পুলিশের গাড়ি দেখে চোটপাট টিএমসিপি নেতা সৌমিত্রের। ছবি: ওমপ্রকাশ সিংহ
কলেজে ঢুকে হুজ্জুতি দেখা হয়ে গিয়েছে। বাদ ছিল না পুলিশ পেটানো। এ বার কলেজে অধ্যক্ষকে ঘেরাও করে শাসক দলের ছাত্র নেতা পুলিশের গাড়ি জ্বালানো, থানায় বোমা মারার হুমকি দিচ্ছেন—তা-ও দেখে ফেললেন রাজ্যবাসী। সৌজন্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) রানিগঞ্জ ব্লক সভাপতি সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনাস্থল, রানিগঞ্জের টিডিবি কলেজ।
মঙ্গলবার রানিগঞ্জ থানার ওসি-অর্ণব গুহকে ফোন করে সৌমিত্রকে বলতে শোনা গিয়েছে ‘‘পুলিশের গাড়ি আটকে রেখেছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনাকে আসতে হবে। না হলে থানা বোমা মেরে উড়িয়ে দেব।’’
বোলপুর, আলিপুর থেকে সম্প্রতি বাঁকুড়া— গত ক’বছরে পুলিশের উপরে শাসক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চড়াও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে বারবার। রায়গঞ্জ, ঘাটাল থেকে সামসি, নানা কলেজেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হেনস্থায় নাম জড়িয়েছে দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের। অথচ, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে (খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও) ‘ছোট ছেলে’ হওয়ার সুবাদে অনেকেরই সাত খুন মাপ হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের।
তাই এ দিন কলেজে ঢুকে সৌমিত্রর ওই ‘দাপট’ দেখে সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের কটাক্ষ, ‘‘এখন ছোট ছেলেরাও বুঝে নিয়েছে, শাসক দলে থাকলে পুলিশের উপরে প্রভুত্ব করার অধিকার জন্মে যায়!’’ বিজেপি-র শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য, ‘‘তৃণমূলের যা মনের কথা, সহজ সরল ভাবে ওই ছাত্রনেতা সেটাই প্রকাশ করে দিয়েছেন!’’ আর কংগ্রেসের বর্ষীয়ান বিধায়ক মানস ভুঁইয়ার মতে, ‘‘এর পরেও যদি স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজি এবং পুলিশ কমিশনার নিজেদের বাহিনীকে রক্ষা না করেন, তা হলে গুন্ডারা থানায় বসবে আর ওসি-রা পোশাক ছেড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন!’’
রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তথা তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বলেন, ‘‘এমন জিনিস চলতে দেওয়া যাবে না, বারবার বলছি। ওই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পুলিশকেও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।’’ যদিও পুলিশকে হুমকি দেওয়া সৌমিত্রর বিরুদ্ধে রাত পর্যন্ত কোনও মামলা রুজু হয়নি। আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটের এডিসিপি ( সেন্ট্রাল) বিশ্বজিৎ ঘোষ শুধু বলেন, ‘‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
ওই কলেজে অনলাইনে ভর্তির সময়সীমা ছিল ১০ জুন পর্যন্ত। এ দিন দুপুর ২টো নাগাদ কলেজের ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক সৌমিত্র শ’দুয়েক ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে ঢোকেন। দাবি করেন, ভর্তির সময়সীমা বাড়াতে হবে। কয়েকজনকে নিয়ে অধ্যক্ষ স্বদেশ মজুমদারের ঘরে চলে যান তিনি। বাকিরা বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। ঘণ্টাখানেক পরে অধ্যক্ষের ঘর থেকে বেরিয়ে কলেজ চত্বরে পুলিশের গাড়ি দেখে খেপে ওঠেন সৌমিত্র। অধ্যক্ষের কাছে জানতে চান, কেন তিনি পুলিশ ডেকেছেন। অধ্যক্ষ পুলিশ ডাকেননি জানালে কলেজে হাজির পুলিশকর্মীদের উপরে চোটপাট শুরু করেন সৌমিত্র।
পুলিশ সূত্রের খবর, গাড়িটি ওই এলাকায় টহল দিচ্ছিল। বিক্ষোভ দেখে কলেজে ঢোকে। পুলিশ সূত্রের দাবি, সৌমিত্র পুলিশকর্মীদের বলেন, ‘‘গাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেব।’’ পরে ফোন করেন রানিগঞ্জ থানার ওসিকে। ওই ছাত্র নেতাকে বলতে শোনা যায়, ‘‘কার অনুমতিতে পুলিশ পাঠিয়েছেন, লিখিত জানাতে হবে আপনাকে। আমি অধ্যক্ষকে ঘেরাও করে রেখেছি, ক্ষমতা থাকলে এসে সরিয়ে দেখান।’’ তাঁর চেঁচামেচির পরেই পুলিশের গাড়ি কলেজ ছাড়ে। এই কাণ্ডের পরেও সৌমিত্রর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল না কেন? ওসি নিশ্চুপ। তবে জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘‘বাঁকুড়ায় পুলিশকে মারধরে অভিযুক্ত নেতাকে গ্রেফতার করার পরেই আইসি-র বদলির নির্দেশ এসে গেল! সেখানকার জেলা সভাধিপতি অভিযুক্তকে সৎ বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন! এর পরে কোন ভরসায় পুলিশ কিছু করবে?’’
সৌমিত্র এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। অধ্যক্ষ স্বদেশবাবু প্রথমে দাবি করেন, কলেজে গোলমালের কথা জানেন না। তবে ছাত্র সংগঠনের দাবি মেনে ভর্তির সময়সীমা ২০ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। পরে বলেন, ‘‘সৌমিত্রর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করা হবে কি না তা নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব।’’ কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি তথা স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক সোহরাব আলি বলেছেন, ‘‘বিনা কারণে পুলিশ দেখে আমাদের ছেলেরা খানিকটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ওদের বয়স কম। তাই পুলিশকর্মীদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে। এর বেশি কিছু ঘটেনি।’’