জমেছে জঞ্জাল। —ফাইল চিত্র।
নিয়মিত কর আদায়ে ছেদ পড়েনি। কিন্তু পরিষেবা প্রদানে হাত উপুড় করেছে পুরসভা। লালবাগে পর্যটন কেন্দ্রে পরিষেবা নিয়ে এমনই অভিযোগ মুর্শিদাবাদা পুরসভার বিরুদ্ধে।
ইউনেসকোর তৈরি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ ও ‘প্রকৃতিতীর্থ’, সপরিবার নবাব আলিবর্দি, নবাব সিরাজ, নবাব মির্জাফরের সমাধিস্থল ও কাটরা মসজিদ। ঐতিহাসিক ওই নিদর্শন দেখতে সারা বছরই দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পর্যটক ভিড় করেন। কিন্তু সেই বিপুল সংখ্যক পর্যটদের স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে কোনও খেয়াল নেই পুরসভার। তেমনিই অভিযোগ তুলেছে নানা মহল। পুরসভা অবশ্য পাল্টা দায় চাপিয়েছে আইন মন্ত্রকের দখলে থাকা মুর্শিদাবাদ এস্টেট ও রাজ্য পর্যটন দফতরের ঘাড়ে। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ ও মিউজিয়াম দেখতে ১৫ বছরে কম বয়সিদের টিকিট কাটতে হয় না। তাতেও বছরে প্রায় ৯ লক্ষ টিকিট বিক্রি হয়। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ ও মিউজিয়াম সূত্রের হিসাব অনুসারে টিকিট ও বিনা টিকিট মিলে বছরে মোট পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ। তার মধ্যে গত জানুয়ারি মাসেই টিকিট বিক্রি হয়েছে ২ লক্ষেরও বেশি। তার মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৫০০ জন। কিন্তু পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দেয়ের দিকটা বরবরের মতো অবহেলিত থেকে গিয়েছে। শৌচালায়, পানীয় জলের ব্যবস্থা ও হাজারদুয়ারির সামনের ভাগীরথীতে স্নান সেরে কাপড় পাল্টাবার কোনও ঘর নেই। সন্ধ্যায় হাজারদুয়ারি লাগোয়া ভাগীরথীর পাড় ডুবে থাকে ঘন আঁধারে। টমটম গাড়ির ঘোড়ার বিষ্ঠায় নোংরা হয়ে থাকে রাজপথ। হাজারদুয়ারি ও নিউ প্যালেসের মধ্যবর্তী পাহাড় বাগানে পিকনিক দলের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ও বর্জ্যের দূষণে নরক গুলজার দশা। পর্যটকদের গাড়ি যত্রতত্র ফেলে রাখায় বরাবরের মতো এ বারও চরম বিশৃঙ্খলা।
অথচ পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতেই পর্যটকদের বাস পিছু ২০০ টাকা ও ছোট গাড়ি পিছু ৫০ টাকা আদায় করে পুরসভা। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘মুর্শিদাবাদ পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র’ কেন্দ্রের সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য ফের ‘সিটি মুর্শিদাবাদ ব্যবসায়ী সমিতি’র সম্পাদকও। তিনি জানান, উত্তরের ইমামবাড়া থেকে দক্ষিণে দক্ষিণ-দরওয়াজা মধ্যে রয়েছে হাজারদুয়ারি, নিউ প্যালেস, সাদা মসজিদ, ঘণ্টাঘর পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় ভাগীরথী পাড়ে বেশ কয়েক বছর আগে গড়ে তোলা হয়েছিল স্নানের পর কাপড় বদলানোর জন্য ৩টি ঘর। তার মধ্যে দু’টিই এখন বেদখল। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও যুবকদের দখলে ওই দু’টি ঘর। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওই এলাকায় হাজার দুয়ারিতে পুরুষ ও মহিলা জন্য শৌচালয় রয়েছে সাকুল্যে ১২টি শৌচালয়। বিপুল সংখ্যক পর্যটকের চাপ সামাল দেওয়া বাস্তবিকই অসম্ভব। ঐতিহাসিক ওই চত্বর জুড়ে পানীয় জলের কোনও রকম বালাই নেই। স্বপনবাবু বলেন, ‘‘মতিঝিলের প্রকৃতিতীর্থে চালু হতে চলেছে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা মিলে সুবে বাংলার নবাবি আমল ও পরবর্তী ইংরেজ আমল তুলে ধরার প্রকল্প। তার ফলে আগের থেকে পর্যটক সংখ্যা বাড়লেও শৌচালয় থেকে শুরু করে পানীয় জলের মতো জরুরি পরিষেবাটুকু মেলে না।’’
কলকাতার কসবার বাসিন্দা কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ শীতে সপরিবারে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘‘পানীয় জলের অভাব না হয় মিনারেল ওয়াটারের বোতল কিনে সহজেই মেটানো যাবে। কিন্তু সুলভ শৌচালয় ও গঙ্গাস্নানের পর ভেজা পোশাক বদলানোর ঘর না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়।’’ আরও এক পর্যটক নিতাই পোদ্দার বলেন, ‘‘সন্ধ্যায় হাজারদুয়ারির সামনে গঙ্গার পাড়ে বসে আনন্দ উপভোগের উপায় নেই। সন্ধ্যা নামতে গঙ্গার পাড় যে আঁধারে ডুবে থাকে!’’
মুর্শিদাবাদের পুরপ্রধান বিপ্লব চক্রবর্তী বলেন, ‘‘ইমামবাড়া থেকে দক্ষিণ-দরওয়াজা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার মালিক ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ, রাজ্যের পর্যটন দফতর ও রাজ্যের আইন দফতরের অধীনে থাকা মুর্শিদাবাদ এস্টেট। সুলভ শৌচালয় তৈরি, পোশাক বদলের ঘর ও পানীয় জলের নলকূপের জন্য জমি চেয়ে পর্যটন দফতর ও মুর্শিদাবাদ এস্টেটের কাছে বহু বার আবেদন করেছি। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি।’’
তবে জমি পেলেই দ্রুত পর্যাপ্ত শৌচালয়, পোশাক বদলের ঘর ও পানীয় জলের নলকূপের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। পুরসভার পক্ষ থেকে ওই রকম কোনও আবেদনের কথা স্মরণ করতে পারছেন না লালবাগ মহকুমা শাসক প্রবীর চট্টোপাধ্যায় ও মুর্শিদাবাদ এস্টেট ম্যানেজার সৌরভ মণ্ডল- দু’জনেই।
সে কথা জানিয়ে তাঁরা দু’জনেই বলেন, ‘‘শৌচালয়, পোশাক বদলের ঘর ও পানীয় জলের নলকূপ বসানোর জন্য তো সামান্য একটু জায়গা লাগে। তার জন্য লিখিত আবেদনের চেয়েও বেশি জরুরি আন্তরিক উদ্যোগ। সম্ভবত সেখানেই ঘাটতি রয়েছে। নইলে এতদিনেও তা হয়নি কেন?’’ তার কোনও সদুত্তর নেই।