এলেম নিজের দেশে
Coronavirus

তিন দিন ধরে এলাম, কেউ করেনি পরীক্ষা

বাড়ির উঠোনে হাসি ফোটাতে বাড়তি রুজির হাতছানিতে ওঁদের ঠিকানা ভিন প্রদেশে। কিন্তু লকডাউনের অনুশাসনে রুজি তো গেছেই ঘরে ফেরাও ঝুলে ছিল সুতোর উপরে। দুর্বিষহ সেই প্রবাস কিংবা অনেক লড়াইয়ের পরে ফিরে আসার সেই গল্প বলছেন পরিযায়ী শ্রমিকেরা, শুনল আনন্দবাজারভিন্ রাজ্যে আমরা যারা থাকি কী জানি সকলের সঙ্গে একটা যোগাযোগ হয়ে যায়।

Advertisement

তরুণকুমার সাহা

শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২০ ০৩:২০
Share:

প্রতীকী ছবি।

বছরে এগারো মাস মুম্বইয়ে থাকি দর্জির কাজ করি। কিন্তু লকডাউনের সময় আমাদের চেনা লোকজন অচেনা হয়ে যেতে শুরু করে। একই সঙ্গে বাজারে জিনিসপত্রের দাম দিন দিন বাড়তে শুরু করে। মাসে আগে খরচ হত চার হাজার টাকা, তা বেড়ে প্রায় ছয় হাজার টাকা হয়ে যায়। যে চাল ৪০ টাকা কেজি ছিলো ওই চাল আমাদের কিনতে হয়েছে ৫০ টাকা কেজিতে, তেল ১০০ টাকা লিটারের পরিবর্তে বেরে ১৫০ টাকা হয়ে গিয়েছিল, ডাল ৯০ টাকা থেকে বেরে ১৩০ টাকা কেজি হয়ে যায়। আলু ২০ টাকা কেজি থেকে একলাফে ৫০ টাকা হয়ে যায়। সকালে দু’টি রুটি দিয়ে টিফিন করতাম, কিন্তু লকডাউনের প্রথম তিন সপ্তাহ হয়ে যাওয়ার পর যখন পুনয়ায় লকডাউন শুরু তখন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তখন অনুমান করি লকডাউন এখন উঠবে না। চড়া দামে জিনিসপত্র কিনে খাওয়া দাওয়া করা আবার ঘর ভাড়া দিয়ে থাকার থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়া ভাল। ভিন্ রাজ্যে আমরা যারা থাকি কী জানি সকলের সঙ্গে একটা যোগাযোগ হয়ে যায়। সকলে মিলে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করতে থাকি। আমাদের পরিচিতদের মধ্যে বারো জন বাড়ি ফিরতে চাই। আমরা জানতে পারি মুম্বই থেকে একটি শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন দেওয়া হবে। তার জন্য একটি ফর্মে ৩২ জনের নাম নথিভুক্ত করে রেলের কাছে জমা দিতে হবে। ওই নাম জমা দিতে গিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাত খেতে হয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকার থেকে আমরা কোনও রকম সহযোগিতা পাইনি। একই ভাবে আমাদের রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সাহায্য পাইনি। উল্টে মহারাষ্ট্র থেকে কোনও শ্রমিক যাতে আমাদের রাজ্যে ফিরতে না পারেন, সেই চেষ্টা রাজ্য সরকার করেছে।

Advertisement

এদিকে আমরা যে মহল্লায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি, সেই মহল্লাতে আমাদের বাড়ির আশেপাশে তিন জন করোনাভাইরাস সংক্রমণ পজ়িটিভ হয়। আবার তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। তারপর আমাদের পাশের বাড়ি এক মহিলা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তারপর থেকে আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। বাড়ি থেকে নিয়মিত ফোন করত, কিন্তু আমরা বাড়িতে আমাদের কষ্টের কথা কোন দিন জানাইনি। দু’বেলা আধপেটা খেয়ে কাটাতে হয়েছে ৫৫ দিন। পরে দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে একটি মিনিবাস ভাড়া করে বারোজন শ্রমিক বাড়ি ফিরেছি। তিন দিন ধরে রাস্তায় ছিলাম, আমাদের কোন রাজ্য থেকে খাবার বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোনও কিছুই করেনি। বাড়ি ফিরে নিজেরাই ১৪ দিন গ্রামের ক্লাবে কোয়রান্টিনে ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আর কুড়ি বছর ধরে যেখানে ছিলাম সেই মুম্বইয়ে আর ফিরব না। কিন্তু আবার এটাও মনে হচ্ছে, সেখানে ফিরে না গেলে এখানেই বা করব কী!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement