জেলা পুলিশের ‘কঠিন সময়’ চলার কথাটা মেনে নিয়েছিলেন আগের পুলিশ সুপার। তার পরে দু’বছর কাটলেও বদলায়নি বীরভূম জেলা পুলিশের দশা! দুবরাজপুর থানার অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর অমিত চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের অধিকাংশকেই ‘ছাড়’ দিতে চেয়ে রাজ্য সরকার আবেদন জানানোর পরে, এমনই কটাক্ষ করছেন বিরোধীরা।
এমনিতেই গোটা রাজ্যে এখন নিয়মিত আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ। ঘনিষ্ঠমহলে নিচুতলার পুলিশকর্মীদের একাংশ মেনে নিচ্ছেন, মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে অনেকের। বাহিনীর অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে, যাঁদের উপরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাঁদেরই এমন হাল হলে, সাধারণ মানুষের কী হবে! কর্তব্যরত অবস্থায় খুন হওয়ার পরেও সরকার কেন সেই মামলার বিচার-প্রক্রিয়া চালানোর পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে! এর পরে কোন সাহসে এলাকায় গিয়ে কর্তব্যরক্ষায় অটল থাকবে পুলিশ! জেলা পুলিশের নিচুতলার এই যন্ত্রণার সদুত্তর দিতে পারছেন না কেউ-ই।
বছর পঁয়ত্রিশের ওই অফিসারকে যাঁরা ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, মঙ্গলবার তাঁদের অনেকেই প্রবল ক্ষুব্ধ। ওই এএসআই খুনে অভিযুক্তদের এ ভাবে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রবল নিন্দা করেছেন। কেউ বলছেন, ‘‘কেন আমাদের এ ভাবে চিড়িয়াখানায় বাঁদর করে রাখা হয়েছে। তার বদলে বাহিনীটাকে তুলে দিলেই তো হয়!’’ সহকর্মীদের প্রশ্ন, অমিত খুনের ঘটনায় পুলিশ কি তা হলে শুধু নিরপরাধ লোকজনকেই চিহ্নিত করে চার্জশিটে নাম দিয়েছে! পুলিশ নিরাপরাধদের যদি ফাঁসিয়ে থাকে, সেটা বিচার প্রক্রিয়া শেষে আদালত বলুক।’’
বস্তুত, রাজ্যের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচুতলার পুলিশ মহলে ক্ষোভ, শুধু জেলার চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশকর্মীরা গুমরোচ্ছেন, ‘‘পুলিশ সরকারের অঙ্গ। কর্তব্য করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সেই পুলিশের মৃত্যুর বিচার নিয়ে যদি সরকারের এমন অবস্থান হয়, তা হলে আমরা কোথায় দাঁড়াই! ডিউটি করব কী ভাবে!’’ রাজ্যে পুলিশের এক শীর্ষ কর্তাও বলেছেন, ‘‘তদন্তটা এ বার কাদের বিরুদ্ধে চলবে বলুন তো!’’
অমিতের উপরে বোমা মারার ঘটনায় তৃণমূল এবং সিপিএম একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল। দুবরাজপুর থানার তৎকালীন ওসি ত্রিদিব প্রামাণিক দু’পক্ষের ৫০ জনের নামে এফআইআর দায়েরও করেন। তার ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হলেও এফআইআরে অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা আলিম শেখ এখনও অধরাই!
বিরোধীদের অভিযোগ, ওই জেলার তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের মুখে ‘পুলিশকে বোম মারুন’ শোনার পরেও তাঁর টিকি ছুঁতে পারেনি পুলিশ। লাভপুরের তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম ‘পায়ের তল দিয়ে তিন ভাইকে মেরেছি’, বলে প্রকাশ্যে দাবি করার পরেও পুলিশ তাঁর নাম রাখেনি চার্জশিটে। সেই রীতিরই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বোলপুর থানায় ঢুকে যুব তৃণমূল নেতার পুলিশ পেটানো থেকে শুরু করে অমিত চক্রবর্তীর মৃত্যু— সব কিছুরই ঘটনাস্থল রাঢ়বঙ্গের এই জেলা।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা বীরভূমের প্রাক্তন সাংসদ রামচন্দ্র ডোমের অভিযোগ, ‘‘আমি নিশ্চিত, শাসকদলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এমন বাছাই করা কিছু অভিযুক্তের নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যাতে শাসকদলের আস্থাভাজন ওই দুষ্কৃতীদের সামনের বিধানসভা ভোটে কাজে লাগানো যায়।’’ অভিযোগ মানেননি তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল। বলেছেন, ‘‘আইন আইনের পথে চলবে।’’
আইনের কথায় অবশ্য ক্ষোভের আঁচ নিভছে না বীরভূমের নিচুতলার পুলিশ মহলে। অনেক পুলিশকর্মীরই বক্তব্য, ‘‘বিচারের ভার একমাত্র আদালতের হাতেই রয়েছে। সরকার এমন অবস্থান না নিলে, বিচারটা ঠিকঠাক হতো!’’ সাধে কী আর বীরভূমের প্রাক্তন পুলিশ সুপার বলেছিলেন, ‘‘পুলিশ বড় কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।’’