মুহাম্মদ ইউনূস। — ফাইল চিত্র।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে করা চুক্তিগুলির মধ্যে আদানি-চুক্তিই ‘নিকৃষ্টতম’! শুধু তা-ই নয়, এ জন্য নাকি প্রতি বছরই পাঁচ থেকে ছ’হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ভারতের প্রতিবেশী দেশকে। তাতে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের। রবিবার ঢাকার বিদ্যুৎ ভবনে রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক করে এমনটাই জানাল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটি।
মুহাম্মদ ইউনূসের গড়া সরকারি এই কমিটি পূর্ববর্তী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ চুক্তিগুলি পর্যালোচনা করে গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা বিদ্যুৎ চুক্তিগুলির মধ্যে আদানি চুক্তিই সবচেয়ে খারাপ। অবিলম্বে এই চুক্তির সংশোধন প্রয়োজন। বাংলাদেশের দাবি, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম যখন প্রতি ইউনিটে ৪ টাকার কাছাকাছি ছিল, সে সময় গৌতম আদানির সঙ্গে ১৫ টাকায় চুক্তি করা হয়। দাম নির্ধারণের এক অদ্ভূত সূচক উল্লেখ করা হয়েছিল সেই চুক্তিতে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎবাবদ আদানিকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। প্রতি বছর আদানির লাভ হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা পাঁচ-ছ’হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। বাংলাদেশের দাবি, এ ভাবে চলতে থাকলে ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদে তাদের এক হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হবে। লভ্যাংশ ঘরে নিয়ে যাবে আদানি গোষ্ঠী।
হাসিনার আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছে ইউনূস সরকার। বিষয়টি শীঘ্রই আদানি গোষ্ঠীকে জানিয়ে তাদের উত্তর চাইতে পারে বাংলাদেশ। অনিয়ম প্রমাণিত হলে চুক্তি বাতিল করতে সিঙ্গাপুরে সালিশি আদালতে মামলাও করা হতে পারে। পর্যালোচনা কমিটির সদস্য মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘‘ইতিমধ্যেই যে সব তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তা দিয়ে আদানি চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এটা করতে না পারলেও রাজনৈতিক ভাবে নির্বাচিত সরকার নিশ্চয়ই পারবে। আদানির বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলাও করা যেতে পারে।’’ তবে চুক্তি বাতিল করতে গেলে বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে বলেও জানিয়েছেন মোশতাক। তাঁর কথায়, চুক্তি বাতিলের পথে হাঁটলে আগেভাগেই বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতে পারে আদানি গোষ্ঠী। এতে দিনকয়েক লোডশেডিং চলতে পারে। মোশতাক বলেন, ‘‘২৫ বছরের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে এটুকু কষ্ট মেনে নিতেই হবে বাংলাদেশের মানুষকে!’’
২০১৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হয় ভারতের আদানি পাওয়ারের। চুক্তি অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পরবর্তী ২৫ বছর ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঢাকাকে সরবরাহ করার কথা আদানির সংস্থার। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের পরে পরিস্থিতি বদলায়। আদানি গোষ্ঠীর দাবি, চুক্তি মেনে এ পর্যন্ত বকেয়া টাকাও মেটায়নি বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের চুক্তি অনুসারে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আদানি পাওয়ার। কিন্তু ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেই সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনে ইউনূস সরকার। আদানি পাওয়ারের কাছে বাংলাদেশের বকেয়াও বাড়তে থাকে। অন্য দিকে, হাসিনার আমলে যে সমস্ত বিদ্যুৎ চুক্তি হয়েছিল, সেগুলিকে ঘিরে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ। আদানি-চুক্তি নিয়েও পৃথক রিপোর্ট তৈরি করে সেই কমিটি। তারাই এ বার চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিল।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন সূত্রে খবর, ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। তাদের দাবি, বাংলাদেশের পর্যালোচনা কমিটির রিপোর্ট তারা পায়নি। বাংলাদেশের তরফেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি বলেও জানিয়েছে আদানি গোষ্ঠী।