প্রত্নক্ষেত্রে খনন। — ফাইল চিত্র।
মূল প্রত্নস্থলটির আসেপাশেও এ বার এ বার উৎখনন চালাতে চায় রাজ্য পুরাতত্ত্ব দফতর।
এখনও পর্যন্ত যেটুকু উৎখনন হয়েছে, তাতে এই এলাকায় একটি সুপ্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মস্থল ছিল বলে মনে করেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। ষষ্ঠ শতকের কাছাকাছি সময় থেকে শুরু করে বেশ কয়েক’শো বছর ধরে সেই ধর্মস্থলে লোক যাতায়াত ছিল। তা ঘিরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদও। সেই জনপদটির সন্ধানই এ বারের উৎখননের লক্ষ্য।
এই দফায় ১১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মোগলমারিতে দশম দফার উৎখননের কাজে এসে এমনটাই দাবি করলেন উৎখননের পরিচালক তথা রাজ্য পুরাতত্ত্ব দফতর ও সংগ্রহশালা অধিকারের বরিষ্ঠ প্রত্নতত্ত্ববিদ প্রকাশ মাইতি। তিনি বলেন, “উত্তর পূর্ব ভারতের বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল এই বৌদ্ধবিহার। এই মোগলমারি গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে ছিল বৌদ্ধবিহার কেন্দ্রিক স্থাপত্য নিবেদন স্তূপ, চৈত্য ইত্যাদি। মাটির তলায় অনেকাংশে সেগুলি চাপা পড়ে আছে। এই অংশগুলিতেও উৎখনন করা হলে গুরুত্বপূর্ণ পুরাবস্তু পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’’ তাঁর আশা, বৌদ্ধ ধর্মস্থান সম্পর্কেও আরও অজানা তথ্য উঠে আসতে পারে।
প্রকাশবাবু জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত উৎখননে মূল ধর্মস্থানের মাত্র তিরিশ শতাংশ উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। একটা বড় অংশে রয়েছে জমির মালিক একটি সংস্থার ঘর। যেটি আবার স্থানীয় সংগ্রহশালা হিসাবে পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মোগলমারি নিয়ে গবেষক ও পর্যটকরা অনেক বেশি আগ্রহী। তাই তাঁরা গুরুত্ব দিয়েই গোটা প্রত্ন এলাকাতেই উৎখননের কাজ চালাতে চান। এ বার বিহারের দক্ষিণ পূর্ব দিকে খননের কাজ করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বার উৎখননে বিহারের পূর্ব দিকের বাইরের দেওয়াল, টেরাকোটার ব্রাহ্মী হরফের বেশ কিছু সিল, হাতির দাঁতের পুঁতি, মৃৎপাত্র, মূর্তির ভগ্নাংশ ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছিল। এই নিয়ে তৃতীয় দফায় খননের কাজ শুরু করছে রাজ্য পুরাতত্ত্ব দফতর। এর আগে অশোক দত্তের পরিচালনায় ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত উৎখননের কাজ করেছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। প্রকাশবাবু জানান, ৩১ মার্চ উৎখননের কাজ শেষ করা হবে কিন্তু উৎখনিত স্থল, কাঠামো ও প্রত্নবস্তুর বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে আরও দিন পনেরো কাজ করবেন তাঁরা।
এই শীতে মোগলমারিকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ২৪-২৬ জানুয়ারি তিন দিনের ‘মোগলমারি বুদ্ধিস্ট হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল’-এর আয়োজন করছে মোগলমারি বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ও কলকাতার বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা। প্রত্নস্থলের গায়েই এই উৎসবের মঞ্চে থাকবে মোগলমারি প্রত্নখনন সংক্রান্ত আলোকচিত্রের প্রদর্শনী, বিস্তারিত আলোচনা, সকলের সামনেই খোলা চোখে উৎখননের কাজ দেখা ও মত বিনিময়ের সুযোগ, মেডিটেশন কোর্স, বাংলাদেশের এম এ তাহেরের তোলা ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের আলোক চিত্র, মোগলমারি নিয়ে গৌতম ঘোষের তথ্যচিত্র, সখিসেনার পাঠশালা অবলম্বনে পথনাটিকা, বৌদ্ধধর্মকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি।
আয়োজকদের তরফে গৌরীশংকর মিশ্র, সবিতা মাইতিরা বলেন, “সকলের কাছে মোগলমারিকে আরও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপিত করাই আমাদের আসল লক্ষ্য। শুধু বৌদ্ধবিহার দেখা নয়, বৌদ্ধদর্শন থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সংস্কৃতি, সাহিত্যে তার প্রভাব, রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের বুদ্ধভাবনা ইত্যাদি সাধারণ মানুষের কাছে আমরা জানার সুযোগ করে দিচ্ছি। পর্যটকদের কাছে এর জন্য পৃথক বার্তা দেওয়া যাবে।” যা নিয়ে ইতিমধ্যেই আগ্রহ দেখা দিয়েছে স্থানীয়ভাবেও।