাকে দেখে কষ্ট হচ্ছে। শরীরের কী অবস্থা। চোখে দেখাই যায় না।”

Advertisement

ফারুকের পাশাপাশি মেদিনীপুর মেডিক্যালে ভর্তি রয়েছেন পিংলার বিস্ফোরণে জখম আরও তিন জন। মুস্তাক শেখ, জহিরুদ্দিন শেখ এবং খোকন মাঝি। প্রথম তিনজনের বাড়ি মুর্শিদাবাদের সুতিতে। খোকনের বেলদার খাকুড়দায়। শুক্রবার সকালে মুস্তাককে অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মেদিনীপুর মেডিক্যাল থেকে নিয়ে চলে যায় পুলিশ। জখম ওই যুবকের মা শিরিনা বিবির কথায়, “সকাল ১১টা নাগাদ পুলিশ এসে ওকে নিয়ে যায়। ওর কী দোষ? কেন নিয়ে যাচ্ছে, তাও বলে যায়নি।” জহিরুদ্দিন মুস্তাকেরই দাদা। জখম দুই ছেলেকে

হাসপাতালের শয্যায় দেখে চোখের জলে বাঁধ দিতে পারেননি শিরিনা। তাঁর কথায়, “বাড়ি কারখানাতেই পুড়ে মারা গিয়েছিল ওদের বাবা। দুই ছেলেও সেই আগুনে পুড়ল। পোড়া কপাল আমার।” জহিরুদ্দিনের মা-ও বলছেন, “রাজমিস্ত্রির কাজ করবে বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। এখানে এসে শুনি, ও আমায় ভুল কথা বলেছিল। ও ছোট বোমা তৈরির মশলা তৈরির কাজ করত।” জখম খোকনের দাদা তপন মাঝি বলেন, “ভাই জানিয়েছিল ও ফিসারির কাজ করে। বাজি তৈরির কারখানায় কাজ করে বলে শুরুতে আমরা জানতামই না। যখন জানি, তখন ওকে কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলি। ও শোনেনি।” তাঁর কথায়, “মাস দেড়েক হল ও এই কাজ করছিল। তারমধ্যেই এমন ঘটনা ঘটে গেল।”

Advertisement

বিস্ফোরণে ছেলে মারা গিয়েছে। মর্গের বাইরে অপেক্ষায় মা।

জখমদের চিকিত্‌সা ঠিক মতো হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের পরিজনদের। তাজেনুর যেমন বলছিলেন, “সময় মতো ডাক্তার আসছেন না।” একই দাবি শিরিনার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবশ্য বক্তব্য, জখমদের চিকিত্‌সার দিকে নজর রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছে। হাসপাতাল সুপার যুগল কর বলেন, “একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্‌সকেরা রয়েছেন। জখমদের চিকিত্‌সার দিকে সব সময়ই নজর রাখা হচ্ছে।” মুস্তাক শেখ বাদে বাকি তিনজনকে কলকাতার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করারও চেষ্টা চলছে। কারণ, মেদিনীপুর মেডিক্যালে বার্ন ইউনিট নেই। শুক্রবার দুপুরে হাসপাতালে আসেন চিকিত্‌সক তথা বিজেপির রাজ্য সহ- সভাপতি সুভাষ সরকার। তিনি জখমদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তাঁদের পরিজনদের সঙ্গেও কথা বলেন। চিকিত্‌সার ব্যাপারে খোঁজখবর নেন। পরে ফোনে কথা বলেন হাসপাতাল সুপারের সঙ্গেও। সুভাষবাবু বলেন, “একজনের শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। ওকে দ্রুত কলকাতায় পাঠানো জরুরি। সুপারের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছি।” বিকেলে হাসপাতালে আসেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। সিপিএমের চিকিত্‌সক নেতাও জখমদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তাঁদের পরিজনদের সঙ্গে কথা বলেন। চিকিত্‌সার ব্যাপারে খোঁজখবর নেন। এদিন বিকেলে মেদিনীপুর মেডিক্যালে এসে জখমদের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করেন ডিআইজি সিআইডি (অপারেশন) দিলীপ আদকও।

Advertisement

আগুনে শরীর ঝলসে গিয়েছে জহিরুদ্দিন, ফারুকদের। পোড়া বারুদের গন্ধটা যেন এখনও চোখে- নাকে লেগে রয়েছে। আপাতত, এই যন্ত্রনা থেকে বেরোনোরই পথ খুঁজছেন তাঁদের পরিজনেরা। তাজেনুর বলছিলেন, “ছেলেটা তাড়াতাড়ি সুস্থ না হলে যে কী হবে!” বলতে বলতে গলা ধরে আসছিল তাঁর। তাজেনুরের স্বামী সাদেক শেখও যে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ভাবে অসুস্থ।

—নিজস্ব চিত্র।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement