খোশবাসপুর গ্রাম থেকে প্রায় এক মাইল পায়ে হেঁটে গোকর্ণে পৌঁছে যাওয়া। মোতিচুরের লাড্ডুর সে এক অমোঘ টান। ধার-বাকিতে সারা মাস কেনাকাটা চলত। নেমতন্ন কার্ড হাতে ওই দিন বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে মিষ্টির প্যাকেট ও ক্যালেন্ডার নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে আসা। বাড়ি ফেরার পথে কর্ণসুবর্ণ-কান্দি রাজ্য সড়ক থেকে নেমে গিয়ে সাধারণের চোখের আড়াল খুঁজে নিয়ে জমির আলপথের উপরে বসে ওই মিষ্টির প্যাকেট খুলে মোতিচুরের লাড্ডু চুরি করে খাওয়া। তার পর প্যাকেটের মুখ ফের বন্ধ করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া।
—প্যাকেটটা কি খুলেছিলি?
—না তো!
—তাহলে এ বছর কি কোনও দোকানেই মোতিচুরের লাড্ডু করেনি?
—আমি তো ঠিক জানি না। টাকা জমা করেছি। তার পর প্যাকেট ও ক্যালেন্ডার দিয়েছে। আমি নিয়ে চলে এসেছি। আর কিছু জানি না।
অনেক পরে ওই রাতে গপ্পের ছলে ঠাকুমা ও সেজ জেঠিমার কাছে মা জানতে পারে আসল তথ্য। ধরা পড়ে যাই আমি। তাতে মা বেশ মজা পায়। অফিস থেকে বাবা ফিরে এলে ‘ছেলের কাণ্ড দেখেছ’ বলে মা হাসতে হাসতে লাড্ডু-কাহিনি তুলে ধরে। তাই নিয়ে বাবা-মা দুজনের তুমুল হাসি। ঘরের মেঝে ফুঁড়ে ঢুকে যাওয়ার মতো অবস্থা তখন আমার। দমবন্ধ করা অস্বস্তিকর ওই পরিস্থিতি অবশ্য জীবনে ওই একবার!
কিন্তু এখন পরিণত বয়সে এসে মনে পড়ে শুধুই মোতিচুরের লাড্ডুর টানে নয়, প্রায় ছ’ফুট উচ্চতার মুদি ব্যবসায়ী হলধর জেঠু অক্ষয় তৃতীয়ার দিন এলেই কেমন পাল্টে যেতেন। সেটাও দেখার কৌতূহল ছিল মনের মধ্যে। সারা বছর খালি গা এবং এক টুকরো ধুতি পরনে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম আমার মতোই কান্দি মহকুমার গোকর্ণ-চাটরা-খোশবাসপুর গ্রামের বাসিন্দারা। পুরো নাম হলধরচন্দ্র ধর।
ওই হলধর জেঠু কিন্তু অক্ষয় তৃতীয়ার সকালে স্নান সেরে কপালে চন্দনের বড় টিপ পরে দোকানে আসতেন। পরনে সাদা ধবধবে ধুতি ও পাঞ্জাবি। গোটা দোকান ঘর ভরে থাকত ধূপের ধোঁয়ায়। নিম-বেলপাতায় সেজে উঠত দোকান। দোকানে ঢোকার মুখে মেঝেতে থাকত সাদা খড়িমাটি দিযে আঁকা আলপনা। খরিদ্দারের ভিড় দোকান ছাড়িয়ে রাস্তায় থিকথিক করত। সকলের হাতে ধরা অক্ষয় তৃতীয়ার দিন দোকানে হাজির থাকার ছাড়পত্র—লাল খামে ভরা নেমতন্ন কার্ড! খিটখিটে মেজাজের মানুষটিও ওই দিন কেমন বদলে যেতেন।
তাই অক্ষয় তৃতীয়া এলেই খুব করে মনে পড়ে যায় আমার ফেলে আসা শৈশবের কথা। হারিয়ে যাওয়া আমার গ্রাম জীবনের কথা। সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ব্যবহার করা শব্দ ধার করেই বলতে ইচ্ছে করছে—‘নস্তস’। গ্রিক শব্দ ‘নস্তস’ মানে বাড়ি ফেরা, যা থেকে ইংরেজি ‘নস্টালজিয়া’। আমার ‘নস্তস’ অক্ষয় তৃতীয়া। বৈশাখ মাস মানেই নিমফুলের গন্ধ। আমাদের বাড়িটা ছিল গ্রামের পূর্ব প্রান্তে মাঠের ধারে। যার গা-ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে দ্বারকা নদী। আমাদের ওই গ্রামের তল্লাটে বৈশাখ মাসকে ঘিরে গ্রামীণ এক মিথলজি আছে, যা যৌথ অবচেতনায় মুদ্রিত এবং নিমফুলের মউ মউ করা সৌরভে আবিষ্ট। সে এক যুথবদ্ধ ‘নস্তস’। যে-যেখানে আছো, বাড়ি ফিরে চলো। কেন না অক্ষয় তৃতীয়াকে ঘিরে ঘরে-ঘরে লালচিঠির আমন্ত্রণ পৌঁছে গিয়েছে।
হালখাতার লালচিঠি। হিন্দু-মুসলিম সবাই এই ‘মেইনস্ট্রিম’-এ যুথবদ্ধ এবং এটাই ছিল বছরের উল্লেখযোগ্য প্রকৃত ‘মেইনস্ট্রিম’। এতে নিমফুলের গন্ধ আছে। পাড়ার নসরত শেখ তাঁর মুদির দোকান সাজাতেন বাঁশের খুঁটিতে নিমশাখা বেঁধে। কেন না তাঁর বাড়ির পিছনেই ছিল সুলভ নিমবন। লাল কার্ডে ছাপানো আমন্ত্রণপত্রের তলায় কোণের দিকে কানে-কানে বলার মতো সলজ্জ একটি কথা লেখা থাকত—‘খাতায় এত টাকা বাকি আছে।’
কিন্তু সেটাই সব নয়। বাকি থাকা টাকার কিছুটা দিলেও মিলত এক প্যাকেট মিষ্টি। আর সেই প্যাকেটের মধ্যে থাকা লাড্ডুর রঙ ও স্বাদ এখনও চোখে-মুখে লেগে রয়েছে আমার। পরে কলকাতায় এক্সাইড মোড়ে এক নামী দোকান থেকে লাড্ডু কিনে খেয়ে দেখেছি, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি ছেলেবেলায় অক্ষয় তৃতীয়ার প্যাকেটবন্দি লাড্ডুর সেই স্বাদ।
ছেলেবেলায় লোভাতুর চোখে তাকিয়ে দেখতাম মাঠের আলপথগুলিতে মানুষজনের মিছিল। সকাল থেকেই শুরু হত উৎসবের ওই মিছিল। কখনও কখনও বিপদ আড় পেতে দাঁড়িয়ে থাকত। এমনও হয়েছে বিকেলে সেজেগুজে পাশের গাঁয়ে হালখাতায় যাব বলে তৈরি। হঠাৎ কালবৈশাখী। মনে মনে বলতাম—‘বজ্জাতটা আসবার আর সময় পেল না’। কিন্তু তাতে কী? সন্ধ্যায় টিপটিপ করতে করতে বৃষ্টিটাও থেমে গেল। দূরে-কাছে হ্যারিকেনের আলো, কেউ কেউ টর্চ জ্বেলে আলপথ পেরিয়ে যাচ্ছেন। আমি পিছন থেকে ছুঁয়ে আছি ওই মানুষদের। মাঝে-মাঝে অন্ধকার শান্ত ভিজে মাঠে হালখাতা করে ফেরা মানুষজন পিছিয়ে পড়া বা হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীদের ডাকছে—কুথায় গেলি তুরাহহহহ...।
সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ব্যবসায়ীরা যে হালখাতা করেন তার মূল ব্যাপারটা হলো যাঁদের কাছে টাকা পাওনা আছে তাঁদের নেমতন্ন করে ডেকে এনে পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টা। আগে মানুষের হাতে এত টাকা ছিল না। অধিকাংশ মানুষই ধার-বাকিতে সারা মাস জিনিসপত্র কিনতেন। মাসের শেষে শোধ করতেন। যেটা বাকি থাকত সেটা হালখাতা-র আগে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হত। খরিদ্দাররা যাঁর যেমন টাকা দিয়ে সরবত, মিষ্টি খেয়ে চলে আসতেন। আসলে সকলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার একটা কৌশল। এটা ব্যবসায়ীদের জনসংযোগের বিষয় ছাড়া কিছু নয়।
তাই প্রতি বছর আড়ম্বরের সঙ্গে অক্ষয় তৃতীয়া পালন করেন বহরমপুরের ইনভার্টার ও ব্যাটারি ব্যবসায়ী সৈয়দ সৌরভ (টিপু)। তাঁর কাছে অক্ষয় তৃতীয়া কোন বার্তা বয়ে নিয়ে আসে? টিপুর উত্তর, ‘‘এমন অনেক খরিদ্দার আছে, যাঁরা দিনের পর দিন বকেয়া টাকা দেওয়ার নাম করছে না। ওই নামের তালিকা তৈরি করে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন নেমতন্ন করে ডেকে আনা এবং চক্ষুলজ্জার খাতিরে পুরোটা না দিলেও কিছু টাকা তো মিটিয়ে দিয়ে যান। এটাই আমার কাছে অনেক।’’ তাই প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিন নানা রকমের ফুল দিয়ে সেজে ওঠে তাঁর শো-রুম।
তবে এখন আমরা শপিং মলে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। বাজার করা থেকে মুদিখানার সামগ্রী, স্টেশনারি-গয়না-জুতো-ঘড়ি-পোশাক। আমাদের পকেটে থাকে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে পাওয়া হরেক রকমের ক্রেডিট কার্ড। কিন্তু সেখানে আবার মাস পয়লা অন-লাইনে টাকা জমা করতে হয়। সেখানে ধার-বাকি রাখার কোনও জায়গা নেই, তেমনি হালখাতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার জো নেই।
ফলে ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের সৌজন্যে আমরা ধার-বাকি তো দূরঅস্ত, জিনিসের দরদাম করতেও ভুলে গিয়েছি। বার-কোড দেওয়া জিনিসের গায়ে লেখা থাকে ‘প্রাইস ট্যাগ’। আড়চোখে ওই ট্যাগ উল্টে দেখে নেওয়া এবং বাজেটের বাইরে হলে নেড়েচেড়ে ‘পছন্দ নয়’ বলে বেরিয়ে যাওয়া। ফলে হালখাতার যে মূল লক্ষ্য পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টা, সেটা কিন্তু কোথাও কমে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরাও এখন সতর্ক হয়ে গিয়েছেন। বেচাকেনায় ধার-বাকি এবং মাসকাবারি রীতি প্রায় উঠেই গিয়েছে। বিশ্বাস বস্তুটিও তো লুপ্তপ্রায়! সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ লিখেছেন—‘তবু হালখাতার জন্যই বৈশাখের এখনও ঠাট বজায় আছে। ওটা সম্প্রীতির সম্পর্ক-সেতু। সেই যুথ-অবচেতনা তার মিথলজি নিয়ে এখনও শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে। গ্রামবাংলার মানুষের জীবনযাপনে এখনও বাংলা মাসগুলি চালু রয়েছে। তা নিমবন না-ই থাক, কি নিমফুলের গন্ধ না-ই ভেসে আসুক উত্তাল হাওয়ায়। কলকাতায় বসে প্রকাশকদের কার্ড পেয়ে তাকিয়ে থাকি। তার পর সহসা অবচেতনা থেকে ভেসে আসে নিমফুলের গন্ধ। আমার ব্যক্তিগত মিথলজির বিবর্ণ পাতা উচ্চারিত হয় নস্তস।’