চলছে পুজোর প্রস্তুতি। —নিজস্ব চিত্র।
রেল আধিকারিক ইংরেজ সাহেব, মালগাড়ির রেক, টয়ট্রেন, বিজয়ার নাটক। এমনই নানা স্মৃতির টুকরো এখনও বহন করে চলেছে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন দুর্গাপুজো কমিটির মণ্ডপ। রেলের নথি থেকে জানা যায় ১৯১৭ সালে এই পুজোর শুরু। সেই হিসেবে এটাই শিলিগুড়ি শহরের প্রথম সর্বজনীন পুজো বলে দাবি। সেই হিসেব মেনেই এই পুজোর বয়স ৯৮। শতবর্ষের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছলেও পুরোনো জৌলুস হারিয়েছে টাউন স্টেশনের পুজো। আগের সেই ভিড়ও দেখা যায় না মণ্ডপে।
প্রায় তিন দশক হল দশমীর পর দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক বন্ধ। মালগাড়ির রেকে চাপিয়ে প্রতিমা বিসর্জনও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বহুদিন। রেলওয়ে ইন্সটিটিউশনের শীতলা মন্দিরের মাঠে একটি অতি সাধারণ মণ্ডপ, আর কয়েকটি আলোর মালাতেই শেষ হয়ে যায় পুজোর আয়োজন।
শীতলা মন্দিরের মাঠে মণ্ডপ তৈরির বাঁশ বাধা হয়েছে। বাঁশে টাঙানো রয়েছে একটি ব্যানার। শিলিগুড়ি শহরের প্রথম পুজো হিসেবে সেই ব্যানারে গর্বিত ঘোষণা রয়েছে। ৯৮ বছরের পা দেওয়ার ঐতিহ্যও জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে মণ্ডপের মাঠে দাঁড়িয়ে বারবার অতীতে ফিরে যাচ্ছিলেন কমিটির কোষাধ্যক্ষ চিন্ময় ঘোষ।
তাঁর বাবা রেলের কর্মী ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি দীর্ধদিন ধরে পুজোর সঙ্গে যুক্ত। তিনি শুনেছেন, একসময়ে হাসমিচকে রেলের সিটি বুকিং অফিসের পাশে পুজো হতো। সে সময় সেখান দিয়ে টয়ট্রেনের লাইন যেত। একটি ছোট স্টেশনও ছিল সেখানে। রেলের আধিকারিক ইংরেজ সাহেবরা সরাসরি পুজোর সঙ্গে যুক্ত হতেন। পুজোর ব্যয় বহন করত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তখন টয়ট্রেনে চাপিয়ে প্রতিমার বিসর্জন যাত্রা হতো বলে বড়দের থেকে শুনেছেন তিনি। বহুদিন আগেই পুজো সরে এসেছে লাগোয়া রেলেওয়ে ইন্সটিটিউট কলোনিতে। চিন্ময়বাবু জানালেন, ছোটবেলায় দেখেছেন মালগাড়ির রেকে চাপিয়ে দেবী প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাড়িতে পুজোর আগে থেকে নাটকের মহড়া হতেও দেখেছেন। তিনি নিজেও নাটকে অভিনয় করেছেন।
সেই সব এখন শুধুই স্মৃতি। বাস্তবে অবশ্য পুজোর আয়োজন নিয়েই চিন্তা কর্মকর্তাদের। মণ্ডপ তৈরির জন্য করচ হবে প্রায় ১৭ হাজার। তৃতীয়ার আগে চার হাজার টাকার বেশি দিতে পারেননি ডেকোরেটরের হাতে। তার জন্য মণ্ডপে কাপড় বাঁধা হয়নি। চিন্ময়বাবু জানালেন, ‘‘আগামীকালের মধ্যে চাঁদা তুলে ডেকোরেটরকে টাকা দিতে হবে। নয়ত মণ্ডপের কাজ শেষ হবে না।’’ তবে ঐতিহ্য পুরোপুরি হারাতে দেননি বর্তমান উদ্যোক্তারা। এখনও অষ্টমীর দিন খিচুড়ি প্রসাদ বিলি হয়। উদ্যোক্তার জানালেন, যতটা সম্ভব জোগার করে আয়োজন করা হয়।
একসময়ে রেলওয়ে কলোনিতে অন্তত দেড়শো আবাসন ছিল। এখন সেই আবাসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ এ। এর মধ্যে অনেক আবাসনেই কর্মীরা থাকেন না। পুজোর কমিটির সক্রিয় সদস্য সংখ্যাও তলানিতে ঠেকেছে। পুজোর পৃষ্ঠপোষকতাও এখন আর রেল করে না বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। চিন্ময়বাবুর কথায়, ‘‘অর্থবল আর নেই, লোকবলও নেই। আমাদের মতো কয়েকজন যাঁরা ছোটবেলা থেকে এই পুজো দেখে বড় হয়েছি, তারাই কোনওমতে জোগাড় করে পুজো করে যাচ্ছি। দু’বছর বাদেই পুজোর একশো বছর। কষ্ট করে হলেও আরও দুই বছর পুজো করব।’’
শতবর্ষের দোড়গোরায় চলে আসা এই পুজো-র জৌলুস, আভিজাত্য আপাতত স্মৃতিতেই থমকে রয়েছে।