পুজোর সময় আলতা পরেন? জানেন কেন এই লাল তরলে পা রাঙান মহিলারা
যুগ যুগ ধরে বাঙালি নারীরা আলতা পরে আসছেন। এই লাল রঙের তরল কি শুধুই প্রসাধনী?
বাঙালির উৎসব ও আলতা: দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজো - এই উৎসবের মরশুমে বাঙালি নারীর সাজে আলতা এক অপরিহার্য অঙ্গ। এটি শুধু প্রসাধনী নয়, বরং বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসুন, জেনে নিই এই আলতার নেপথ্যে থাকা ইতিহাস ও তাৎপর্য।
আলতা কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ: আলতা হল এক ধরনের তরল লাল রঙ। যা সাধারণত পায়ের পাতায় লাগানো হয়। প্রাচীনকালে এটি লাক্ষা নামক প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি হত। আলতার এই লাল রঙ রক্তের প্রতীক। যা জীবন, শক্তি, সমৃদ্ধি এবং উর্বরতাকে ইঙ্গিত করে। তাছাড়া, হিন্দু ধর্মানুসারে এটি সৌভাগ্য ও মঙ্গলেরও প্রতীক।
আলতার ইতিহাস: নানা ঐতিহাসিক দলিল ও সাহিত্যে আলতার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতে এটি প্রসাধনী হিসাবে ব্যবহৃত হলেও এর কিছু ব্যবহারিক গুরুত্বও ছিল। মনে করা হয়, আলতা মূলত পায়ের কিছু ছত্রাকজনিত রোগ (যেমন - হাজা) প্রতিরোধী একটি আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হত।
আলতা এবং দেবীপুজো: দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপুজো এবং কালীপূজার মতো দৈব নারীশক্তির আরাধনায় আলতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দেবীমূর্তির পায়েও আলতা পরানো হয়। যা দেবীর শক্তি ও মঙ্গলময়ী রূপ তুলে ধরে। অনেক মন্দিরে পুজোর থালায় সিঁদুরের সঙ্গে আলতাও দেবীকে নিবেদন করা হয়।
দুর্গাপুজোয় আলতা শক্তির প্রতীক: দুর্গাপুজো হল নারীশক্তির আরাধনা। এই সময় সধবারা আলতা পরেন। এটি তাঁদের বিবাহিত জীবনের সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। এছাড়া, কুমারী পুজোয় কুমারী মেয়েদের পায়েও আলতা পরানো হয়। যা তাদের শুদ্ধতা ও দেবীত্বের প্রতীক।
আরও পড়ুন:
লক্ষ্মীপুজোয় আলতা সমৃদ্ধির আগমন: লক্ষ্মীপুজোয় ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী কমলার আরাধনা করা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, লক্ষ্মীদেবীর পায়ের চিহ্ন সমৃদ্ধির প্রতীক। ওই দিন গৃহিণীরা আলতা দিয়ে ঘরের চৌকাঠে বা পুজোর স্থানে লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা আঁকেন। যা দেবীকে ঘরে আহ্বান জানানোর একটি প্রথা।
কালীপুজোয় আলতা অন্ধকার বিনাশের প্রতীক: কালীপুজো হল অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের উৎসব। মা কালীর পায়েও আলতা পরানো হয়। যা অশুভ শক্তি দমন করার প্রতীক। এই পুজোয় আলতা পরা মহিলারা অন্ধকারকে বিনাশ করে জীবনে আলো নিয়ে আসার সঙ্কল্পে সামিল হন।
কোন মহিলারা আলতা পরেন: ঐতিহ্যগত ভাবে আলতা মূলত বিবাহিত মহিলারা পরতেন। যা তাঁদের সধবা হওয়ার চিহ্ন হিসাবে গণ্য হতো। সিঁদুরের মতোই আলতাও তাঁদের বিবাহিত জীবনের প্রতীক। তবে আধুনিক সময়ে এই প্রথা আর শুধুমাত্র বিবাহিত মহিলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যে কোনও বয়সের অবিবাহিত মেয়েরাও আলতা পরেন আজকাল।
আলতার আধুনিক রূপ এবং মেহেন্দি: আলতা এবং মেহেন্দি দুটি ভিন্ন প্রথা হলেও, বর্তমান যুগে বহু ক্ষেত্রে এদের ব্যবহার মিশে গিয়েছে। বিশেষত, বাঙালি বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের হাতে ও পায়ে আলতার পাশাপাশি মেহেন্দিও পরানো হয়। যা ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার এক সুন্দর মেলবন্ধন।
আরও পড়ুন:
আলতা কি শুধুই প্রসাধনী? আলতা শুধু একটি প্রসাধনী নয়। এটি বাঙালির বহু বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক স্মারক। আলতা পরা পা কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। বরং তা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জীবনের মঙ্গল কামনার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এই কারণেই বিভিন্ন পুজোয় মহিলারা আজও অনেকেই আলতা পরেন। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।)