বৃষ্টিতে ক্ষতি চাষের, সব্জির দাম বাড়ছে

দাবদাহের পরে এক টানা বৃষ্টিতে মাথায় হাত পড়েছে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার সব্জি চাষিদের। খেতে জল দাঁড়িয়ে পচন শুরু হয়েছে গাছে। উৎপাদন কমছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে দুর্যোগে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ অগস্ট ২০১৫ ০২:৩১
Share:

দাবদাহের পরে এক টানা বৃষ্টিতে মাথায় হাত পড়েছে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার সব্জি চাষিদের। খেতে জল দাঁড়িয়ে পচন শুরু হয়েছে গাছে। উৎপাদন কমছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে দুর্যোগে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের দুজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা কৃষি অধিকর্তা প্রণবজ্যোতি পন্ডিত বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত ফসলের ক্ষতির খবর নেই। হিলি, কুমারগঞ্জ সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সব্জির খেত ডুবে গিয়েছে দেখা যায়নি। তবে এরকম দুর্যোগ আরও তিন দিন ধরে চললে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’ বাজারে সব্জির দাম ক্রমশ বাড়ছে। হেঁসেল সামলাতে দিনমজুর থেকে মধ্যবিত্ত প্রত্যেকের জেরবার দশা।

Advertisement

কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, জুলাই মাসে জলপাইগুড়িতে গড় বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক পরিমাণ ৭৭৬ মিলিমিটার হলেও এ বার হয়েছে ৪১৬ মিলিমিটার। কৃষি আধিকারিকরা জানান, ৩৬০ মিলিমিটার বৃষ্টির ঘাটতি এবং প্রখর রোদের কারণে ওই মাসে মাটি শুকিয়ে গ্রীষ্মকালীন ফসলের গাছের পাতা ঝলসে গিয়েছে। সেই ধাক্কা সামলে না-উঠতে শুরু হয় একটানা বৃষ্টিপাত। অগস্ট মাসের ২১ তারিখের মধ্যে ৪৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন সব্জি চাষিরা। নিচু ও মাঝারি খেত জলে ডুবেছে। বেশ কিছু উঁচু খেতেও জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় গাছের পচন দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি দফতরের উপ অধিকর্তা সুজিত পাল বলেন, “জলের প্রয়োজন থাকলেও জুলাই মাসে বৃষ্টি ছিল না। গরমে মাটি শুকিয়েছে। কিন্তু অগস্ট মাসে উল্টো ছবি। একটানা বৃষ্টিপাতের ফলে সবজি চাষিরা বিপাকে পড়েছে। খেতে জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় গাছ নষ্ট হচ্ছে।”

কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, জলপাইগুড়ি জেলায় এ বার প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সব্জি চাষ হয়েছে। জল দাঁড়িয়ে কত পরিমাণ জমির সব্জি নষ্ট হয়েছে সেই হিসেব কৃষি আধিকারিকরা এখনও করে উঠতে পারেননি। তাঁদের আশঙ্কা, কয়েকদিন টানা রোদ না হলে চাষিদের সমস্যা বাড়বে। জলপাইগুড়ির সহকারী কৃষি অধিকর্তা হরিশ্চন্দ্র রায় জানান, অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে পটল, লঙ্কা, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে, শসা, টম্যাটো, বেগুন চাষিরা। পাতকাটা এলাকায় ১০ হেক্টর এবং চাঁপাডাঙা, বর্মণপাড়া এলাকায় প্রায় ২০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন ফসলের খেত তিস্তা নদীর জলে তলিয়েছে বলে দাবি। ময়নাগুড়ির পানবাড়ি এলাকার চাষি কেশব রায় বলেন, “নিচু জমি তো বটেই। এখন মাঝারি জমির সব্জি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। যে সমস্ত গাছ টিকে আছে, তাতেও ফলন কমেছে।” ময়নাগুড়ি ব্লক কৃষি আধিকারিক সঞ্জীব দাস জানান, একটানা বৃষ্টিপাতের জন্য খেত থেকে জল বাইরে বার করার কোনও ব্যবস্থা চাষিরা করে উঠতে পারছে না। ওই কারণে জটিলতা বেড়েছে।

Advertisement

এদিকে বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাতে শুরু করেছে সব্জি বাজার। বাইরে তাপমাত্রা কমলেও আনাজ ছুঁয়ে দেখতে হাত পুড়ছে খদ্দেরের। বাজার চক্কর কেটেও পছন্দ মতো সব্জি কিনে থলেতে তুলে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জলপাইগুড়ি শহরের দিনবাজার, স্টেশন বাজার, বৌ বাজার থেকে ময়নাগুড়ি পুরাতন বাজার একই ছবি। আজ যে আনাজের দাম ১৫ টাকা কেজি দুদিন পরে সেটাই কিনতে হচ্ছে ৪০ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগেও ঢ্যাঁড়শ ২০ টাকা, ঝিঙে ৩০ টাকা, শসা ২০ টাকা, লঙ্কা ৩০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হয়েছে। শুক্রবার লঙ্কার দাম বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা কেজি। ঢ্যাঁড়শ ৪০ টাকা, ঝিঙে ৬০ টাকা, পটল ৪০ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে।

কেন এভাবে লাফিয়ে দাম বাড়ছে? দিনবাজারের সব্জি বিক্রেতা স্বদেশ বসাক বলেন, “গ্রামে সব্জি মিলছে না। যতটুকু পাচ্ছি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ওই কারণে শহরের খুচরা বাজারে সব্জির দাম বাড়ছে।” ময়নাগুড়ি পুরাতন বাজারের সব্জি বিক্রেতা পরিমল রায় জানান, শুক্রবার পাইকারি বাজারে ৭৫ টাকা কেজি লঙ্কা বিক্রি হয়েছে। সব্জির যোগান নেই। যতটুকু মিলছে সেটা নিয়েই কাড়াকাড়ি। যে দামে পাচ্ছে কিনে বাজারে বিক্রি চলছে।

Advertisement

দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন, হরিরামপুর, বংশীহারি, কুমারগঞ্জ এলাকায় বহু মাটির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার গঙ্গারামপুরের শুকদেবপুর এলাকায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বারান্দার টিনের শেডে পড়েছিল। তাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে বাবা ও ছেলের। পুলিশ জানিয়েছে, ঘুম থেকে উঠে বারান্দার শেডে হাত দিয়েই সুশান্ত বিশ্বাস (৪৬)নামে ওই গৃহকর্তা বিদ্যুতস্পৃষ্ট হন। বাবাকে বাঁচাতে এসে ছেলে সঞ্জীবও (২৫) বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন। বাসিন্দারা তাঁদের উদ্ধার করে গঙ্গারামপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা দুজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

এ দিকে বৃষ্টির জেরে তরিতরকারির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে। সব্জি বিক্রেতাদের দাবি, বৃষ্টিতে সব্জি পচে যাচ্ছে। ফলে আমদানি কমেছে। বালুরঘাটে পটল, ঝিঙে, কুমড়ো থেকে সমস্ত সব্জি প্রতি কেজি ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় উঠে গিয়েছে। কাঁচালঙ্কা কেজি প্রতি ৮০ টাকা। পেঁয়াজ প্রতি কেজির দাম হয়েছে ৬০ টাকা। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাছের দাম। বালুরঘাটের বাজারে সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো গ্রাম ওজনের রুই ও কাতলা প্রতিকেজির দাম ২০০ টাকা। রাইখর থেকে ট্যাংরা যে কোনও ছোট মাছের দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজিতে উঠে গিয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement