হেলমেট পরাতে চিঠির দাওয়াই

ভরদুপুরে বাড়িতে পিওন আসতে দেখে প্রথমটায় অবাক হয়ে গিয়েছিলেন আশাপূর্ণাদেবী। পিওনের হাতের থেকে চিঠি নিয়ে তো আরও অবাক। ঘণ্টা খানেক আগেই যে ছেলে ‘আসছি মা’ বলে অফিসে বেরিয়ে গেল, সেই চিঠি লিখে পাঠিয়েছে!

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০১:০২
Share:

বাঁকুড়ায় এটাই দস্তুর হয়ে উঠেছে।—নিজস্ব চিত্

ভরদুপুরে বাড়িতে পিওন আসতে দেখে প্রথমটায় অবাক হয়ে গিয়েছিলেন আশাপূর্ণাদেবী। পিওনের হাতের থেকে চিঠি নিয়ে তো আরও অবাক। ঘণ্টা খানেক আগেই যে ছেলে ‘আসছি মা’ বলে অফিসে বেরিয়ে গেল, সেই চিঠি লিখে পাঠিয়েছে! এমনটা কী করে হয়? খাম খুলতে অবশ্য নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। দিন দু’য়েক আগের সেই চিঠি থেকে জানা গেল, হেলমেট না পড়ে মোটরবাইক চালাতে গিয়ে শ্রীমান পুলিশকর্মীদের সামনে পড়ে গিয়েছিলেন। আর তার পরে পুলিশের সামনেই মাকে চিঠি লিখে প্রতিজ্ঞা করেছেন, এমন কাজ আর করবেন না। বাড়ির শোরগোল শেষ হল স্বস্তির নিশ্বাস দিয়ে।

Advertisement

গত কয়েক সপ্তাহে পাত্রসায়র থানা এলাকার অনেক বা়ড়িতে এমন চিঠি পৌঁছেছে। সৌজন্যে ওই থানার পুলিশ। ১৫ অগস্ট থেকে শুরু হয়েছে এই অভিনব অভিযান।

কখনও নলডাঙা, কখনও রসুলপুর, কখনও আবার জামকুড়ি— রাস্তার ধারে ওঁৎ পেতে থাকছেন পুলিশকর্মীরা। হেলমেট ছাড়া মোটরবাইক আরোহী দেখলেই হাতেনাতে ধরা হচ্ছে। একটি ছাপানো চিঠির বয়ানে নাম-ধাম লিখে, সইসাবুদ করে তবেই মিলছে নিস্তার।

Advertisement

সেই চিঠিতে লেখা থাকছে, হেলমেট না পরার দায়ে হাতেনাতে ধরা পড়ার ঘটনা। পাশাপাশি বলা হচ্ছে, আইনভঙ্গের পাশাপাশি এই ঘটনা যেমন প্রমাণিত হয় হেলমেটবিহীন সওয়ারির পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধেরও অভাব রয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলে স্বীকার করে, আর কখনও এমন কাজ করবেন না বলে জানিয়ে সেই চিঠিতে দস্তখত করতে হচ্ছে। চিঠি পোস্ট করার দায়িত্ব অবশ্য পুলিশই নিচ্ছে। প্রতিদিনই থানার সিভিক ভল্যান্টিয়াররা চিঠির বোঝা নিয়ে পাত্রসায়র ডাকঘরে ছুটছেন। পাত্রসায়র থানা সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই প্রায় সাড়ে তিনশো জন হেলমেটবিহীন সওয়ারি এই রকমের চিঠি লিখতে বাধ্য হয়েছেন।

কয়েক মাস আগেই হেলমেট বাধ্যতামূলক করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘নো হেলমেট, নো পেট্রোল’ নীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন। পড়শি জেলা পুরুলিয়াতে আগেই এই নীতি কার্যকর হয়ে গিয়েছে। বাঁকুড়া জেলার সর্বত্র এখনও পুরোপুরি চালু না হলেও, ধাপে ধাপে এগোচ্ছে পুলিশ। বাঁকুড়া শহর ও শহর সংলগ্ন পেট্রোল পাম্পগুলিতে সচেতনতামূল পোস্টার চোখে পড়ছে। জেলার পুলিশ সুপার সুখেন্দু হীরা বলেন, “সেপ্টেম্বর থেকেই হেলমেট ছাড়া কোনও পাম্পে পেট্রোল মিলবে না। এই মাসে পুলিশ জেলা জুড়ে প্রচার চালাচ্ছে।’’

Advertisement

পাত্রসায়র থানার তৈরি করা ছাপানো চিঠি।—নিজস্ব চিত্র

এরই মধ্যে পাত্রসায়র থানার অভিনব উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, “প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম হেলমেটবিহীন মোটরবাইক চালকদের গাড়ির নম্বর লিখে রেখে পুলিশের তরফে তাঁদের বাড়িতে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হবে। পাত্রসায়র থানা এই পরিকল্পনাটিকে একটু পাল্টে নিয়েছে। এর প্রভাব বেশ ভালই পড়ছে এলাকায়।”

পুলিশ সূত্রের খবর, পাত্রসায়র থানার বর্তমান ওসি মানস চট্টোপাধ্যায় এর আগে ওন্দা থানার দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় ট্রাফিক আইন নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে তিনি হাতিয়ার করেছিলেন মোবাইল ফোনকে। হেলমেট না পরে মোটরবাইক চালাতে দেখলেই, ধরে চালকদের ফোন করাতেন বাড়িতে। বাবা, মা বা স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে হতো তাঁদের। প্রতিজ্ঞা করতে হতো, আর হেলমেট ছাড়া মোটরবাইক নিয়ে বেরোবেন না। সেই উদ্যোগ তখনই জেলা স্তরের পুলিশ কর্তাদের নজর কেড়েছিল। ওন্দা এলাকার হেলমেট পড়ার চল এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল।

কিন্তু ওন্দা এলাকার অনেক বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, কড়াকড়ি যতদিন চলেছে ততদিন সবাই হেলমেট নিয়ে বেরিয়েছেন। কিন্তু নজরদারি কমতেই সচেতনতা বেশ কিছুটা আলগা হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না পাত্রসায়র থানার ওসি মানসবাবু। ওসি বলেন, “আমরা সচেতন করার চেষ্টা করি। কিন্তু তাঁরা নিজেরা যদি নিজেদের পরিবারের কথা না ভাবেন, তাহলে সত্যিই কিছু করা মুশকিল।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement