BJP’s Candidates

রুদ্ধদ্বার কক্ষ, ফোন জমা, প্রার্থী বাছতে পশ্চিমবঙ্গে গোপন ফর্ম! দলের নিচুতলার তিনটি পছন্দ জানতে বেনজির পথে বিজেপি

প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য দলের এই অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা একটি সাংগঠনিক জেলায় একই দিনে সেরে ফেলা হচ্ছে। প্রত্যেক মণ্ডল সভাপতি ডাক পাচ্ছেন। মণ্ডলের প্রাক্তন সভাপতিদেরও ডাকা হচ্ছে।

Advertisement

ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:২৯
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

সাধারণ মানুষের মধ্যে সমীক্ষা চালানোর পর প্রার্থী বেছে নেওয়ার কথা শোনা যেত এত দিন। কিন্তু এ বার বিজেপি বেশি সতর্ক। তাই পেশাদার সমীক্ষকদের তুলে আনা তালিকাকে দলের অন্দরেও পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাচ্ছে তারা। পশ্চিমবঙ্গের প্রার্থীতালিকা তৈরির জন্য সংগঠনের নীচের তলার মতও নেওয়া হচ্ছে লিখিত ভাবে। রুদ্ধদ্বার কক্ষে ডেকে সুইচ্‌ড অফ করিয়ে জমা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে নেতাকর্মীদের ফোন। তার পরে ছাপানো ফর্ম বিলি করে জেনে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর নাম। প্রার্থী বাছাইয়ের আগে এমন প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে আগে কেউ কখনও দেখেননি।

Advertisement

রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক কার্যকলাপ দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অমিতাভ চক্রবর্তী জেলায় জেলায় ঘুরতে শুরু করেছেন এই সাংগঠনিক সমীক্ষার জন্য। অন্যান্য রাজ্যে বিজেপির সংগঠন সম্পাদক বা সমপর্যায়ের দায়িত্বে থাকা যে ১২ জন নেতাকে পশ্চিমবঙ্গের সাংগঠনিক কাজে শামিল করা হয়েছে, তাঁরাও ঘুরছেন। প্রতিটি সাংগঠনিক জেলায় গিয়ে তাঁরা অভিনব উপায়ে মতামত জানতে চাইছেন। ছাপানো ফর্ম বিলি হচ্ছে। সেখানে লিখে দিতে হচ্ছে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পছন্দের নাম। তার পরে যে ভাবে ভাঁজ করে ফর্মটি দেওয়া হয়েছিল, ঠিক সেই ভাঁজে ভাঁজে মুড়েই ফর্মটি ফেরত দিতে হচ্ছে। একজনের ফর্ম অন্যজনের দেখা বা অন্যকে দেখানো নিষেধ।

প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য দলের এই অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা একটি সাংগঠনিক জেলায় একই দিনে সেরে ফেলা হচ্ছে। প্রত্যেক মণ্ডল সভাপতি ডাক পাচ্ছেন। মণ্ডলের প্রাক্তন সভাপতিদেরও ডাকা হচ্ছে। আর যে বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য মত নেওয়া হচ্ছে, সেখানকার কোনও বিজেপি নেতা যদি জেলাস্তরের পদাধিকারী বা প্রাক্তন পদাধিকারী হন, তা হলে তিনিও ডাক পাচ্ছেন। প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ছাপানো ফর্ম। তাতে লেখা থাকছে ‘ভারতীয় জনতা পার্টি, পশ্চিমবঙ্গ’। তার নীচে লেখা থাকছে, ‘আপনার পছন্দের প্রার্থীর নাম’। এর পরে তিনটি আয়তাকার খোপ আঁকা পরপর। পাশে লেখা ‘১, ২, ৩’। নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হিসাবে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি পছন্দ, তাঁর নাম প্রথম খোপে লিখতে হচ্ছে। পরের দু’টি খোপে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দের প্রার্থীর নাম। সবশেষে নিজের নাম এবং পদ লিখে পূর্ণাঙ্গ স্বাক্ষর।

Advertisement

ইতিমাধ্যে অধিকাংশ জেলায় এই প্রক্রিয়া সেরে ফেলেছে বিজেপি। কিন্তু মণ্ডলস্তরের একাধিক পদাধিকারীর দাবি, এই ভাবে ছাপানো ফর্ম বিলি করে যে পছন্দের প্রার্থীর নাম জানতে চাওয়া হবে, সে কথা বৈঠকের আগে ঘুণাক্ষরেও জানা যায়নি। বিজেপির প্রত্যেকটি সাংগঠনিক জেলা কমিটিতে (দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি বাদে) সাতটি করে বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাতটি আসনের কর্মীদের একই দিনে, একই স্থানে বৈঠকে ডাকা হচ্ছে। কিন্তু একসঙ্গে সকলকে নিয়ে বৈঠকে বসছেন না নেতৃত্ব। এক-একটি করে বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের একসঙ্গে ডাকা হচ্ছে। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে বা এমন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে যে, আমন্ত্রিত নন এমন কেউ যাতে ঢুকতে না-পারেন। প্রথমেই প্রত্যেকের ফোন বন্ধ করিয়ে তা জমা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাথা গুনে দেখে নেওয়া হচ্ছে যে, অন্তত সমসংখ্যক ফোন জমা পড়ল কি না। তার পরে নির্বাচনী প্রস্তুতি সংক্রান্ত কিছু কথা হচ্ছে। সে সব শেষ করেই ফর্মটি বিলি করা হচ্ছে। এবং মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তা ফেরত নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেককে আরও একটি কথা বলে দেওয়া হচ্ছে— ফর্মে পছন্দের প্রার্থী হিসাবে কেউ নিজের নাম লিখতে পারবেন না।

বিজেপি নেতারা কেউই এই সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন। তবে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, প্রার্থী হিসাবে বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক কেমন, তা যাচাই করে নেওয়া এই প্রক্রিয়ার অন্যতম লক্ষ্য। এ বারে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তাকেই মূল এবং একমাত্র মাপকাঠি করেছে বিজেপি। আগের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সমীক্ষা করে জনপ্রিয়তার হিসাব নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি জনপ্রিয়তা ছিল না। কোথাও নেতৃত্বের পছন্দ, কোথাও সংগঠনের পছন্দ গুরুত্ব পেয়েছিল। কোথাও আবার খ্যাতনামীরা টিকিট পেয়েছিলেন। কোন আসনে জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোথায় নেতৃত্বের পছন্দকে বা সংগঠনের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, এর কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠিও ছিল না। ফলে অনেক আসনেই প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ‘ভুল তথা বিপর্যকর’ প্রমাণিত হয়েছিল বলে বিজেপির একাংশ এখনও মনে করেন। তাই এ বার আর নানা রকমের মাপকাঠি নয়। একটি মাপকাঠি ধরেই সর্বত্র এগোনো হচ্ছে। সেই মাপকাঠিতে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের বিষয়ে স্থানীয় সংগঠনের মনোভাব বুঝে নেওয়া হচ্ছে। সেই অনুযায়ী স্থির করা হবে যে, সাধারণ সমীক্ষায় উঠে আসা তিনটি করে নামের মধ্যে কাদের এগিয়ে রাখা হবে। সাধারণ সমীক্ষায় দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের হলেও সংগঠনের সিংহভাগ তাঁরই পাশে, এমন পরিস্থিতি হলে প্রথম পছন্দের বদলে তাঁকেই টিকিট দেওয়া যায় কি না, বিবেচনা শুরু হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করবে কেন্দ্রীয় বিজেপির সংসদীয় বোর্ড। তবে সবটাই মোদী-শাহের অনুমোদন সাপেক্ষে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement