চার দিকে চাপা গুঞ্জন। —‘না না, আমাদের ছেলেটা এ কাজ করতেই পারে না। ওদের জন্য ফেঁসে গেল’। এ বার ও পাশ থেকেও ভেসে এল প্রায় একই দাবি, — ‘কাগজে যত সব ভুলভাল লেখা। ওই ছেলেগুলো এ রকম করতে পারে, কিন্তু আমার ছেলেকে আমি চিনি।’
ঘটনাস্থল কৃষ্ণনগরের নগেন্দ্রনগরে জুভেনাইল আদালত। সোমবার এই আদালতেই তোলা হয় কালীগঞ্জের দেবগ্রাম থেকে ধৃত ৬ পড়ুয়াকে। অভিযোগ, ‘বস’ ছবির অনুকরণে মাফিয়া গ্যাং বানিয়ে লোকজনকে খুন, অপহরণের ভয় দেখিয়ে তোলা আদায়ের চেষ্টা করত তারা। সে জন্য ছবির গল্পের মতোই তারা খুলে বসেছিল ‘সুরিয়া এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট’ কোম্পানি। এ দিকে একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে দেবগ্রাম তদন্ত কেন্দ্রে। বেশ কয়েক দিনের চেষ্টায় অবশেষে শনিবার তাদের বমাল গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ দিন সময়ের আগেই আদালতে পৌঁছে গিয়েছিলেন পরিবারের লোকজন। নিতান্তই ভেঙে পড়া চেহারা। শূন্যদৃষ্টি, চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট। তারই মধ্যে শোনা গেল অভিভাবকদের হা-হুতাশ— ‘আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। ...না না, আমার ছেলে এ কাজ...’। এ-ও বলতে শোনা গেল কাউকে কাউকে, ‘বন্ধুরা করেছে, আর তার দায় চাপছে আমার ছেলের ঘাড়ে’।
মা-বাবাদের একে অন্যের ছেলের উপর দোষ চাপাতে দেখা গেলেও, ‘সুরিয়া এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট’ কোম্পানির ছয় সদস্যের কথাবার্তায় মনে হয়নি তাদের বন্ধুত্বে কোনও ফাটল ধরেছে। বরং আদালত বসার আগে পাশেই একটি ঘরে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে দেখা যায় তাদের। চোখেমুখে অপরাধবোধের লেশমাত্র চোখে পড়েনি। দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ আদালতে তোলা হয় সূর্য, ড্যানি, হিরা, ব্ল্যাক, কেকে ও দীপকে। বিচারপর্বের শুরুতেই ওই ছয় পড়ুয়ার মা-বাবা হাতজোড় করে আদালতে বলেন, ‘‘ছেলেরা ভুল করে ফেলেছে। ওদের শুধরানোর একটা সুযোগ দিন।’’
বিচারক অবশ্য নীরবেই এড়িয়ে যান এ প্রসঙ্গ। বরং বিচার শেষে জুভেনাইল আদালত তাঁদের হোমে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। মুখ ভার হয়ে যায় অভিভাবক থেকে শুরু করে ধৃত ছাত্রদের। সে সময় সূর্য ও ব্ল্যাককে দেখা যায় চোখের জল মুছতে। পরে ড্যানির আইনজীবী মহম্মদ মোক্তারও বলেন, “নেহাতই সিনেমা দেখে খেলার ছলে ওরা ভুল করে এ সব কাজ করে ফেলেছে। ওরা পড়াশুনায় খুব ভাল। ওদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে জামিনের আবেদন করেছিলাম। কিন্তু বিচারক ওদের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হোমে রাখার নির্দেশ দিলেন।”
সরকার পক্ষের আইনজীবী অরুনকুমার পাইক অবশ্য স্পষ্টই বলেন, “বাবা-মা ছেলেদের প্রতি ঠিক মতো নজর দেননি বলেই সন্তানরা বিপথগামী হয়েছে। তাই সব দিক দেখে বিচারক ওই নির্দেশ দিয়েছেন। থানা থেকে রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে। ৫ তারিখ ওদের ফের আদালতে তোলা হবে।”