Advertisement

সংঘর্ষ রুখতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ন্যাজাট থানার ওসি! নিউ মার্কেটে মাংসের দোকান ভাঙতে নামে বুলডোজ়ার, দাবি তৃণমূলের

ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন করের পায়ে গুলি লেগেছে বলে অভিযোগ। গুলি লেগেছে আরও একজন কনস্টেবলেরও। ন্যাজাট থানার রাজবাড়ি এলাকার ঘটনা।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ২৩:৫৪
ডোমকলে সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ।

ডোমকলে সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ। — নিজস্ব চিত্র।

নির্বাচনের ফলঘোষণার পর থেকেই কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হিংসা, কর্মীদের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। এ বার দুই দলের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিতে আহত হয়েছেন বসিরহাট পুলিস জেলার ন্যাজাট থানার ওসি। সঙ্গী কনস্টেবলও গুলিবিদ্ধ। বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি কলকাতাতেও তৃণমূলের অফিস ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের অভিযোগ, নিউ মার্কেটের কাছে একটি মাংসের দোকান ভাঙতে বুলডোজ়ার নিয়ে যান বিজেপি কর্মীরা। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, ভাঙচুর করার কোনও খবর মেলেনি। আইনি পদক্ষেপ করা হবে। অন‍্য দিকে, মুর্শিদাবাদের ডোমকলে এক সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে।

গুলিতে আহত ওসি

ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন করের পায়ে গুলি লেগেছে বলে অভিযোগ। গুলি লেগেছে আরও এক জন কনস্টেবলেরও। উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাট থানার রাজবাড়ি এলাকার ঘটনা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সেখানে দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছিল । খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান ওসি ভরত। তখনই একটি বাড়ির ভিতর থেকে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ। সেই গুলি লাগে ভরতের পায়ে। আহত দু’জনকে কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

তৃণমূলের অভিযোগ

তৃণমূল সাংসদ ডেরেক একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। সেই ভিডিয়ো পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘মধ্য কলকাতায় নিউ মার্কেটের কাছে, পুলিশের অনুমতিসাপেক্ষেই, মাংসের দোকান ভাঙতে বুলডোজ়ার আনা হয়েছে। জয়ের উদ্‌যাপন হিসাবেই তা করা হয়েছে। সিএপিএফ কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। আপনাদের জন্য বিজেপি। সারা দুনিয়া দেখুক এই ছবি।’ এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, বিজয় মিছিলের জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তবে বুলডোজ়ার নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুলিশ তা দেয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা আইনি পদক্ষেপ করছি। ভাঙচুর করার কোনও খবর নেই। বিষয়টি পুলিশ দেখছে।’’

ডোমকলে গুলি

মঙ্গলবার রাতে ডোমকল পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুগিন্দা রথতলা পাড়ায় শফিকুল ইসলাম নামে এক সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠল। গুরুতর জখম অবস্থায় ওই কর্মীকে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো হয়েছে। তাঁর গলায় গুলি লেগেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। অভিযোগের তীর তৃণমূলের দিকে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার কাজ সেরে নিজের খামার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন শফিকুল। অভিযোগ, সেই সময় রথতলা পাড়ার নির্জন এলাকায় কয়েক জন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। একটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও দ্বিতীয়টি সরাসরি শফিকুলের গলায় গিয়ে লাগে। গুলির শব্দ শুনে গ্রামবাসীরা ছুটে এলে অভিযুক্তেরা চম্পট দেন। সিপিএমের পক্ষ থেকে সরাসরি তৃণমূলের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, ভোট পরবর্তী প্রতিহিংসা থেকেই এই হামলা চালানো হয়েছে। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ডোমকল থানার পুলিশ।

ভাঙা হল লেনিন মূর্তি

সালটা ছিল ২০১৮। স্থান দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়া। ২০২৬ সালের মে মাসে অনুরূপ ঘটনার সাক্ষী থাকল মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ। সোমবার বিকেলে জিয়াগঞ্জের শ্রীপত সিংহ কলেজের সামনে থাকা লেনিনের আবক্ষ মূর্তিটি কার্যত গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল নাগাদ একদল যুবক লোহার রড, শাবল এবং বড় হাতুড়ি নিয়ে চড়াও হয় কলেজ স্কোয়্যারে। অভিযোগ, সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মীরা উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যত ‘নীরব দর্শক’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অভিযোগ, মূর্তি ভাঙার সময় আক্রমণকারীদের গলায় ছিল ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভাঙচুর চালানোর সময় দুষ্কৃতীরা চিৎকার করে বলতে থাকে, “এখানে আর লেনিন থাকবে না, এবার এখানে শিবাজির মূর্তি বসবে। বসানো হবে গোপাল পাঁঠার মূর্তি।” জেলা বামফ্রন্টের এক নেতার কথায়, “পুলিশের সামনেই এই তাণ্ডব প্রমাণ করে দিচ্ছে, যে রাজ্যে আইনের শাসন বলে কিছু নেই। ত্রিপুরার কায়দায় বাংলায় সংস্কৃতির উপর আঘাত হানা হচ্ছে।” যদিও স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

বিজয়ী প্রার্থীর বাড়ি হামলা

উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরে তৃণমূলের বিজয়ী প্রার্থী বীণা মণ্ডলের বাড়ির সামনে একদল লোক গান বাজিয়ে উপস্থিত হন বলে অভিযোগ। শুরু হয় গালিগালাজ। আরও অভিযোগ, বিধায়কের বাড়ি লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হয়। বাড়ির গেট ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। বীণার অভিযোগ, বিজেপি এ সব করেছে। খবর পেয়ে তাঁর বাড়ির সামনে উপস্থিত হয় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। বীণার কথায়, ‘‘রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে ঠিকই, কিন্তু স্বরূপনগরে আমি মানুষের ভোটেই জিতেছি। আমি একজন জেতা বিধায়ক, আমার বাড়িতে যদি এই ধরনের অত্যাচার, ভাঙচুর হতে পারে, তা হলে তৃণমূলের সাধারণ কর্মী সমর্থকদের কী হবে? আমি প্রশাসনের উপর আস্থা রাখছি। পুরো বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছি। আশা করব, প্রশাসন দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দেবে।’’ বনগাঁ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রিপন দাস বলেন, ‘‘আমি ঘটনাটা শুনেছি, যাঁরা বীণা মণ্ডলের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন, তাঁরা কেউ বিজেপির কার্যকর্তা বা কর্মী, সমর্থক নন। বিজেপি-কে বদনাম করার জন্য কিছু মানুষ (তারা তৃণমূল সমর্থিত) গেরুয়া উত্তরীয় পরে এবং বিজেপির ঝান্ডা হাতে নিয়ে এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যে, কোনও রকম হিংসাত্মক আচরণ করা যাবে না। স্বরূপনগরের সকল বিজেপি কর্মী-সমর্থক সেই নির্দেশ মেনে চলছেন।’’ স্বরূপনগর থানার পুলিশ বীণার বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে আক্রমণকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।

অভিষেকের অভিযোগ

তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে তৃণমূলের কর্মীদের উপরে নির্যাতন চলছে। তাঁর কথায়, ‘‘যে ভাবে আমাদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, পার্টি অফিস ভাঙছে, ঘরে ঢুকে মারছে, সকলকে বলব, তৃণমূলের সৈনিকেরা শক্ত থাকুন। দল আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। যতদূর যেতে হবে, যাব। ১২ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি রয়েছে।’’ তার পরেই তিনি আরও বলেন, ‘‘কর্মী খুন হয়েছে নানুরে। বেলেঘাটায় খুন হয়েছেন এক জন। ২৪ ঘণ্টা কাটেনি। ৩০০-৪০০ পার্টি অফিস ভেঙেছে ওরা। ১৫০ প্রার্থীর ঘরে ঢুকে হামলা করেছে। ঘরে, গ্যারাজে ঢুকে হামলা করেছে। এটা বিজেপির ভরসার মডেল! বাকি মানুষ স্থির করবে।’’

শমীকের বার্তা

রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে হিংসা রুখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আর্জি জানান শমীক। তিনি বলেন, ‘‘প্রশাসনকেও বলতে চাই, কোথাও এমন কোনও হিংসার ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নিন। কারণ, এই জন্যই বাংলার মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন।’’ দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘‘বলতে চাই, শান্তিতে থাকুন। খুশি থাকুন। দল যে দায়িত্ব দিয়েছে, পালন করুন। কিন্তু জয়ের আনন্দে কাউকে আঘাত করবেন না। কারও ভাবাবেগে আঘাত দেবেন না।’’

কমিশনের নির্দেশ

ভোট-পরবর্তী হিংসা রুখতে ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করার নির্দেশ দিল কমিশন। রাজ্যের মুখ্যসচিব, পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত এবং সিআরপিএফ-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও ধরনের অশান্তির ঘটনা ঘটলে, তা দ্রুত পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। কাউকে রেয়াত না-করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে কমিশনের তরফে।

অশান্ত ভাঙড়

ভোটের ফল ঘোষণা হতেই উত্তপ্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভাঙড়। সেখানকার বিজেপি-ঘনিষ্ঠদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। বাড়ি ভাঙচুর, মারধরের অভিযোগ উঠেছে ভাঙড়ের নানা জায়গায়। তৃণমূলের অভিযোগ, ভাঙড়ে বিজয়ী আইএসএফ-এর নেতা-কর্মীরা রাতভর তাণ্ডব করেছেন বিভিন্ন এলাকায়। ভোট-পরবর্তী হিংসায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে নিমকুড়িয়া গ্রামে। বেঁওতায় তৃণমূল নেতার বাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। তৃণমূল করার ‘অপরাধে’ বাড়িতে ঢুকে মহিলা-সহ একটি পরিবারের সমস্ত সদস্যকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার সকালে তৃণমূলের পতাকা না-খোলার অভিযোগে নিমকুড়িয়া গ্রামে এক তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে ঢুকে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অন্য দিকে, ভাঙড়ের বেঁওতা-১ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ির সিসি ক্যামেরা ভেঙে বাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সেখানে অভিযোগ উঠেছে বিজেপি-র দিকে।

তৃণমূলের কার্যালয়ে হামলা

মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ। কোথাও কোথাও আবার তৃণমূলের কার্যালয় ‘দখল’ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বারুইপুর, কৃষ্ণনগর, বর্ধমান-সহ রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ— নানা প্রান্তে একই অভিযোগ ওঠে। কোথাও কোথাও আবার তৃণমূলের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে বিজেপি প্রায় সব অভিযোগই অস্বীকার করেছে।

নানুরে খুন তৃণমূলকর্মী

বীরভূমের নানুরে ভোট-পরবর্তী ‘হিংসা’র বলি এক। স্থানীয় এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠল। মৃতের নাম আবির শেখ। পরিবারের অভিযোগ, আবিরকে রাস্তায় একা পেয়ে বিজেপি কর্মীরা ঘিরে ধরে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়।

খুন বিজেপিকর্মী

মঙ্গলবার সকালে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে বিজেপির এক কর্মীকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনায় গ্রেফতার অভিযুক্ত। স্থানীয় এবং বিজেপি সূত্রে খবর, মৃতের নাম যাদব বর। বয়স ৪৮ বছর। বিজেপির জয়ের আনন্দে সোমবার রাতে আবির খেলায় মেতেছিলেন তিনি। তার পরেই তাঁকে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা খুন করেছে বলে অভিযোগ।

Bengal post-poll Violence
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy