দশ মাসেও সারেনি খিদিরপুরের অরফ্যানগঞ্জ বাজারের আগুনের ক্ষত।
২০২৫ সালের ১৫ জুন গভীর রাতে বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে গিয়েছিল খিদিরপুরের অরফ্যানগঞ্জ বাজার। ২৮ বিঘা জমির উপরে বিস্তৃত কলকাতা পুরসভার এই বাজারে ছিল প্রায় ১৩০০ দোকান। বহু দোকান ওই রাতে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়, অনেকগুলি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দশ মাস পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, পুড়ে যাওয়া বাজারের অধিকাংশ অংশই ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে সঞ্জয়কুমার সাউয়ের দোকানও। অরফ্যানগঞ্জ বাজারে তিনি মুদির পাইকারি ব্যবসা করতেন। এখন কাছাকাছি এলাকায় মোটা টাকা ভাড়া দিয়ে নতুন করে দোকান খুলতে বাধ্য হয়েছেন। হতাশ গলায় সঞ্জয়ের আক্ষেপ, “গত বছরের আগুনে প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল আমার। মুখ্যমন্ত্রী এসে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু এখনও কিছুই পাইনি। অস্থায়ী বাজারের কাজও অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। কবে সেখানে যেতে পারব, স্থায়ী বাজার কবে হবে— সবই অনিশ্চিত।”
একই সুর শোনা গেল মশলার পাইকারি ব্যবসায়ী স্বপন পালের গলাতেও। আগুনে তাঁর প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে স্বপনও পুড়ে যাওয়া বাজারের পাশে অস্থায়ী ভাবে ব্যবসা চালাচ্ছেন। তাঁর কথায়, “দশ মাস কেটে গেল, এখনও অস্থায়ী বাজার তৈরি হল না। আর স্থায়ী বাজারের কাজ কবে শুরু বা শেষ হবে, সে নিয়েও আমরা অন্ধকারে।’’
অরফ্যানগঞ্জ বাজারটি ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। গত বছর বাজারের ভয়াল আগুন নেভাতে দমকলের লেগেছিল প্রায় দু’দিন। আগুন লাগার পরের দিন, ১৬ জুন দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে ব্যবসায়ীদের আর্থিক সাহায্য ও বাজার পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। অরফ্যানগঞ্জ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক রঞ্জিত সাহার অভিযোগ, “মাত্র চল্লিশ জন ব্যবসায়ীকে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। বাকি প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। কলকাতার মেয়র বা পুরসভার কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।”
আগুনে দোকান হারানো শ্যামলকুমার সামন্ত এখন নানা জিনিস ফেরি করে দিন কাটাচ্ছেন। পুড়ে যাওয়া দোকানের জায়গার দিকে তাকিয়ে তাঁর কষ্টভরা স্বীকারোক্তি, “মেয়ের স্কুলের ফি বা বই কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারি না। কোনও রকমে দিন চলছে।” একই পরিস্থিতি ধূপ ব্যবসায়ী কমলেশ চৌধুরীরও। দোকান পুড়ে যাওয়ার পরে এখন তিনি বিভিন্ন দোকানে ধূপ সরবরাহ করে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁর কথায়,“রোজগার তলানিতে এসে ঠেকেছে। এত দিন পরেও অস্থায়ী বাজার তৈরি না হওয়ায় সমস্যার শেষ নেই।”
পুড়ে যাওয়া বাজারের কাছেই প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে বর্তমানে অস্থায়ী বাজার তৈরির কাজ চলছে। তবে, কাজের গতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, কাজ অত্যন্ত ধীর গতিতে এগোচ্ছে। এ বিষয়ে কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ (বাজার) আমিরুদ্দিন ববি বলেন, “বিষয়টি মেয়র দেখছেন, আমি এ নিয়ে কিছু বলব না।” অন্য দিকে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের দাবি, “আগুনের পরে ব্যবসায়ীরা আদালতে যাওয়ায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। এখন কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। শিগগিরই ব্যবসায়ীরা অস্থায়ী বাজারে যেতে পারবেন। তার পরেই স্থায়ী বাজার নির্মাণ শুরু হবে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)