রাজ্যে হিংসার বলি ৪

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হুঁশিয়ারি, “কোনও বিজেপি কর্মী দলের পতাকা নিয়ে, আবির মেখে, ব্যক্তিগত সমীকরণে আক্রমণ, তৃণমূলের কার্যালয় দখল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে গিয়ে হুজ্জুতি, অশালীন শব্দ প্রয়োগ করলে আমি তাঁকে দল থেকে বার করে দেব।”

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৬:৪৬
আসানসোলের জেলা তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুর।

আসানসোলের জেলা তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুর। — নিজস্ব চিত্র।

ভোট-প্রচারে বিজেপির স্লোগান ছিল, ‘ভয় নয়, ভরসা’। কিন্তু ২০১১-এর বিধানসভা ভোটের মতোই সোমবার রাজ্যে পালাবদলের পরে অশান্তির চেনা ছবি সামনে এসেছে। তৃণমূল ও বিজেপি-র মোট চার জন কর্মী খুনের অভিযোগ উঠেছে। রাতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ সামলাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ন্যাজাট থানার ওসি-সহ দুই পুলিশকর্মীও। এর পাশাপাশি মারধর, ভাঙচুর, তৃণমূলের দলীয় দফতর দখল, বাড়িতে হামলার মতো নানা অভিযোগ অব্যাহত। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমতলার দফতরে বিজেপি তাণ্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে বিদায়ী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ দলের তাবড় নেতৃত্ব বার বার শান্তি বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের বক্তব্য, সেই বার্তা নিচুতলায় কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

শুভেন্দু মঙ্গলবার একই সঙ্গে বলেছেন, “বিজেপি সুশৃঙ্খল দল। হিন্দু ও আদিবাসীরা বিজেপি করেন। যাঁরা অশান্তি করেন, তাঁরা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন।” বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হুঁশিয়ারি, “কোনও বিজেপি কর্মী দলের পতাকা নিয়ে, আবির মেখে, ব্যক্তিগত সমীকরণে আক্রমণ, তৃণমূলের কার্যালয় দখল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে গিয়ে হুজ্জুতি, অশালীন শব্দ প্রয়োগ করলে আমি তাঁকে দল থেকে বার করে দেব।”

এই হুঁশিয়ারির পরেও মঙ্গলবার রাত ৯টা নাগাদ উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাটে রাজবাড়ি বিটপল এলাকায় তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে সংঘর্ষ সামলাতে গিয়ে ওসি ভরতভূষণ পুরকায়েত জখম হন। অভিযোগ, দুষ্কৃতীদের ছোড়া এলোপাথাড়ি গুলি ওসির পায়ে লাগে। আহত হন এক কনস্টেবলও। দু’জনকেই কলকাতার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এর আগে বিকেলে বীরভূমের নানুরে আবির শেখ (৪৫) নামে এক তৃণমূলকর্মীকে পিটিয়ে-কুপিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। বিজেপির দাবি, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে এই খুন। বেলেঘাটায় সোমবার রাতে বিশ্বজিৎ পট্টনায়ক (৪২) নামে এক তৃণমূল কর্মীর দেহ উদ্ধার হয়। খুনের অভিযোগ করেছে পরিবার। পুলিশ জানিয়েছে, ভোট-পরবর্তী গোলমালের জেরে এই মৃত্যু কি না, তা দেখা হচ্ছে। তৃণমূলের প্রশ্ন, ‘ক্ষমতা দখলের প্রথম দিন থেকে কি এ ভাবেই বাংলায় লাশের রাজনীতি কায়েম করতে চায় বিজেপি?’ সোমবার রাতে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে বাড়ির সামনে যাদব বর (৪৫) নামে এক বিজেপি কর্মীকে খুনের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ দুই তৃণমূল কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি, বিজেপির অভিযোগ, নিউ টাউনের বালিগড়িতে তৃণমূলের হামলায় মৃত্যু হয়েছে দলের কর্মী মধু মণ্ডলের (৪৫)। এক অভিযুক্তের বাড়ির সামনে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশ লাঠি চালিয়েছে, তাতে মহিলাদের গায়ে আঘাত লেগেছে বলে অভিযোগ।

আলিপুরদুয়ারে এক বৃদ্ধা, ফালাকাটার তৃণমূল নেতা দেবজিৎ দেবনাথের বাড়িতে হামলা এবং তাঁকে ও তাঁর মাকে মারধর, উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরে তৃণমূলের জয়ী প্রার্থী বীণা মণ্ডলের বাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। মিনাখাঁয় তৃণমূলের পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য মহুয়া সর্দার মাইতির অভিযোগ, দুষ্কৃতীরা ঘরে ঢুকে তাঁর মেয়েকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কলকাতাতেও তৃণমূল পুরপ্রতিনিধিকে মারধর, পরাজিত তৃণমূল প্রার্থীর গাড়ি তাক করে ইট ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে। শুভেন্দুর নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুর, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল, বনগাঁ, বসিরহাট, সুন্দরবনের নানা এলাকা, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, হুগলি, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ-সহ নানা প্রান্ত থেকে হুজ্জতির অভিযোগ উঠেছে। বহরমপুরের বেশ কয়েক জন তৃণমূল নেতা, ভাকুড়ির ১ পঞ্চায়েতের উপপ্রধান বিপ্লব কুন্ডু, খাগড়ায় স্বর্ণশিল্পী সংগঠনের সভাপতি সপ্তর্ষি ধরের বাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে।

কোচবিহারের তুফানগঞ্জে বিজেপি সমর্থক পরিবারের এক নাবালিকাকে ব্লেড দিয়ে আঘাতের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের এক বুথ সভাপতির বিরুদ্ধে। বিজেপি কর্মীদের উপরে গুলি চালিয়ে, অস্ত্র হাতে হামলার অভিযোগ উঠেছে জলপাইগুড়ির তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে। কৃষ্ণ অভিযোগ মানেননি।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন বিজেপির কয়েক জন জয়ী প্রার্থী। রাজারহাট-গোপালপুরের জয়ী প্রার্থী তরুণজ্যোতি তিওয়ারি সমাজমাধ্যমে নিজের নম্বর দিয়ে লিখেছেন, ‘কেউ কেউ তৎকাল বিজেপি হয়ে অত্যাচার করছেন। তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের জায়গা নেই বিজেপিতে।’ শান্তি বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন বরাহনগরের জয়ী প্রার্থী সজল ঘোষ। সিউড়ির জয়ী প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় নিজের এলাকার কিছু অত্যুৎসাহী সমর্থকদের উদ্দেশে পথে নেমে বলেছেন, “আপনাদের কে এই সব করতে বলেছেন? পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিক।” নবদ্বীপের ১২ নম্বর ওয়ার্ডে নীল-সাদা তৃণমূল কার্যালয় গেরুয়া করে দেওয়া হয়েছিল। শান্তি বজায় রাখতে প্রচার চালান ভাতারের জয়ী প্রার্থী বিজেপির সৌমেন কার্ফা। হিংসা থামানোর বার্তা দিতে চুঁচুড়া শহরে মাইকে প্রচার চালায় বিজেপি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Post Poll Violence Death Case

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy