নজর শাহের, দুই বিশ্বস্ত সেনাপতিতেই জয়ের রাস্তা

এক বিজেপি নেতা বলেন, “তৃণমূল শাহকে চেনে না! উনি মনে করলে তৃণমূল বুথে বসার লোক পাবে না।”

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৯:২২
অমিত শাহ।

অমিত শাহ। — ফাইল চিত্র।

‘ম্যায় সম্ভাল লুঙ্গা’!

ছোট্ট বাক্য। অভিঘাত বিরাট। সূত্রের খবর, রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা অন্তত দু’বার এই বাক্যটি শুনেছেন। কখনও মুখভার করেছেন, কখনও আশ্বস্ত হয়েছেন। বক্তার নাম কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

গত বার ২০০ পার-এর আওয়াজ তুলে বিজেপি থেমে গিয়েছিল ৭৭-এ। শক্তি বাড়িয়ে ক্ষমতায় ফেরা শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের কটাক্ষের তির একতরফা ছিল শাহের দিকে। উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা বা ২০১৯ সালের লোকসভা জেতানোর নেপথ্য নায়ক যে শাহ ‘চাণক্য’ তকমা পেয়েছিলেন, বঙ্গভূমিতে তাঁকেই পড়তে হয়েছিল কটাক্ষের মুখে। তবে এ বারের ভোটের আগে এক আড্ডায় এক বিজেপি নেতা বলেন, “তৃণমূল শাহকে চেনে না! উনি মনে করলে তৃণমূল বুথে বসার লোক পাবে না।”

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে প্রথম ১৭% ভোট-সহ বিজেপি দু’টি লোকসভা আসন জেতার পরে সিদ্ধার্থনাথ সিংহ ভারপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে এই রাজ্যে আসেন। কিন্তু ২০১৫ সালের পুর-ভোট এবং ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই ভোট ১০%-এ নেমে আসার পরে সিদ্ধার্থের বদলে কৈলাস বিজয়বর্গীয় দায়িত্বে আসেন। কিন্তু ২০২১ সালে ফলাফল বেরোনোর দিন দুপুরেই তিনি বাংলা ছাড়েন। উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা জেতানো এবং তেলঙ্গানায় বিজেপিকে প্রাসঙ্গিক করার নেপথ্য কারিগর তথা শাহের ঘনিষ্ঠ, বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসলকে বাংলায় পাঠানো হয়েছিল।

বনসল সংগঠনের দায়িত্বে আসার পরে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয় বিহারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মঙ্গল পাণ্ডেকে। সুনীল-মঙ্গল জুটি প্রথমেই ‘ওঝা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মণ্ডল স্তর পর্যন্ত নেমে তাঁরা বুঝতে পারেন, অধিকাংশ জায়গাতেই দলের কাঠামোয় জল ভর্তি। কমিটিগুলো ‘ভূতে’র আখড়া। তাই প্রথমেই দুধকে জলমুক্ত করা এবং কমিটি থেকে ‘ভূত’ তাড়ানোর কাজে হাত দেন তাঁরা। এই কাজ কিছুটা সহজ হয়ে যায় ‘সদস্য সংগ্রহ অভিযান’ সামনে এসে পড়ায়। প্রায় নিভৃতবাসে পাঠানো বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্যকে নিয়ে এসে সদস্য সংগ্রহ অভিযানের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। একের পর এক চূড়ান্ত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সদস্য সংগ্রহ অভিযান নিয়ে কোনও রকম তাড়াহুড়ো করেননি শীর্ষ নেতৃত্ব। কারণ, তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল প্রক্রিয়ায় যেন জল না থাকে। দীর্ঘ দিন ধরে দলকে সদস্য সংগ্রহ অভিযানের মধ্যে রাখার ফলে এক দিকে যেমন কর্মীরা দৈনন্দিন কাজের মধ্যে থেকেছেন, তেমনই সংগঠন অনেকটাই জলমুক্ত করা গিয়েছ। এর পরে শুরু হয় ‘বুথ সশক্তিকরণ’ অভিযান। খাতায়-কলমের সদস্যদের বাদ দিয়ে রক্ত-মাংসের সদস্যদের নিয়ে বুথ কমিটি তৈরি হয়। অন্তত ৬০% ক্ষেত্রে ‘ভূত-মুক্ত’ বুথ তৈরি করা গিয়েছিল বলে বিজেপি সূত্রের দাবি।

সাংগঠনিক ভাবে দলের খোলনলচে বদলে দেওয়ার পরে বনসল তাঁর তুরুপের তাসটি ফেলেন। সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার জায়গায় থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনী রাজনীতির আঙিনার বাইরে নিয়ে আসেন। যাঁরা প্রার্থী হতে চান বা বিদায়ী বিধায়ক, তাঁদের কাউকেই জেলা সভাপতি পদে রাখেননি তিনি। তার পরে দলের নতুন ও পুরনো কর্মীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের জন্য সভাপতি পদে নিয়ে আসা হয় দলের মধ্যে জনপ্রিয়, বাঙালি মুখ শমীককে। আর গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব এড়াতে শেষ মুহূর্তে রাজ্য কমিটি ঘোষণা করা হয়। তত ক্ষণে গোটা দল নির্বাচনী আবহে ঢুকে যাওয়ায় বিক্ষোভের চেনা ছবি এ বার ছিল অমিল।

বনসল ধীরে ধীরে যখন বঙ্গ বিজেপিকে সাংগঠনিক ভাবে গড়ে তুলছেন, তখন নির্বাচনী কৌশল সাজাতে শাহ পাঠিয়েছিলেন তাঁর আর এক ঘনিষ্ঠ সেনাপতি ভূপেন্দ্র যাদবকে। সহকারী বিপ্লব দেবকে নিয়ে ভূপেন্দ্র ঘুরে বেড়িয়েছেন শহর, শহরতলি, গ্রামে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তুলে নিয়ে এসেছেন স্থানীয় সমস্যাগুলিকে। পাঁচটি পেশাদার সংস্থা অন্তত এক বছর ধরে ঘুরে বেড়িয়েছে বিভিন্ন প্রান্তে। তার মধ্যে তিনটি দল সমীক্ষার কাজ করেছে। বাকি দু’টি দল স্থানীয় সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে প্রচার কৌশল সাজিয়েছে। সমীক্ষক দলের কাছে তথ্য নিয়ে ভূপেন্দ্র তৈরি করেছেন নিখুঁত পরিকল্পনা। হিন্দুত্বের ‘কড়া ডোজ়’ থেকে দলকে সরিয়ে এনে প্রচার বেঁধেছেন অনুন্নয়ন, নারী নিরাপত্তার অভাব-সহ নানা সমস্যাকে সামনে রেখে।

দুই সেনাপতির উপরে আস্থা রেখেও বাংলা নিয়ে শাহ ছিলেন একবগ্গা অবস্থানে। দলের মধ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) থেকে শুরু করে তৃণমূলের সঙ্গে ‘সমঝোতা’র মতো বিষয়গুলো নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে সংশয় ছিল। শাহের সঙ্গে গোপন বৈঠকে তাঁরা সেই প্রশ্নগুলো তুলেও ছিলেন। কিন্তু শাহ নিজস্ব কায়দায় কার্যত ‘ধুয়ে’ দেন নেতৃত্বকে। এমনকি, এই সংশয় মনের মধ্যে রাখলে নির্বাচনে লড়তে হবে না বলেও কড়া বার্তা দেন। ভোটারের নাম কাটা গেলে নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরেও তিনিই সবটা সামলে নেবেন বলে জানিয়েছিলেন শাহ।

শেষ ধাপে ছিল প্রার্থী নির্বাচন। সূত্রের খবর, বিজেপির দুই শীর্ষ নেতা নিজেরা দু’টি তালিকা দিতে চান শাহকে। সেখানেও শাহ জানান, তিনিই সবটা সামলে নেবেন। কার্যত কাউকে ‘সুপারিশ’ করার সুযোগ না-দিয়ে পেশাদার সংস্থার সমীক্ষা এবং আরএসএস-এর সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে তৈরি করেছেন প্রার্থী তালিকা। বিক্ষিপ্ত কিছু আসন নিয়ে বিক্ষোভ হলেও সামগ্রিক ভাবে প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষের ছবি ছিল অমিলই।

শাহ নিজে প্রায় ১৫ দিন বাংলার বিভিন্ন জেলায় ঘাঁটি গেড়ে ছিলেন। ভূপেন্দ্র রয়েছেন প্রায় ৮ মাস। সুনীলের বঙ্গ-বাসের মেয়াদ হয়ে গেল প্রায় চার বছর। সব মিলিয়ে অতীতে মেঘের উপরে সাঁতার কাটার অভ্যাস ভুলে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেই জয়ের সরণিতে ঢুকেছে বঙ্গ বিজেপি। নিজের ভবিষ্যদ্বাণী অবশেষে মিলিয়েছেন শাহ। জয়ের নেপথ্য কারিগর হলেন রাজস্থানের দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি। সঙ্গে ছিলেন নির্বাচনী সহ-পর্যবেক্ষক বিপ্লব দেব। বঙ্গে বিজেপির জয়ের পরে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আমার ভাগ্যে হার নেই, বাংলায় এসেছি বিজেপির সরকার গড়তেই।’’ তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ পরিবর্তন চাইছিলেন। তাতে সাহায্য করছে বিজেপি।

শাহ সমাজমাধ্যমে বাংলায় লিখেছেন, ‘বাংলায় বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয় আমাদের অসংখ্য কর্মীর ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মবলিদানের ফল। সেই সব পরিবারের ধৈর্যের জয়, যারা হিংসা সহ্য করেও গেরুয়া পতাকা ছাড়েননি। শূন্য থেকে আজ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছনোর এই কঠিন যাত্রায় যে সব কর্মী নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, হিংসার শিকার হয়েছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, তবুও আদর্শের পথ থেকে এক চুলও সরেননি, সেই সকল কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে প্রণাম জানাই’।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Amit Shah BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy