রেল বাজেট মানে তখন ছিল কিছু পাওয়ার আনন্দ। বাজেট পেশের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চলত জোর চর্চা। কেননা, সকলেই জানতেন, গনি খান চৌধুরী নিজের জেলা, রাজ্যকে বঞ্চিত করবেন না।
সে দিন চলে গিয়েছে বহু দিন আগে। গনি খানও নেই অনেক দিন হয়ে গেল। তাই উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। এখন মালদহ শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে জটলা থাকলেও সেখানে উঠে আসে অনেকটা হতাশা। ইংরেজবাজারের পোস্ট অফিস মোড়ে রাতে আড্ডা দেওয়া প্রবীণ স্কুল শিক্ষক উৎপল সরকার, ব্যবসায়ী মনোজ দাসরা বলেন, ‘‘বরকত সাহেব রেলমন্ত্রী থাকাকালীন অনেক কিছু পেয়েছে মালদহ। এমনকি তিনি সাংসদ থাকাকালীনও রেল বাজেটে মালদহের জন্য কিছু থাকতই। তবে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে আমাদের জেলা।’’ তাঁদের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিশ্রুতি দিলেও মালদহের কপালে কিছুই জোটোনি। তাই রেলবাজেট নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করার মতো কিছু নেই।
রেল বাজেটের আগে জেলার সাংসদ এবং ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে চিঠি পাঠান রেল মন্ত্রকের কাছে। তবে ওই পর্যন্তই থেকে যায় বলে দাবি। জেলার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক উজ্জ্বল সাহা বলেন, গনিখান চৌধুরী রেল মন্ত্রী থাকাকালীন রাজ্যের মতো এই জেলার জন্য অনেক কিছু করেছিলেন। এ ছাড়া বহু প্রকল্পে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এখন আর সে সব কিছু হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘‘আমরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে রেলমন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। তবে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না প্রাক্তন রেলমন্ত্রীর জেলাকে।’’ উত্তর মালদহের সাংসদ তথা জেলা কংগ্রেসের সভানেত্রী মৌসম নূর বলেন, ‘‘এ বারও বেশ কিছু দাবি নিয়ে আমরা রেলমন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। কংগ্রেস কেন্দ্রে থাকার সময় জেলার জন্য কিছু কাজ করতে পেরেছি। এখন কিছুই করতে পারছি না।’’
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত রেলের দু’বার মন্ত্রী হয়েছিলেন মালদহের সাংসদ আবু বরকত আতাউর গনিখান চৌধুরী। কলকাতায় মেট্রো চালু করার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভুমিকা ছিল। জেলার যাত্রীদের সুবিধের জন্য গৌড় এক্সপ্রেস চালু করেছিলেন তিনি। সেই সময় কলকাতা যাওয়ার দিনের কোন ট্রেন ছিল না। যাত্রীদের সুবিধার্থে তিনি চালু করেছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। এ ছাড়া মালদহ-আদিনা প্যাসেঞ্জার ট্রেন চালু করেছিলেন। নতুন ট্রেনের পাশাপাশি গনিখান রেলমন্ত্রী থাকার সময় মালদহে রেলের ডিভিশন অফিস খোলা হয়েছে। ফলে মালদহ সহ মুর্শিদাবাদের কাজও এই ডিভিশনে হয়। শুধু তাই নয় মালদহ গড়েছিলেন ডিজেল শেড। যার জন্য হাজার খানেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে। একই সঙ্গে রেলের ইন্ডোর ও আউটডোর স্টেডিয়াম গড়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে রেলওয়ে নার্সিং ট্রেনিং স্কুলও খোলা হয়েছিল। একই সঙ্গে রেলওয়ে হাসপাতালের আধুনিকীকরণেও নয়া উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী গনিখান চৌধুরী। মালদহে কোচ তৈরির কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগও হয়েছিল। শিলান্যাসও হয়ে গিয়েছিল। রেল যাত্রীদের সুবিধার জন্য একটি রেলওয়ে পার্ক গড়ে তুলেছেন প্রয়াত গনিখান চৌধুরী।
রেলমন্ত্রী না থাকলেও সাংসদ থাকাকালীনও বহু প্রকল্পে উদ্যোগী নিয়েছিলেন তিনি। ফরাক্কা এক্সপ্রেস, মালদহ-হাওড়া ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে তাঁর। তাঁর তৎপরতায় গাজলের একলাখি-বালুরঘাট লাইন চালু হয়েছে। এরপর থেকে মালদহের ভাগে তেমন কিছু জুটেনি বলে অভিযোগ।
তবে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মালদহের জন্য একাধিক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রেলের মিউজিয়াম তৈরি করা হবে মালদহে। এ ছাড়া প্রাক্তন রেলমন্ত্রীর অসমাপ্ত কাজ যেমন গাজল-ইটাহার, গাজল-গুঞ্জরিয়ায় নতুন লাইন করা হবে। এ বারের বাজাটে জেলাবাসী একাধিক দাবি জানিয়েছেন। মালদহ থেকে দুপুরের পর থেকে কলকাতা যাওয়ার কোনও ট্রেন নেই। কমপক্ষে বিকালের দিকে একটি ট্রেন চালানোর দাবি তুলেছেন। রাজধানী এক্সপ্রেস মালদহ দিয়ে চালানোর দাবি রয়েছে। এ ছাড়া গৌড় এক্সপ্রেসে কোচ বাড়ানো এবং গৌড় এক্সপ্রেসের বালুরঘাট লিঙ্ককে পৃথক এক্সপ্রেস চালুর দাবি উঠেছে। দার্জিলিং মেল এবং শতাব্দী এক্সপ্রেসে মালদহ থেকে সংরক্ষিত আসন বাড়ানো সহ মালদহ টাউন স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি উঠেছে। টাউন স্টেশন প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধি সহ আধুনিক সিঁড়ি, লিফটের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ফুট ওভারব্রিজ, রেলওয়ে হাসপাতালের আধুনিকীকরণ এবং পুনরায় রেল পার্ক চালু করার দাবি উঠেছে। রেলওয়ের মালদহের যাত্রী সুরক্ষা কমিটির সদস্য নরেন্দ্র নাথ তিওয়ারি বলেন, ‘‘রেল বাজেটের সময় সাধারণ মানুষকে রেডিওতে কান পেতে থাকতে দেখেছি অতীতে। এখন উৎসব ছিল মালদহবাসীর কাছে। এখন এই জেলার রেল নিয়ে কেউ কিছু ভাবছে না। মালদহকে মডেল স্টেশন ঘোষণা করা হলেও পরিষেবা মিলছে না।’’ রাজ্যের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী বলেন, ‘‘বরকত সাহেবের পর মালদহের রেল নিয়ে ভেবেছিলেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন।’’
এ বারে রেল বাজেটে মালদহ কিছু পাবে না বিগত বছর গুলির মতো বঞ্চিত থাকবে, তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন জেলাবাসী।