বিরোধীদের সমালোচনা ছিলই। ছিল নিচু তলার পুলিশ কর্মীদের অসন্তোষও। তারই মধ্যেই সাব ইন্সপেক্টর অমিত চক্রবর্তী খুনে অভিযুক্তদের নাম বাদ দেওয়ার অবেদনের বিরোধিতা করে এবং গভঃ পিপি-র অপসারণে চেয়ে আসরে নামল সেভ ডেমোক্রেসি ফোরাম। সোমবার এই মর্মে সিউড়িতে জেলা শাসকের কার্যালেয়ের অদূরে একটি অবস্থান বিক্ষোভ করার পাশাপাশি জেলাশাসককে একটি স্মারকলিপিও দেওয়া হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে। যদিও জেশাশাসক সেই সময় সিউড়িতে না থাকায় তাঁর দফতরে স্মারকলিপিটি জমা করেন ফোরামের সদস্যরা।
২০১৪ সালের ৩ জুন দুবরাজপুরের যশপুর পঞ্চায়েতের আউলিয়া-গোপালপুর গ্রামে পুকুর সংস্কার করাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও সিপিএমের সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পোঁছে ওই সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের ছোড়া বোমার আঘাতে মারাত্মক জখম হয়েছিলেন দুবরাজপুর থানার টাউনবাবু অমিত চক্রবর্তী। দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অমিতবাবুর ৫৫ দিনের লড়াই শেষ হয় ২৮ জুলাই। ওই ঘটনায় পুলিশ স্বতপ্রণোদিত ভাবে ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। অমিতবাবুর মৃত্যুর পরে খুনের মামলাও রুজু হয়। অভিযুক্তদের তালিকায় নাম ছিল শাসকদলের যশপুরের অঞ্চল সভাপতি দুবরাজপুর পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ আলিম শেখ-সহ এলাকার প্রায় ৩০জন কর্মী-সমর্থক।
ঘটনা হল, অভিযুক্তদের তালিকায় নাম ছিল জেনাল নেতা সৈয়দ মকতুল হোসেন-সহ বেশ কিছু সিপিএম কর্মী সমর্থকদেরও। কিন্তু গ্রেফতার হয়েছিলেন মাত্র ১৬ জনই। এলাকাবাসী জানিয়েছিলেন যাঁরা ধরা পড়েছে তারা আপাত নিরীহ। ধৃতদের মধ্যে এক নাবালকও ছিল। শাসকদলের চাপেই হোক বা অন্য কোনও কারণ, অভিযুক্ত আর কাউকেই ধরতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনার কয়েকমাস পর ৩০ অগস্ট দুবরাজপুর আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। সেই তালিকায় ৫০ জনেরই নাম ছিল।
গত ৫ জানুয়ারি অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্যের কাছে ৩৬ জনের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জানান জেলার পাবলিক প্রসিকিউটার রণজিত গঙ্গোপাধ্যায়। আইনজবীদের একাংশ জানিয়েছিলেন, নাম বাদ দেওয়ার যে তালিকা দিয়ে আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে সেখানে নাম ছিল অভিযুক্তদের তালিকায় এক নম্বরে থাকা তৃণমূল নেতা তথা পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ সেখ আলিমের নামও। রণজিতবাবু জানিয়েছিলেন, সে দিন একজনের ছোঁড়া বোমে আহত হয়ে পরে মৃত্যু হয়েছিল এসআই পদমর্যাদার ওই পুলিশ কর্মীর। সেখানে অন্য পুলিশকর্মীরা ছিলেন না। একজনেই বোম ছুঁড়েছিল সেখানে ৫০ জনের নামে অভিযোগ করে পুলিশ। এলাকা থেকে পাওয়া আবেদন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে এবং তদন্ত করে দেখেছি যে অভিযুক্তদের তালিকায় যাঁদের নাম ছিল তাঁদের অধিকাংশই নিরপরাধ। তাই ৩২১ ধারায় আবেদন জানানো হয়েছে।
এ দিকে, রণজিতবাবুর দাবির সঙ্গে অবশ্য সহমত ছিলেন না সিপিএম নেতৃত্ব। ঘরে বাইরে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছিল গভঃ পিপির ভূমিকা নিয়ে। ক্ষোভ ছিল পুলিশের অন্দরেও। প্রশ্ন উঠেছিল এমন একটা হত্যাকাণ্ড যেখানে একজন পুলিশ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। সেখানের পুলিশের করা তদন্তের ভিত্তিতে পেশ করা চার্জশিট থেকে কেন তৃণমূল নেতা-সহ বাছাই ৩৬ জনের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হল? যদিও শেখ আলিমের নাম তালিকায় নেই বলে দাবি করেছিলেন গভঃ পিপির। এই বিষয়ে শুনানি হবে ১৯ জানুয়ারি।
সোমবার সেভ ডেমোক্রেসি ফোরামের রাজ্য সম্পাদক চঞ্চল চক্রবর্তী বলেন, ‘‘৩২১ ধারা অনুযায়ী তিনি আবেদেন করতেই পারেন, কিন্তু পাবলিক প্রসিকিউটারের কাজ অভিযুক্তদের রেহাই দেওয়া নয়। বরং আদালতকে সাহায্য করা। এখানে অমিত চক্রবর্তী খুনে যে ভাবে ৫০ জনের মধ্যে ৩৬ জনের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন (সিংহভাগই একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের) সেটার বিরোধিতা করতেই এখানে আসা। মামলা সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখে তেমনই মনে হয়েছে। এখানে অভিযুক্তরা সিপিএমের বা তৃণমূল সেটা বিষয় নয় দোষীরা সাজা পাক সেটাই বড় কথা। কিন্তু পিপি তাঁর ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেছেন।’’ তিনি জানান, জেলাশাসক ছাড়াও আমাদের এই স্মারকলিপি লিগ্যাল রিমেমব্রান্স, জুডিশিয়াল সেক্রেটারি এবং আইন মন্ত্রীকে দিচ্ছি।’’
এ দিন রণজিত গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে চাননি।