মৃত আব্দুর রশিদ শেখ।
ছুটে এসে বাড়ির উঠোনে লুটিয়ে পড়ল বছর তেরোর ছেলে। বুকের ডান দিকটা রক্তে লাল। ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত সেখানে। এক বার শুধু বলল, ‘‘আমাকে শেষ করে দিল!’’ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তারেরা জানিয়ে দিলেন, আব্দুর রশিদ শেখ আর বেঁচে নেই।
মালদহের কালিয়াচক থানার বামনটোলা গ্রামে মঙ্গলবার রাতের ওই ঘটনা এখনও এলাকার লোকের মুখে-মুখে ফিরছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে দু’বছর আগে খুন হন পঞ্চম শ্রেণির ওই ছাত্রের বাবা মহম্মদ নুরশেদ আলি। সেই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সালাম শেখ মাস সাতেক আগে জামিন পেয়েছে। জামিন পেয়েই সে আব্দুরের পরিবারকে খুনের মামলা প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিচ্ছিল বলে অভিযোগ। পরিবারটি রাজি হয়নি। ওই ঘটনার সঙ্গে আব্দুর খুনের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কারণ, খুনের পর থেকেই সালাম এলাকাছাড়া।
পুলিশ সূত্রের খবর, ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই পড়শি সালাম শেখের সঙ্গে এক ব্যক্তির বচসায় মধ্যস্থতা করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন আব্দুরের বাবা পেশায় ভ্যানচালক মহম্মদ নুরশেদ আলি। ঝগড়া থামাতে তিনি সালামকে চড়-থাপ্পড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ। তখনকারমতো ঝামেলা মিটে গেলেও ওই রাতেই বাড়ির উঠোনে ঘুমন্ত নুরশেদ আলিকে ভোজালি দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সালামকে ধরে। আব্দুরের মামা সেতাউর রহমানের দাবি, ‘‘জামিন পাওয়ার পরে, মাস তিনেক আগে সালাম আমাদের জামাইবাবুর খুনের মামলাটি তুলে নিতে বলে। মামলা না তুললে পরিবারের ক্ষতি হবে বলে ভয় দেখায়। কিন্তু আমরা রাজি হইনি।’’
স্বামী খুন হওয়ার পর থেকে বিড়ি বেঁধে সংসার চালান আব্দুরের মা ফিরদৌসি বেওয়া। তাঁর আর এক ভরসা বিঘেখানেক চাষের জমি। দুই ছেলের মধ্যে আব্দুর ছোট। বড় হাবিবর রহমান পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। দুই ভাই-ই গোলাপগঞ্জের জি.বি.এস হাই মাদ্রাসার ছাত্র। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুই ভাই গিয়েছিল নিজেদের জমিতে বোনা পাটের খেতে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ শৌচকর্ম সারতে বাড়ির পিছনের বাঁশঝাড়ের উদ্দেশে গিয়েছিল আব্দুর।
ফিরদৌসি বেওয়া বলেন, ‘‘হঠাৎ তিরের মতো ছুটে এসে উঠোনে এলিয়ে পড়ল ছেলেটা। বুক থেকে রক্ত ঝরছে! কোনও মতে বলল, ‘আমাকে শেষ করে দিল’! আর শরীরটায় সাড় নেই। ওকে যারা আমার কাছ থেকে কাড়ল, তারা যেন উচিত শাস্তি পায়।’’
এলাকার বাসিন্দা তথা সাহাবাজপুর পঞ্চায়েতের কংগ্রেস সদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘বাবা খুন হওয়ার বছর দু’য়েকের মধ্যেই খুন হল এই বাচ্চা ছেলেটা। ব্যাপারটা সন্দেহজনক। পুলিশ যেন দ্রুত দোষীদের ধরে।’’ মালদহের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘খুনের কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। সব রকম সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’ পুলিশ জানিয়েছে, সালামের খোঁজ চলছে।
—নিজস্ব চিত্র।