প্রেজেন্টস্
Knowledge Partner
Fashion Partner
Wedding Partner
Banking Partner
Comfort Partner

দেবী দিলেন স্বপ্ন, রামকৃষ্ণ দেব করলেন চক্ষুদান– কিংবদন্তি লাহা বাড়ির পুজো

১১৮২ বঙ্গাব্দ, ১৭৭৫ সাল ঘেমেনেয়ে মাঠ ভেঙে হেঁটে চলেছেন ধর্মদাস লাহা। চুঁচুড়ার আদালতে তাঁদের মামলা উঠেছে। জমি-জমা সংক্রান্ত মামলার আজকেই অন্তিম দিন।

তমোঘ্ন নস্কর

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৫১
সংগৃহীত চিত্র।

সংগৃহীত চিত্র।

১১৮২ বঙ্গাব্দ, ১৭৭৫ সাল

ঘেমেনেয়ে মাঠ ভেঙে হেঁটে চলেছেন ধর্মদাস লাহা। চুঁচুড়ার আদালতে তাঁদের মামলা উঠেছে। জমি-জমা সংক্রান্ত মামলার আজকেই অন্তিম দিন।

রায় যদি বিপক্ষে যায়, পথে বসবেন তিনি। চুঁচুড়ায় পৌঁছে একটি গাছের তলায় একটু বসলেন প্রবৃদ্ধ মানুষটি। দুশ্চিন্তাক্লান্ত, নির্ঘুম চোখ বুজে আসে না চাইতেও। আর তখনই সেই অদ্ভুত স্বপ্নটা দেখলেন তিনি।

এক ছোট্ট বালিকা যেন সেই গাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। বলছে, মামলা তো তুই জিতে যাবি। তার পরে কী করবি? ধর্মদাস লাহার কোনও উত্তর জোগায় না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। সেই বালিকা পুনরায় বলে, গৃহে আমার পুজো করবি। তোর পূর্বপুরুষের বন্ধ পুজো তুই শুরু কর। আমি দু’জন পটুয়াকে খানাকুল থেকে পাঠাচ্ছি। ওরা গিয়ে আমার ঠাকুর গড়া শুরু করবে।

স্বপ্ন ভেঙে যায়। ধর্মদাস দেখেন, রোদ্দুর মাথার উপরে উঠেছে। তাড়াতাড়ি আদালতে হাজির হন। অবিশ্বাস্য ভাবে সেই মামলায় তিনি জয়যুক্ত হলেন। আনন্দে মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল স্বপ্নের কথা। খুশি মনে উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, দেখেন দুই অচেনা মানুষ। আশ্চর্য হয়ে ধর্মদাস জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কারা?”

তাঁরা শোনান সেই স্বপ্নের বাকি অংশ। তাঁদের গৃহে এক ছোট বালিকা এসে বলে, কামারপুকুরে লাহা বাবুর ভিটেতে দুর্গাপুজো হবে। তোমরা যাও, মূর্তি গড়তে যাও। তাই তাঁরা এখানে এসেছেন। সব কিছু মনে পড়ে ধর্মদাসের। দেবী নিজেই সংযোগ ঘটিয়েছেন। মূর্তি গড়া শুরু হয়। আশ্বিনে পুজো হবে দেবীর।

সত্যিই তাই। আনুমানিক সাড়ে চারশো বছর আগে শ্রী জগন্নাথ লাহা ওই দুর্গাপুজো প্রথম চালু করেন। সুদীর্ঘকাল পুজো চলার পরে বিভিন্ন টানাপড়েনের মাঝে ২০-২৫ বছর বন্ধ ছিল। তাইতেই দেবী কুপিতা হয়েছিলেন। দেবীর স্বপ্নাদেশে পুনরায় চালু হল পুজো ।

পুজো তো শুরু হল, কিন্তু ধর্মদাস পড়লেন মহা আতান্তরে। দুর্গাপুজোয় বলিপ্রথা আছে। তিনি ঘোর বৈষ্ণব। কী ভাবে বলি প্রথা সমাধা করবেন? অনেক ভেবেচিন্তে রওনা হলেন মেদিনীপুরে, গুরুর কাছে। গোঁসাই গুরু যদি পথ দেখান, তা হলে গুরু-প্রদর্শিত পথেই তিনি অগ্রসর হবেন।

পথে পড়ল সাতবেড়িয়ার মস্ত খাল। সেই খাল পেরোনোর জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। দেখা হল এক বৃদ্ধার সঙ্গে। বৃদ্ধার সঙ্গে এ কথা-সে কথায় আলাপ জমে উঠল। মায়ের মতো করেই সন্তানের মনের কথা জানতে চাইলেন বৃদ্ধা। কথায় কথায় বৃদ্ধার কাছে নিজের মনের কথা বলেও ফেললেন ধর্মদাস।

ভারী আশ্চর্য কথা বললেন সেই বৃদ্ধা। মা কি আর সন্তানের বলি চাইবে? ভাল ভাবে পুজোটাই চাইবে। তবুও যাও তুমি গুরুর কাছে তার বিধান নাও।

গুরুর কাছে পৌঁছে সব কথা বলতেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন গুরু গোঁসাই। বললেন, “করেছো কী! যেখানে দেবী নিজে বলে গিয়েছেন, সেখানে আমি বলব কী?

দেবী যেমন ভাবে বলেছেন, তেমন ভাবেই তাঁর পুজো করো। সেই থেকে আজ ২৫০ বছর ধরে কামারপুকুরে লাহাবাবুর পুজো চলে আসছে।

এখানেই অবশ্য শেষ নয়। ১৮৪৮-এ এক বালক একরাশ বিস্ময় নিয়ে দেবী দুর্গার চক্ষুদান করলেন। বালকের আঁকা চক্ষু নিয়ে মৃন্ময়ী দেবী সাক্ষাৎ চিন্ময়ী হয়ে প্রতিভাত হলেন। তখনও সেই বালক কেবল গদাই। পরবর্তীতে তিনিই হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। হ্যাঁ, লাহা বাড়ির পুজো এমনই একটি পুজো, যেখানে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ চক্ষুদান করেছিলেন। এই লাহাবাড়ির আটচালার পাঠশালারই ছাত্র ছিলেন তিনি।

লাহা বাড়ির পুজোর বিধি হল, বিপত্তারিণী পুজোর দিনে কাঠামো পুজো হয়। আর ঘট উত্তোলন করা হয় মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে। এই দিন থেকে চণ্ডীপাঠ শুরু হয় বাড়িতে। শুধু তাই নয়, মহালয়ার দিন থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত আট দিন ধরে হয় যাত্রাপালা। এই যাত্রা দেখতে বহুদূর থেকে লোক আসেন। প্রায় মেলার আকার নেয় বাড়ির অঙ্গন ও তার চার পাশ।

এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy